
সম্প্রতি ড. ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলনামা নিয়ে দেশব্যাপী সমালোচনার ঝড় বইছে। তবে এই ঝরের কেন্দ্র যতটা না রাজনৈতিক তার চেয়ে ঢের বেশি অরাজনৈতিক তথা আমজনতা কেন্দ্রিক। দু'একটি বাম ও ডান পন্থী সংগঠন, দু'একজন স্বতন্ত্র রাজনীতিক এবং মবের কোপানলে প্রায় ম্রিয়মাণ জাতীয় পার্টির ছাড়া সমালোচনাকারীদের প্রায় সকলেই অরাজনৈতিক ও নিরপেক্ষ পর্যায়ের সাধারণ মানুষ ও সচেতন বোদ্ধাগণ। জুলাই অভ্যুত্থানের গর্ভ থেকে জন্ম নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের যে অঙ্গীকার নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল কার্যক্ষেত্রে তা চরম ব্যর্থতায় নিপতিত হয়েছে। উপরন্তু, রাষ্ট্রের চার মৌলিক বলয়- সমাজ, সংস্কৃতি, অর্থনীতি
ও রাজনীতি'র বক্ষে গভীর ক্ষত সৃষ্টির মাধ্যমে রাস্ট্রকে অনেকটাই অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়েছিল। অর্থাৎ, দেশব্যাপী মব ভায়োলেন্স সৃষ্টি, মবের কোপানলে হাজারো শিক্ষক নির্যাতনসহ নির্যাতনে একাধিক শিক্ষকের মৃত্যু, প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে মবের সংস্কৃতি চালু, অর্থনীতি রুগ্নকরণ, বেকারত্ব ও খাদ্যাভাব সৃষ্টি, বাজার অব্যবস্থাপনা ও মূল্যস্ফীতি , শিল্পায়ন নিরুৎসাহিতকরণ, অধিকতর ঋণনির্ভর রাষ্ট্রব্যবস্থাপনা, জাতীয় সংস্কৃতি নির্মূলের অপচেষ্টা, জাতীয় ইতিহাস-ঐতিহ্য ধ্বংসকরণ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিলুপ্তি, গণমাধ্যমের কন্ঠ রোধ, বাকস্বাধীনতা ও মুক্তমত হরণ, গণতান্ত্রিক রাজনীতির বিলোপ সাধন, প্রতিহিংসা চরিতার্থে নজিরবিহীনভাবে আইন ও বিচার বিভাগের অপব্যবহার, দূর্নীতির মহোৎসব ইত্যাদি বিচিত্রসব গণবিরোধী ও রাষ্ট্রবিরোধী সৃষ্ট অপকর্মে রাষ্ট্র ও সমাজ কে ক্ষত-বিক্ষত করা হয়েছে। তবে সবকিছু ছাড়িয়ে হামের টীকার অব্যবস্থাপনা এবং এর ফলে শত-শত নিষ্পাপ শিশুদের প্রতি পরোক্ষভাবে গণহত্যা চালানো অন্তর্বর্তী সরকার কে ইতিহাসের আদালত এক ক্ষমাহীন নিষ্ঠুর স্বৈরশাসকে অভিহিত করবে বৈকি! জানিনা রাষ্ট্রীয় আদালত তাকে কীরূপে অভিহিত করবে।
প্রত্যক্ষ অবহেলায় শত-শত অবলা শিশুর মৃত্যুর মিছিলে বুকের মানিক হারানো মায়ের বুক জীর্ণবিদীর্ণ হওয়ার ফলে যখন দেশের আকাশবাতাস ভারী হয়ে উঠেছে তখন অন্তর্বর্তী সরকারের 'কিচেন ক্যাবিনেট' সমাচার সামগ্রিক পরিস্থিতি ও পরিবেশকে আরো ভারাক্রান্ত করে তুলেছে। এ যেন মরার ওপর খাঁড়ার ঘা।
উল্লেখ্য,সরকার ও রাজনীতির ভাষায় 'কিচেন ক্যাবিনেট' হলো সরকারের বিশ্বস্ত পরামর্শক ও নীতিনির্ধারকদের সমন্বয়ে গঠিত 'খাসপর্ষদ' বা 'খাসমহল'কে বোঝানো হয় যেখানে স্পর্শকাতর গোপনীয় বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয়। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অন্তর্বর্তী সরকারের রাষ্ট্রসংশ্লিষ্ট গোপন চুক্তি বা 'নন ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট' কে ঘিরে চলমান চরম সমালোচনার মধ্যদিয়ে 'কিচেন ক্যাবিনেট' এর প্রসঙ্গটি উঠে আসে। জুলাই চেতনা প্রসূত অন্তর্বর্তী সরকার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র তিনদিন আগে (৯ ফেব্রুয়ারি) দেশের বুদ্ধিজীবী ও সুবিজ্ঞ অর্থনীতিবিদদের পরামর্শ ছাড়াই এই চুক্তি সম্পন্ন করেন যা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে রীতিমতো চ্যালেঞ্জ করে মর্মে রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ মনে করেন। চুক্তিটি এখন আর গোপন অবস্থাতে নাই। সম্প্রতি এটি সামাজিক মাধ্যম সহ সকল মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে ভাসছে। 'অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোক্যাল ট্রেড' শীর্ষক এই চুক্তির মাধ্যমে কার্যত বাংলাদেশকে দাসত্বের শৃংখলে বন্দি করা হয়েছে। গণবিরোধী ও রাষ্ট্রবিরোধী জ্বলন্ত ইস্যু হিসেবে চুক্তিটির কিছু উল্লেখযোগ্য দিক ও তার ক্ষতিকর প্রভাব সমকালীন প্রেক্ষাপট বিবেচনায় আলোকপাত করার দাবি রাখে।
উল্লেখ্য, এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশের কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি, ওষুধশিল্প, শ্রম খাত এবং জাতীয় নিরাপত্তার মতো রাষ্ট্রীয় স্পর্শকাতর বিষয়ের কর্তৃত্ব অর্পন করা হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে। ৩২ পৃষ্ঠার এই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ সরকারের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে রীতিমতো শেষ করে দেওয়া হয়েছে। এই চুক্তির ফলে মুসলিমপ্রধান এই দেশে ব্ল্যাক ফরেস্ট হ্যাম, বলোগনা/বলোগনে, ব্র্যাটউরস্ট, ক্যাপিকোলা/ক্যাপোকোলা, চরিজো, কিলবাসা, মরটাডেলা, প্যানসেটা, প্রসিউটো এবং সালামে/সালামির মতো নানা পদের শূকরের মাংস অবাধে আমদানির সুযোগ সৃষ্টিতে বাধ্য করানো হয়েছে। বাংলাদেশের আমদানি নীতি অনুযায়ী শূকরের মাংস আমদানি করা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। অথচ এই চুক্তির মাধ্যমে প্রায় ৯০% মুসলিম অধ্যুষিত এই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের পবিত্র ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। বুদ্ধিজীবী ও অর্থনীতিবিদগণ ৩২ পৃষ্ঠার এই চুক্তিকে দাসত্বের দলিল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন যেখানে বাংলাদেশকে তার করণীয় পালন করতে হবে মর্মে ২০৫ বার বাংলাদেশের নাম উঠে এসেছে। অথচ, বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের নাম উঠে এসেছে মাত্র ৫৯ বার।
চুক্তিপত্রে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মাধ্যমে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের বেসামরিক উড়োজাহাজ, যন্ত্রাংশ ও সেবা কেনা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। চুক্তির ৬ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, এই পরিকল্পনার আওতায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স কে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কিনতে হবে যার আপাতত মোট মূল্য প্রায় ৩৭০ কোটি মার্কিন ডলার বা ৪৫ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা (১ ডলারে ১২২ টাকা ৭৩ পয়সা হিসাবে)। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৩০ এপ্রিল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সাথে রীতিমতো একটি কার্যকরী চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে।
উল্লেখ্য, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের রীতি অনুযায়ী এয়ারলাইন্স বহরে নতুন কোন উড়োজাহাজ সংগ্রহের আগে বিমানের পরিকল্পনা পরিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে এয়ারলাইন্স ও সিভিল এভিয়েশন এর যৌথ সমন্বয়ে একটি 'ফ্লিট প্লানিং' বিশেজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়। উক্ত কমিটি চুলচেড়া অ্যাসেসমেন্ট এর মধ্য দিয়ে 'রুট প্লানিং' সহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা সুনিশ্চিত করে এয়ারলাইন্স বহরে উড়োজাহাজ সংগ্রহ/কেনার সুপারিশ করে এবং সে অনুযায়ী মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নেয়। উল্লেখ্য , ২০০৮ সালেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বোয়িংয়ের কাছ থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সে সময় বোর্ড এবং ফ্লিট প্ল্যানিং কমিটি সব কিছু যাচাই-বাছাই ও দর কষাকষি করে বহরে বোয়িং সংগ্রহ করেছিল যাতে বিমান লাভবান হয়েছিল। অথচ বিস্মিত বিষয় হলো, এনডিএ চুক্তির গোপনীয়তা প্রকাশ হওয়ার পর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের তরফ থেকে জানানো হয় যে, এই চুক্তিতে উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে তারা কিছুই জানেনা। অর্থাৎ, স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে যে- জোর করে বিমানের ঘাড়ে ঋণের ও বহরের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এমনিতেই রাষ্ট্রায়ত্ত এই প্রতিষ্ঠানটি ঋণের ভারে জর্জরিত এবং গড়ে লোকসানেই থাকে।
শর্তানুযায়ী, ভবিষ্যতে আরও উড়োজাহাজ কিনতে গেলে এই চুক্তির আওতায় তা হতে হবে। এর ফলে প্রতিযোগিতা মূলক বিশ্ববাজার থেকে দরকষাকষির মাধ্যমে উড়োজাহাজ কেনার অধিকার সংস্থাটি হারিয়েছে। ফলে সংস্থাটি ভবিষ্যতে বড় ধরনের আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হতে পারে বলে ধারনা করা হচ্ছে। এই চুক্তির আওতায় কার্যত বিমান পুরোপুরি মার্কিন বোয়িং কোম্পানির কাছে জিম্মি হয়ে গেছে!
এই চুক্তির ফলে বিশ্ব বাজার যাচাইয়ের মাধ্যমে এলএনজি আমদানির পথ বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে কাতারের মতো দেশ থেকে স্বল্প মূল্যে এবং বাকিতে যে এলএনজি আমদানি করা হতো সেই পথ রীতিমতো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। চুক্তিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি আমদানি বৃদ্ধির চেষ্টা করবে। বেসরকারি পর্যায়েও এই নীতি বহাল থাকবে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কেনার দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি অন্তর্ভুক্ত। আগামী ১৫ বছরে জ্বালানি আমদানির সম্ভাব্য মূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ১৫ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলার।
এই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার পথ প্রায় রুদ্ধ হয়ে গেছে। বাংলাদেশের প্রয়োজন থাকুক আর নাই থাকুক, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে কৃষিপণ্য আমদানি বৃদ্ধির উদ্যোগ নেবে। এসব পণ্যের মধ্যে আছে-প্রতিবছর (পাঁচ বছরের জন্য) অন্তত ৭ লাখ মেট্রিক টন গম, এক বছরে সর্বোচ্চ ১২৫ কোটি ডলারের বা ২৬ লাখ মেট্রিক টন সয়াবিন ও সয়াজাত পণ্য ও তুলা। এসব কৃষিপণ্যের সম্ভাব্য মূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন বা ৩৫০ কোটি ডলার। অর্থাৎ, মুক্তবাজারে দর কষাকষির মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যে কেনার স্বাধীনতা বাংলাদেশ হারিয়েছে এই চুক্তির ফলে।
চুক্তি কার্যকর হওয়ার ছয় মাসের মধ্যে বাংলাদেশকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) সব ধরনের ভর্তুকির পূর্ণাঙ্গ তথ্য জমা দিতে হবে। ডব্লিউটিও'র ভর্তুকি ও পাল্টা ব্যবস্থাসংক্রান্ত চুক্তির বিধান অনুযায়ী তা বাধ্যতামূলক। এর ফলে বাংলাদেশকে কৃষি, জ্বালানিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক হারে ভর্তুকি কমাতে হবে।
এই চুক্তির আওতায়, বাংলাদেশের সামরিক বিভাগ তার স্বাতন্ত্র হারিয়েছে। এতে সামরিক কেনাকাটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন করা হয়েছে। চুক্তির ৬ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনাকাটা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেবে। একই সঙ্গে কিছু নির্দিষ্ট দেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনা সীমিত রাখার চেষ্টা করবে। তবে কোন কোন দেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনা সীমিত করতে হবে, তা চুক্তিতে উল্লেখ নেই। অর্থাৎ,বাংলাদেশ কোন দেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কিনবে তা অবশ্যই আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অবহিত করতে হবে। এতে সামরিক নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা গোপনীয়তা ক্ষুণ্ন হবে যা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ করবে বইকী!
এই চুক্তির আওতায়, বাংলাদেশের বাজারে অবাধে মার্কিন পণ্য বিক্রি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। চুক্তির ২.২ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এমনভাবে আমদানি লাইসেন্সিং নীতির প্রয়োগ করতে পারবে না যাতে তাদের পণ্যের আমদানি বাধাগ্রস্ত হয়। চুক্তিপত্রের ভাষ্য, পুরো প্রক্রিয়া হতে হবে স্বচ্ছ, বৈষম্যহীন ও অযথা জটিলতামুক্ত। পাশাপাশি এ ধরনের ব্যবস্থা যেন যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ক্ষুণ্ন না করে, তা-ও নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ, এর ফলে বাংলাদেশ তার বাজার ব্যবস্থাপনার স্বাতন্ত্র হারাতে বসেছে।
মার্কিন বা আন্তর্জাতিক মান ও কারিগরি বিধিমালা মেনে তৈরি পণ্য, যার সনদ সরকারি বা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পরীক্ষাগার থেকে দেওয়া হয়েছে-এমন মার্কিন পণ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অতিরিক্ত পরীক্ষা বা সামঞ্জস্যের কথা বলে মূল্যায়নের শর্ত আরোপ করতে পারবে না। অর্থাৎ বৈধ সনদ থাকলে পণ্য প্রবেশে নতুন করে বাধা দেওয়া যাবে না। এটা মার্কিনপণ্য জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার এক নগ্নপ্রয়াস মাত্র।
এই চুক্তির মাধ্যমে পণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা খর্ব করা হয়েছে।অর্থাৎ, এই বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে চীন, রাশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। চুক্তিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, নিষেধাজ্ঞা ও বিনিয়োগ নিরাপত্তা নীতির সঙ্গে সমন্বয় করতে তৃতীয় কোনো দেশের কোম্পানি বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে কম দামে পণ্য রপ্তানি করলে তা ঠেকানোর ব্যবস্থা নিতে হবে বাংলাদেশকে। যে কারণে বাংলাদেশের বাজারে মার্কিন পণ্য রপ্তানি বা অন্য কোনো দেশের বাজারে মার্কিন পণ্য রপ্তানি ব্যাহত হতে পারে।
চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে স্বার্থের সংঘাত আছে-এমন দেশ থেকে পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর বা জ্বালানি কেনার ওপর কড়াকড়ি শর্তারোপ করা হয়েছে।
আতংকের বিষয় হলো, চুক্তির আওতায় মার্কিনীরা বাংলাদেশ কাস্টমসের সব ডিজিটাল তথ্যের অধিকার চাচ্ছে। এমনকি আইপি আইনের ‘ডিজিটাল এনফোর্সমেন্ট রাইট’ চাচ্ছে। অর্থাৎ তারা আমাদের বন্দর ও কাস্টমসের সব ডেটা হাতে নিয়ে বসে থাকবে এবং উৎপাদকদের আমদানি করা কাঁচামালের লেবেল অনুসরণ করতে পারবে। অর্থাৎ প্রযুক্তি জাপানিদের, সিদ্ধান্ত আমেরিকানদের, স্বার্থ বহুজাতিক কোম্পানির। কিন্তু বাংলাদেশ কাস্টমস বিদেশিদের এজেন্ট হয়ে নিজের দেশের উৎপাদকদের ধরপাকড়ের কাজটি করবে। এতে বাংলাদেশ বড় ধরনের বাণিজ্য সমস্যায় পড়তে পারে। এ চুক্তি বহাল থাকলে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক গোপনীয়তা চরমভাবে ব্যাহত হবে; ফলে অধিকাংশ দেশ বা আমাদের উন্নয়ন অংশীদাররা বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক চুক্তি করতে চাইবে না। আবার কেউ কেউ চুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের মতো একতরফা সুবিধা চাইবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতোমধ্যে তার ইঙ্গিতও দিয়েছে যা বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ঘাটতির ঝুঁকি বাড়াবে।
বিশেষজ্ঞ মতে, এ চুক্তির মাধ্যমে মার্কিন বাণিজ্যিক স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) নীতিমালা উপেক্ষিত হয়েছে। চুক্তিতে যেখানে বাংলাদেশের স্বার্থ রয়েছে, সেখানে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নীতিমালা মানা হয়নি, আবার যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বেলায় ঠিকই এ বিশ্ব সংস্থার নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে।
সার্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ চুক্তিতে একতরফাভাবে মার্কিন অর্থনীতির নিরাপত্তা বিধান করা হয়েছে। নির্মোহ ও নিরপেক্ষ পর্যালোচনায় দেখা যায়, বস্তুত বাংলাদেশের সঙ্গে স্বাক্ষরিত এ বাণিজ্যচুক্তিকে প্রকারান্তরে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা ও সামরিক স্বার্থজনিত নীতি-কৌশলের অংশ হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ, চুক্তিটি যতটা না বাণিজ্যিক তার চেয়ে বেশি কূট রাজনৈতিক। চুক্তিতে এমন সব শর্তজুড়ে দেওয়া হয়েছে, যা বাংলাদেশের নীতিগত স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়েছে! উপরন্তু, এই চুক্তির মাধ্যমে আমেরিকা তার বহুল প্রত্যাশিত ইন্দোপ্যাসিফিক ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থের পথ সুগম করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির জটিল ষড়যন্ত্রের সম্মুখীন হতে পারে যা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে বিপন্নতার ঝুঁকিতে ঠেলে দিতে পারে।
চুক্তিটি ঘিরে দেশব্যাপী যখন সমালোচনার ঝড় বইছে তখন চুক্তিসংশ্লিষ্ট বাংলাদেশের মহল থেকে চুক্তিটিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি পূরণের এবং যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক আরোপিত ৩৭ শতাংশ শুল্কহার কমানোর কৌশল হিসেবে খোঁড়া যুক্তি দেখানো হয়েছে।
অথচ, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের আমদানি দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যানুযায়ী জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাস অবধি বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৯ হাজার ১০৪ কোটি টাকার পণ্য আমদানি করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৯ হাজার ৫৩৫ কোটি। অর্থাৎ , বেড়েছে ১০১ শতাংশ।
বিপরীতে, একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৩২ শতাংশ।
ইতোপূর্বে ট্রাম্প প্রশাসন কর্তৃক যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের উপর ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। উল্লেখিত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি(এআরটি) কে সামনে রেখে সর্ব সাকুল্যে শুল্কহার কমিয়ে
১৯ শতাংশে রাখা হয়। চুক্তির বিপরীতে এমন শুল্কহার কমানোকে ইউনুস সমর্থিত মহল থেকে বড় অর্জন হিসেবে দেখানো হচ্ছে যা খুবই হাস্যকর এবং দুঃখজনক বটে। এমতাবস্থায়, যুক্তরাষ্ট্র জোরপূর্বক শ্রমের অজুহাত তুলে অতিসম্প্রতি বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৬০টি দেশের পণ্যে নতুন করে ১০ থেকে সাড়ে ১২ শতাংশ বাড়তি শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে করে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর সর্বশেষ মার্কিন শুল্কহার ২৯ শতাংশ থেকে সাড়ে ৩১ শতাংশ পর্যন্ত গড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে, বাংলাদেশ যে লাউ সেই কদুই পেতে যাচ্ছে। বিনিময়ে লাভের লাভ(?) হিসাবে বাংলাদেশ পেল সার্বভৌমত্ব হারানোর একরাশ গোলামীর চুক্তি!
চুক্তিটি ৬০ দিনের নোটিশে বাতিল করার শর্ত দেওয়া হয়েছে। অথচ জুলাই অভ্যুত্থানের স্টেক হোল্ডারদের মধ্যে রাষ্ট্রের সতীত্ব ও ভবিষ্যতে অস্তিত্ব হারানোর এমন ভয়ংকর গোলামীর চুক্তির বিরুদ্ধে ন্যূনতম কোন আওয়াজ শোনা যাচ্ছে না। আওয়াজ উঠছে না অভ্যুত্থান প্রসূত রহস্যময় কিচেন ক্যাবিনেটের বিরুদ্ধে। তাদের এ হেন মৌনতা ইতোমধ্যে জনমনে গভীর প্রশ্নবোধক সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। ইতোপূর্বে স্বতন্ত্র সাংসদ ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা সংসদের গেল অধিবেশনের ২৪ তম দিনে পয়েন্ট অব অর্ডারে কথিত চুক্তির বিষয়টি 'দেশের স্বার্থবিরোধী' আখ্যা দিয়ে তা বাতিলের প্রস্তাব সংসদে উত্থাপনের আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু রহস্যজনক ভাবে সংসদের একজন সদস্যও তার এই প্রস্তাবের পক্ষে সমর্থন জানায়নি। বিশেষ করে জুলাই অভ্যুত্থানের গর্ভ থেকে জন্ম নেওয়া এনসিপির নির্বাচিত দুই সাংসদ নাহিদ ইসলাম ও হাসনাত আব্দুল্লাহ তো নাই-ই। অথচ সচেতন মানুষ এনসিপির এই দুই অতি তরুণ সাংসদের কাছ থেকে চুক্তির বিরুদ্ধে স্বচ্ছ ভূমিকা আশা করেছিল। কারণ তারা ছিলেন জুলাই অভ্যুত্থানের নেতৃস্থানীয় ফ্রন্টলাইনার। নাহিদ ইসলাম তো রীতিমতো অন্তর্বর্তী সরকারের বিশেষ নীতিনির্ধারকই ছিলেন। এর বাইরে আরো দু'জন জুলাই সমন্বয়ক- আসিফ মাহমুদ ও মাহফুজ আলম অন্তর্বর্তী সরকারে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ছিলেন। ড. ইউনুস ও তার অন্তর্বর্তীপর্ষদ এই এই তিন উপদেষ্টাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতেন। ড. ইউনুস তখন বহুবার ঘোষণা করেছিলেন যে, এদের কারণেই আজ তারা এই সরকার গঠন করতে পেরেছেন। তিনি বহুবার বলেছিলেন এই সরকার জুলাই চেতনা ধারণ করেই আবর্তিত হচ্ছে। অথচ, সেই আবর্তনের পরিণতি আমরা কি দেখলাম! ইতোমধ্যে, কিচেন ক্যাবিনেটের রাষ্ট্রবিধ্বংসী ক্রিয়াকলাপ জনসমক্ষে চাউর হওয়ার পর সমন্বয়ক উপদেষ্টারা সেই ক্যাবিনেটে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করছেন। অস্বীকার করেছেন খোদ পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মোহাম্মদ তৌহিদ হোসেন ও নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম. সাখাওয়াত হোসেন( অভ্যুত্থানে ব্যবহৃত নিষিদ্ধ ও ভয়ংকর মারণাস্ত্র ৭.৬২ স্ন্যাইপার রাইফেলের রহস্য উদঘাটনের আশাবাদ ব্যক্তের দায়ে যাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল মর্মে জনমনে দৃঢ় সন্দেহ আছে )। এই অস্বীকার কিচেন ক্যাবিনেটের গভীর প্রহসনকেই ইঙ্গিত করে। উপরন্তু, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা রেজিম চেঞ্জের এই জুলাই অভ্যুত্থানের নেপথ্যে মার্কিন ডিপস্টেটের ভূমিকারও ইঙ্গিত দিয়েছেন যা বিস্ময়কর বটে!এ প্রেক্ষিতে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তিনবার পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন। ধারণা করা হয়, তিনি ফ্যাসিস্টের দোসর ট্যাগে ভয়ংকর মবের কোপানলে পড়তে পারেন- এই ভয়ে তখন পদত্যাগ করেননি। পরিলক্ষণীয়, যারা ইউনুস সরকারের যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত সমালোচনা করতে গেছেন তারাই সরকার ও সরকার সমর্থিত গোষ্ঠীর কাছ থেকে 'ফ্যাসিস্টের দোসর' ট্যাগের হুমকি পেয়েছেন। এভাবেই গণতান্ত্রিক চর্চাকে বিগত দেড় বছর হত্যা করা হয়েছিল। যদিও এ হেন অপচর্চা এখন অনেকটাই কমে গেছে। কেননা, রহস্যের জট ক্রমশ খুলতে শুরু করেছে।ফলে, ট্যাগের প্রহসনী ব্লেমগেম সমাজ এখন অনেকটাই খায়না।
এমনকি, জুলাইঅভ্যুত্থানের থিঙ্কট্যাঙ্ক ও সমন্বয়কদের যাজক খ্যাত খোদ ফরহাদ মজহার এভাবে আশংকা করেছেন, 'যুক্তরাষ্ট্র এখানে রেজিম চেঞ্জ করেছে, তারাই এখন ক্ষমতায় রয়েছে, ক্ষমতা আমাদের হাতে নেই। সামনে অনেক বড় বিপদ রয়েছে।' যদিও অভ্যুত্থানের নেপথ্যে ডিপস্টেটের ভূমিকার বিষয়টি একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও উঠে এসেছে! অন্তর্বর্তী সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার এই চুক্তির বিষয়ে বিএনপি, জামায়াত ও বর্তমান বিরোধী দল (এনসিপি) দলের অবগতির কথা সরাসরি ব্যক্ত করেছেন। তিনি এ ও বলেছেন যে, এ কারণেই তারা এই চুক্তির বিরুদ্ধে কোন কথা বলছেন না।
ইতোমধ্যে জুলাই অভ্যুত্থানের রহস্য উন্মোচন হওয়ায় ও আকাঙ্ক্ষা ধ্বংস হওয়ায় অভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অংশীজনের মধ্যে অনুশোচনা দেখা দিয়েছে। অধিকাংশ সমন্বয়ক ও মুখপাত্রদের বিরুদ্ধে দূর্নীতির পাহাড়সম অভিযোগ চাউর হয়ে ভাসছে। জুলাই সংশ্লিষ্ট অনেকের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির রোমহর্ষক অভিযোগ আছে। কেউ কেউ হাতেনাতেও ধরা পড়েছেন। রাতারাতি সৃষ্ট তাদের বিলাসী জীবন ও বিলাসী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে ইতিমধ্যেই জনমনে গভীর সন্দেহ জন্ম নিয়েছে। এদের নেপথ্য সঞ্চালকদের 'ডিপস্টেট পেইড মেটিকুলাস ডিজাইনার ও প্ল্যানার' হিসাবে এখন অনেকেই গভীর সন্দেহ করছে। এ কারণে অভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট অনেক সচেতনরা এখন এই বলয় থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। তারা এখন সমন্বয়কদের কার্যকলাপের বিরুদ্ধে প্রখর সমালোচনা মুখর।
প্রসঙ্গত, জুলাই অভ্যুত্থানে আত্মাহুতি দেওয়া প্রতিটি প্রাণের সুপ্ত অথচ মহৎস্বপ্ন ছিল বৈষম্যহীন, সাম্য ও মানবিক মর্যাদার একটি সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার। অভ্যুত্থান পরবর্তী সেই স্বপ্নের সফল বাস্তবায়ন দেখতে চেয়েছিল এদেশের মানুষ। কিন্তু অভ্যুত্থান প্রসূত ইউনুস সরকার সংস্কারের ধোঁয়া তুলে সমাজ ও রাষ্ট্রের রন্ধ্রে-রন্ধ্রে যে বিধ্বংসী বীজ বপন করে গেছে তাতে সেই স্বপ্ন রীতিমতো সমূলেই শেষ হয়ে গেছে। তবে কী অভ্যুত্থানের নেপথ্যে কোনো দেশ বিধ্বংসী অপশক্তি অনুঘটক হিসাবে কাজ করেছে?সেই অনুঘটকরাই কী দেশপ্রেমিকের ছদ্মাবরণে দেশাত্মবোধের ভাবাবেগ সৃষ্টি করে কোটা বিরোধী আন্দোলনকে বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে রূপান্তরিত করে রেজিম চেঞ্জের অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিল শুধুমাত্র দেশকে বিপন্নে ঠেলে দেওয়ার জন্য? এরাই কী সেই স্বঘোষিত মেটিকুলাস ডিজাইনার যারা সমাজ বদলের বা রাষ্ট্র সংস্কারের ক্রেজ তুলে কোটা আন্দোলনের সম্ভবনাময় তরুণদেরকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিল শুধুমাত্র দেশকে অস্থিতিশীল করতে? সেই নৈরাজ্যের সুযোগে তারা কী দেশকে পূর্ব পাকিস্তানের ন্যায় মার্কিন পরাধীনতার শৃঙ্খলে বন্দি করে ২.০ তত্ত্বের নব্য ঔপনিবেশিক বাংলাদেশ সৃষ্টি করতে চায়? স্বঘোষিত মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী একটি চিহ্নিত গোষ্ঠী কখনোই এ দেশ ও জাতির অগ্রযাত্রাকে মেনে নেয়নি। তবে কী এরাই সেই মেটিকুলাস ডিজাইনার যারা 'রিসেট বাটন' তত্ত্বে '২৪ এর স্রেফ রেজিম চেঞ্জের গণঅভ্যুত্থান দিয়ে মহান '৭১ কে ম্লান করতে চায়? এরাই কি সেই মেটিকুলাস প্ল্যানার যারা দেশকে পৈশাচিক মবের কোপনলে ফেলে জাতির বীরোচিত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও চিরায়ত সংস্কৃতিতে একের পর এক আঘাত করে চলেছে দেশ ও জাতিকে চিরতরে পক্ষাঘাতগ্রস্ত [paralyzed] করতে? এভাবেই কী তারা '৭১ এর পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে চাইছে? এই অনিবার্য প্রশ্নগুলো এখন জনমনে জ্বলন্ত ভাবে উপলব্ধি হচ্ছে! জনমনে পরম ব্যথিত ভাবে উপলব্ধি হচ্ছে- গভীর রহস্যে আবৃত জুলাইঅভ্যুত্থানে বিসর্জিত প্রাণগুলোর নীরব আর্তনাদ।
লেখক- কলামিস্ট।