
সম্প্রতি দেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিলসহ নানা তৎপরতা ঘিরে পুলিশের পক্ষ থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া মিলছে। পুলিশের কেউ কেউ বলছেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলের তৎপরতার বিষয়ে আমাদেরকে গোয়েন্দা তথ্য দেওয়া হয় না। আগাম গোয়েন্দা তথ্য না পাওয়ায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলের তৎপরতা ঠেকানো যাচ্ছে না। আবার পুলিশের দায়িত্বশীল অনেক কর্মকর্তা বিষয়টি মানতে নারাজ। তাদের ভাষ্য যে, গোয়েন্দা তথ্য মিলছে, সেজন্যই দুই-একটা ছাড়া কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলের অধিকাংশ তৎপরতা ঠেকিয়ে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
গোয়েন্দা তথ্যের বিষয়টি বেশি আলোচনায় আসে সম্প্রতি রাজধানীর গুলশানে আওয়ামী লীগের মিছিল ঘিরে। কূটনৈতিকপাড়ায় দিনদুপুরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল কীভাবে মিছিল করল, পুলিশ কেন ঠেকাল না- সেই প্রশ্ন উঠে। তখন পুলিশের কেউ কেউ বলেছেন, তারা এই বিষয়ে আগাম গোয়েন্দা তথ্য পাননি। যদিও ঘটনাটিতে পুলিশের যোগসাজশের খবর আসে যমুনা টেলিভিশন চ্যানেলসহ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে।
এদিকে বরিশালে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল ও আকস্মিক তৎপরতার আগাম তথ্য সংগ্রহে গোয়েন্দা ব্যর্থতার অভিযোগ সম্প্রতি নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তারা আগাম খবর পাচ্ছেন না বলে জানা গেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বে থাকা অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোরও একই অবস্থা। তাদের মধ্যে সমন্বয়েরও অভাব রয়েছে। এতে দলটির কর্মসূচি শেষ হলে পুলিশের দৌড়ঝাঁপ শুরু হচ্ছে। অস্বস্তি বাড়ছে পুলিশের মাঠ প্রশাসনে। চাপে পড়ছেন তারা। তবে গোয়েন্দা তথ্য না পাওয়ার বিষয়টি মানতে নারাজ বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের (বিএমপি) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তাদের দাবি-তথ্য কিছু না কিছু পাওয়াই যায়। তা না হলে এত দিনে নগরে অনেক নাশকতা ঘটত। তবে ঝটিকা মিছিল হওয়ায় অনেক সময় সঠিক খবর পাওয়া মুশকিল হয়ে পড়েছে।
চলতি বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে বরিশালে আওয়ামী লীগের তৎপরতা বেড়েছে। শুরুর দিকে খুব ভোরে ঝটিকা মিছিল হতো। পরে দলীয় ও জাতীয় কিছু দিবসে বিক্ষোভসহ কর্মসূচি পালন করেছে তারা। বিশেষ করে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে নগরীর প্রধান সড়কে মিছিল হয়।
অভিযোগ উঠেছে, সম্প্রতি দলটির নেতাকর্মীরা ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম শুরু করেছে। গত ৬ আগস্ট বিএমপির কমিশনার হিসাবে যোগ দিয়েছেন আবু রায়হান মোহাম্মদ সালেহ। এর ঠিক পাঁচদিনের মাথায় বরিশালের আদালত প্রাঙ্গণে ঘটে ককটেল বিস্ফোরণ। ২৩ সেপ্টেম্বর ককটেল বিস্ফোরণ হয় নগরীতে ডিআইজি অফিস-সংলগ্ন মহাসড়কে। ১৫ থেকে ১৮ জনের একটি দল আওয়ামী লীগের পক্ষে মিছিল করে ককটেলটির বিস্ফোরণ ঘটায়। ওই ঘটনায় অভিযান চালিয়ে পাঁচজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দাদের তথ্য না পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তারা দলটির তৎপরতার আগাম তথ্য মাঠ প্রশাসনকে দিতে পারেনি। পরিচয় না প্রকাশের শর্তে থানায় কর্মরত বিএমপির একাধিক কর্মকর্তা বলেন, ছোটখাটো নানা বিষয়ে খবর মিললেও কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলের তৎপরতার আগাম তথ্য প্রায় আমরা পাই না। এমনিতেই মামলার তদন্ত আর নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখার চাপ রয়েছে। এর মধ্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলের তৎপরতার খবর আগেভাগে না পাওয়ায় জটিলতায় পড়তে হয়। সবচেড়ে বড় সমস্যা হচ্ছে-এ রকম ঘটনা ঘটলে এর সবটুকু চাপ এসে পড়ে আমাদের ওপর। কৈফিয়ত দেওয়া থেকে শুরু করে শাস্তির মুখোমুখি পর্যন্ত হই আমরা। অথচ আগাম গোয়েন্দা তথ্য পেলে এসব কর্মসূচি ঠেকিয়ে দেওয়া সহজ হতো।
এছাড়া বিএমপির সদর দপ্তরসহ গোয়েন্দা দপ্তরগুলোর মধ্যে কার্যক্রমের সমন্বয়েরও অভাব রয়েছে। পরিচয় না প্রকাশের শর্তে বিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, নানা বিষয়ে নিয়মিত যোগাযোগ হয় আমাদের। তবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলের তৎপরতার বিষয়ে আমাদেরকে গোয়েন্দা তথ্য দেওয়া হয় না।
এ বিষয়ে বিএমপি কমিশনার আবু রায়হান মোহাম্মদ সালেহ বলেন, গোয়েন্দা তথ্য পাওয়া যায় না, এটি ঠিক নয়। তথ্য পাওয়া যায় বলেই গত দুই মাসের মধ্যে নগরীর কেন্দ্রে মাত্র একটি অপতৎপরতা চালাতে পেরেছে তারা। সর্বশেষ যে ঘটনা, সেটিও তো নগরের বাইরে। পুলিশের তৎপরতা, চেকপোস্টের সংখ্যা বৃদ্ধি ও নিয়মিত টহলের কারণে নগরীর অভ্যন্তরে এখন আর ভিড়তে পারছে না তারা। তাছাড়া তারা মূলত ঝটিকা মিছিল করছে। তদন্তে দেখা গেছে, বাইরের উপজেলা ও ইউনিয়ন থেকে লোক এনে এরকম দু-একটি অপতৎপরতা করছে তারা। খুব বেশি লোক এর সঙ্গে জড়িত না থাকায় দু-একটি ঘটনা হয়তো জানার বাইরে থাকে। বাকি সবগুলোর খবর পেয়ে আগাম ব্যবস্থা নেওয়া হয় বলেই তাদের তৎপরতা কমে এসেছে।
আরেক প্রশ্নের জবাবে পুলিশ কমিশনার বলেন, চলতি মাসে এ পর্যন্ত কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলের এসব অপতৎপরতার সঙ্গে জড়িত ৭০ থেকে ৭২ জনকে আমরা গ্রেফতার করেছি। নিয়মিত অভিযান অব্যাহত আছে। আশা করি, ভবিষ্যতে তারা এরকম আর অপতৎপরতা করার সাহস পাবে না।
তথ্যসূত্র:যুগান্তর