দুবছরেও সংস্কা্র হয়নি ভাঙচুর করা ঢাবির‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ ভাস্কর্য চত্বর

ভাঙচুর করা হয় সড়কদ্বীপে থাকা ১১৬টি ভাস্কর্য
ডেস্ক রিপোর্ট
  ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩:৩৬
ঢাবির ফুলার রোডে সড়কের পাশে অবহেলায় পড়ে আছে শিল্পী শামীম শিকদারের গড়া ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ ভাস্কর্য চত্বর

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুলার রোডের ব্যস্ত সড়কের পাশে অবহেলায় পড়ে আছে শিল্পী শামীম শিকদারের গড়া ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ ভাস্কর্য চত্বর। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের বিভিন্ন জায়গায় যে ভাস্কর্য ভাঙা শুরু হয়, তা থেকে রেহাই পায়নি এটি। ভাঙচুর করা হয় সড়কদ্বীপে থাকা ১১৬টি ভাস্কর্যের প্রায় সব কটি। 
কোনো ভাস্কর্যের মাথা নেই, কোথাও মুখের অংশ ভাঙা, কোথাও হাত-পা বিচ্ছিন্ন। বিক্ষত ভাস্কর্যগুলো দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে মাটিতে লুটিয়ে আছে। চত্বরের সাত বীরশ্রেষ্ঠের ভাস্কর্যও ভাঙচুরের শিকার; তাদের মুখমণ্ডলের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত। মাইকেল মধুসূদন দত্ত, কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, লালনসহ মনীষীদের প্রতিকৃতির অনেকগুলোই এখনও ক্ষতবিক্ষত। ভাঙা ভাস্কর্যের অংশ দীর্ঘদিন এভাবে পড়ে থাকলেও সেগুলো সংস্কারের উদ্যোগ নেই।  
তরুণ শিল্প-সমালোচক শাহনাজ জাহান বলেন, ভাস্কর্য ভেঙে ফেলার সঙ্গে শুধু একটি শিল্পকর্মের ক্ষতি হয় না; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সময়, শিল্পীর ভাবনা এবং একটি সমাজের স্মৃতি। যখন ভাস্কর্য ভাঙা হয়, তখন রাষ্ট্রের ইতিহাসকেও মুছে ফেলার চক্রান্ত দৃশ্যমান হয়। ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ ভাস্কর্য যখন দুই বছরেও সংস্কার হয় না, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের মতাদর্শ প্রশ্নবিদ্ধ হয়। আমি মনে করি, ক্ষতিগ্রস্ত ভাস্কর্য পুনর্নির্মাণের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা প্রয়োজন।
এদিকে দুই বছরেও ভাঙা ভাস্কর্য সংস্কার না হওয়ায় প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন। ১৫ সেপ্টেম্বর সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতাকর্মীরা ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ চত্বরে ভাঙা ভাস্কর্যগুলোর চোখ ও মুখে কালো কাপড় বেঁধে দেন। দ্রুত সংস্কার, পুনর্নির্মাণ ও যথাযথ সংরক্ষণের দাবি জানানো হয়। ছাত্র ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি সৈকত আরিফ বলেন, ‘জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। ক্ষতিগ্রস্ত ভাস্কর্যগুলো রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গণতান্ত্রিক আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক একটি ভাস্কর্য চত্বর প্রায় দুই বছর ধরে ভাঙা অবস্থায় পড়ে থাকা গ্রহণযোগ্য নয়।
বিজয় দিবসের আগেই ভাস্কর্যগুলো সংস্কার করে সাধারণের জন্য খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছে ছাত্র ফেডারেশন। সংগঠনটির তরফে ১৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। শিক্ষক, সংস্কৃতিকর্মী ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে নিয়ে বৃহত্তর কর্মসূচি নেওয়ার কথাও জানান সৈকত।
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, শুধু ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ নয়, ক্যাম্পাসের ক্ষতিগ্রস্ত সব ভাস্কর্য সংস্কারের বিষয়ে প্রধান প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা হয়েছে। তবে সংস্কারকাজ কবে শুরু হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা দিতে পারেননি তিনি। উপাচার্য বলেন, প্রধান প্রকৌশলীর সঙ্গে বৈঠক করে ভাস্কর্যগুলো সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নজরে রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মো. ইসরাফিল রতন বলেন, ভাস্কর্যগুলো নিয়ে একটি কমিটি হয়েছে। তবে যেসব শিল্পী এগুলো নির্মাণ করেছেন, তাদের মতামত নেওয়া জরুরি। শিল্পীদের মতামত পাওয়া না গেলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে নিজেদের উদ্যোগেই সংস্কারের ব্যবস্থা করতে হবে।
চারুকলা অনুষদের ডিন শেখ আজহারুল ইসলাম বলেন, ভাস্কর্যগুলো নিয়ে এর আগে একাধিক বৈঠক হয়েছে। ভাস্কর শামীম সিকদার মারা যাওয়ায় এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকায় পুনঃস্থাপনের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হয়েছে। কোনো শিল্পীর সৃষ্টি ভেঙে যাওয়ার পর সেটি পুনর্নির্মাণের ক্ষেত্রে মূল শিল্পীর মতামতের প্রশ্ন আসে। দেশে ভাস্কর্য সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞের ঘাটতিও রয়েছে। 
ভাস্কর শামীম সিকদারের পরিকল্পনা ও নির্মাণে গড়ে ওঠে ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ ভাস্কর্য চত্বর। ১৯৮৮ সালে ফুলার রোডে ‘অমর একুশে’ নামে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়। ১৯৯০ সালের ফেব্রুয়ারিতে অধ্যাপক আহমদ শরীফ ভাস্কর্যটি উদ্বোধন করেন। ১৯৯৮ সালে উদয়ন স্কুলের নতুন ভবন নির্মাণ শুরু হলে এটি পাশের সড়কদ্বীপে স্থানান্তর করা হয়। পরে শামীম সিকদার ভাস্কর্যটির অবয়ব পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করে মুক্তিযুদ্ধ এবং বাঙালির দীর্ঘ মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসের আলোকে নতুনভাবে বিন্যস্ত করেন। এর নাম দেওয়া হয় ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’। 
১৯৯৯ সালের ৭ মার্চ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এটি উদ্বোধন করেন। মূল ভাস্কর্য ঘিরে রয়েছে ১১৬টি ভাস্কর্য। ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের স্বাধিকার আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন অধ্যায় এতে প্রতিফলিত হয়েছে। ৭ মার্চের ভাষণ, ২৫ মার্চের কালরাত্রি, স্বাধীনতার ঘোষণা ও বিজয়ের মতো ঐতিহাসিক ঘটনাও রয়েছে এর বিষয়বস্তুর মধ্যে।