
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নিউইয়র্ক সফরকে ঘিরে তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানের আনুষ্ঠানিক পরিচয় ও প্রটোকলগত মর্যাদা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে, জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনের বিভিন্ন অনুষ্ঠান এবং বিশ্বনেতাদের আয়োজিত নৈশভোজে তাকে ‘ফার্স্ট লেডি অব বাংলাদেশ’ নাকি ‘স্পাউস অব দ্য প্রাইম মিনিস্টার অব বাংলাদেশ’—কোন পরিচয়ে উপস্থাপন করা হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২১ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে এসেছেন। তার সঙ্গে রয়েছেন স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান। ২৪ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের পক্ষে ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। ফলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তার স্ত্রীর পরিচয়ও প্রটোকলের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রপ্রধান এবং প্রধানমন্ত্রী সরকারপ্রধান। সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির অবস্থান এবং ৫৫ অনুচ্ছেদে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগের বিষয়টি নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রী কোনো রাষ্ট্রীয় পদে থাকায় তার স্ত্রী স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোনো সাংবিধানিক পদ লাভ করেন না। তিনি মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, রাষ্ট্রদূত বা অন্য কোনো সাংবিধানিক পদধারী হন না।
বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতির স্ত্রীকে প্রচলিতভাবে ‘ফার্স্ট লেডি’ বলা হলেও ‘ফার্স্ট লেডি’ কোনো সর্বজনীন সাংবিধানিক পদ নয়। দেশভেদে এর ব্যবহারও ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্টের স্ত্রী ‘ফার্স্ট লেডি’ হিসেবে পরিচিত হলেও সংসদীয় সরকারব্যবস্থার অনেক দেশে প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রীকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই নামে অভিহিত করা হয় না।
বাংলাদেশ সরকারের প্রকাশিত Warrant of Precedence, 1986 (Revised up to July 2020)-এ প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রীকে পৃথক সাংবিধানিক পদধারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে তাকে ‘ফার্স্ট লেডি’ বলা হলে সেটি প্রচলিত বা আনুষ্ঠানিক সম্বোধন হতে পারে; এর মাধ্যমে নতুন কোনো সাংবিধানিক পদ সৃষ্টি হয় না।
আন্তর্জাতিক প্রটোকলে তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট পরিচয় হলো ‘Spouse of the Prime Minister of Bangladesh’, বাংলায় ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী’। এই পরিচয়ে তার মর্যাদা স্পষ্ট থাকে এবং তাকে এমন কোনো সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত দেখানো হয় না, যা আইন দ্বারা সৃষ্টি হয়নি।
জাতিসংঘের প্রটোকল ব্যবস্থায় রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সহধর্মিণীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে। সাধারণ বিতর্কে অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সহধর্মিণীদের উপস্থিতি আগেই জানানো হলে সাধারণ পরিষদ ভবনের ভিআইপি এলাকায় তাদের জন্য আসনের ব্যবস্থা করা হতে পারে। তাদের জন্য ভিআইপি পাসের ব্যবস্থাও রয়েছে। তবে এসব সুবিধা তারা পান রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানের সহধর্মিণী হিসেবে; এটি কোনো স্বতন্ত্র সাংবিধানিক পদ নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও বিদেশি কোনো প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রীকে মার্কিন ‘ফার্স্ট লেডি’ বলা হয় না। কোনো আনুষ্ঠানিক নৈশভোজে আমন্ত্রিত হলে তার পরিচয় সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারপ্রধানের সহধর্মিণী হিসেবেই দেওয়া হয়। আসন বিন্যাস ও অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ অবশ্য আয়োজক পক্ষের প্রটোকলের ওপর নির্ভর করে।
ডা. জুবাইদা রহমানের ক্ষেত্রেও জাতিসংঘের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তার পরিচয়, ভিআইপি পাস ও আসন-সংক্রান্ত বিষয় আগে থেকেই নির্ধারণ করার প্রয়োজন রয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী হিসেবে বিশেষ প্রটোকল সুবিধা পাওয়া এবং কোনো সাংবিধানিক পদে থাকা—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
সরকার চাইলে ভবিষ্যতে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণীর জন্য আনুষ্ঠানিক পরিচয় নির্ধারণ করতে পারে। সে ক্ষেত্রে সরকারি নথি, বিদেশ সফর, কূটনৈতিক যোগাযোগ ও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে কোন পদবি ব্যবহার হবে, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতির সহধর্মিণীর প্রচলিত ‘ফার্স্ট লেডি’ পরিচয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণীর পরিচয়ের পার্থক্যও নির্ধারণ করা যেতে পারে।
বর্তমান প্রকাশিত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ডা. জুবাইদা রহমানের জন্য নতুন কোনো স্বতন্ত্র সাংবিধানিক পদ বা ‘ফার্স্ট লেডি’ হিসেবে পৃথক রাষ্ট্রীয় মর্যাদা নির্ধারণের সরকারি সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে আন্তর্জাতিক আনুষ্ঠানিকতায় ‘Spouse of the Prime Minister of Bangladesh’ বা ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী’ পরিচয়টি তার অবস্থানকে সবচেয়ে সরাসরি ও স্পষ্টভাবে তুলে ধরে
সূত্র: ঠিকানা