বঙ্গোপসাগরে সাবমেরিন মোতায়েনের কথা ভাবছে পাকিস্তান

দাবি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের
ডেস্ক রিপোর্ট
  ১৮ জুন ২০২৬, ২৩:০৫

হাঙ্গর নামের সঙ্গে ইতিহাস জড়িয়ে আছে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সাবমেরিন পিএনএস হাঙ্গর বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধের সময় ভারতের আইএনএস খুকরি ডুবিয়ে দিয়েছিল। ভারতের স্বাধীনতার পর যুদ্ধকালীন সময়ে কোনো ভারতীয় নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ডুবে যাওয়ার এটিই ছিল প্রথম ঘটনা। ১৯৭১ সালের সেই রক্তাক্ত ধাক্কার ৫৫ বছর পর ‘হাঙ্গর’ নামটি আবার শিরোনামে। পাকিস্তানের নতুন হাঙ্গর-ক্লাস সাবমেরিন গত এপ্রিলে চীনে কমিশনিং হয়ে গত সপ্তাহে করাচিতে পৌঁছেছে। আর এর মধ্যেই পাকিস্তানের শীর্ষ নৌসামরিক কর্মকর্তারা আরব সাগরের সীমা ছাড়িয়ে আরও দূরবর্তী অঞ্চলে—বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে—ভূমিকা পালনের কথা বলছেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডের প্রতিবেদনে এই তথ্য দাবি করা হয়েছে।
পাকিস্তান নৌবাহিনীর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার মতে, এই সাবমেরিন ইসলামাবাদকে এমন সক্ষমতা দেবে যাতে তারা বঙ্গোপসাগরে উপস্থিতি বজায় রাখতে পারে। এই অঞ্চলটি তাদের নৌসীমা থেকে অনেক দূরে। ওই জ্যেষ্ঠ পাকিস্তান নৌবাহিনী কর্মকর্তার মাধ্যমে প্রকাশিত এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা এসেছে এমন এক সময়ে, যখন ভারতসহ ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন রাষ্ট্রে নৌ-প্রতিযোগিতা নতুন করে বিস্তার লাভ করছে।
বঙ্গোপসাগর ঐতিহ্যগতভাবে ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত। এটি ভারতের পূর্ব নৌ কমান্ডের (বিশাখাপত্তনমে অবস্থিত) ঘাঁটি এবং আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের কাছাকাছি। ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহন পথগুলোর জন্যও এই অঞ্চল ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
চীন থেকে এক বহর উন্নতমানের সাবমেরিন পাচ্ছে পাকিস্তানচীন থেকে এক বহর উন্নতমানের সাবমেরিন পাচ্ছে পাকিস্তান
এই জলরাশির তীরবর্তী দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে ভারত, বাংলাদেশ, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও শ্রীলঙ্কা, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নৌশক্তির উত্থানের কারণে নতুন ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব অর্জন করেছে।
এই কারণেই চলতি মাসের শুরুতে শ্রীলঙ্কায় এক পাকিস্তানি নৌবাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার মন্তব্যটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কলম্বোভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য মর্নিংয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তানের নতুন সাবমেরিন বহনকারী বহরের কমান্ডার কমোডর ওমর ফারুক বলেছেন—হাঙ্গর-শ্রেণির সাবমেরিন অন্তর্ভুক্তি পাকিস্তানকে বঙ্গোপসাগরে উপস্থিতি বজায় রাখার সক্ষমতা দেবে।
ওমর ফারুক এই সাবমেরিনকে ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে বর্ণনা করেন এবং জানান, পাকিস্তান এই শ্রেণির মোট আটটি সাবমেরিন যুক্ত করার পরিকল্পনা করছে। দ্য মর্নিং ৭ জুন এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে। চীন থেকে পাকিস্তানে ফেরার পথে তিনি শ্রীলঙ্কায় যাত্রাবিরতি করেন। কলম্বো বন্দরে পাকিস্তানি ফ্রিগেট পিএনএস তৈমুরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এই মন্তব্য করেন।
পিএনএস হাঙ্গর আসার আগে পাকিস্তান নৌবাহিনীর হাতে ছিল পাঁচটি সাবমেরিন। নতুন চীনা নির্মিত হাঙ্গর-শ্রেণির সাবমেরিনগুলো পুরোনো আগোস্তা সাবমেরিনগুলোর পরিবর্তে যুক্ত করা হচ্ছে।
ফারুকের মন্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এটি ইঙ্গিত দেয় ইসলামাবাদ এখন আর শুধু নিজ উপকূলীয় প্রতিরক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকতে চাইছে না; বরং ভারত মহাসাগরে আরও বিস্তৃত অপারেশনাল উপস্থিতির দিকে এগোচ্ছে—যা ভবিষ্যতে উচ্চ সমুদ্রে ভারতীয় বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি মুখোমুখি অবস্থার সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। বঙ্গোপসাগর কোনো একক দেশের আঞ্চলিক সমুদ্র নয়। আন্তর্জাতিক আইনে, উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলো তাদের উপকূল থেকে ১২ নটিক্যাল মাইল (২২ কিমি) পর্যন্ত আঞ্চলিক সমুদ্র এবং ২০০ নটিক্যাল মাইল (৩৭০ কিমি) পর্যন্ত এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন বা ইইজেডে সার্বভৌম অধিকার ভোগ করে।
এই সীমার বাইরে থাকে আন্তর্জাতিক জলসীমা, যেখানে বিভিন্ন দেশের সামরিক জাহাজ তুলনামূলক স্বাধীনভাবে চলাচল করতে পারে। তবে ভারতের জন্য বঙ্গোপসাগর দীর্ঘদিন ধরেই একটি কৌশলগত ‘ফ্রন্ট ইয়ার্ড’ হিসেবে বিবেচিত। এখানে রয়েছে ভারতের পূর্ব নৌ কম্যান্ড, গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র যোগাযোগ পথ, দ্বীপাঞ্চলীয় ভূখণ্ড এবং অবশ্যই ভারতের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল।