১২ মার্চ ত্রয়োদশ সংসদ অধিবেশন

প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব নিয়ে সাংবিধানিক জটিলতা

ডেস্ক রিপোর্ট
  ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০১

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকার এরই মধ্যে দায়িত্ব নিয়েছে। নির্বাচনের সরকারি ফলাফলের গেজেট প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে সংসদ অধিবেশন আহ্বানের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেই হিসাবে আগামী ১৫ মার্চের মধ্যেই হতে হবে সংসদের প্রথম অধিবেশন।  তবে নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে কে সভাপতিত্ব করবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পূর্ববর্তী দ্বাদশ সংসদের স্পিকার পদত্যাগ করায় এবং ডেপুটি স্পিকার কারান্তরীণ থাকায় এ নিয়ে এক ধরনের সাংবিধানিক জটিলতা দেখা দিয়েছে।  
যদিও সংসদের প্রথম অধিবেশনে নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হবেন বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। গতকাল রোববার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি ১২ মার্চ সংসদ অধিবেশন আহ্বান করবেন। সেই অধিবেশনে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হবেন। এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকার প্রণীত অধ্যাদেশগুলো উপস্থাপন করা হবে। সুপ্রস্তাব হবে প্রথামাফিক এবং রাষ্ট্রপতির ভাষণ হবে। আর অন্য বিষয়গুলো হবে সংসদের নৈমিত্তিক কার্যক্রম।
সংবিধান ও জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী পূর্ববর্তী সংসদের স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের নতুন সরকারের উদ্বোধনী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার কথা। তবে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে কে প্রথম অধিবেশন পরিচালনা করবেন, তার কোনো বিধান সংবিধানে নেই। অবশ্য কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী প্রথম অধিবেশন পরিচালনার জন্য রাষ্ট্রপতি কাউকে মনোনীত করতে পারেন। অথবা সাংবিধানিক শূন্যতা এড়াতে সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের কাছে পরামর্শ চাইতে পারেন রাষ্ট্রপতি। এভাবে আগামী ১৫ মার্চের আগে আহূত অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি মনোনীত ব্যক্তি সংসদ অধিবেশন পরিচালনার দায়িত্ব পেতে পারেন।
কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী, উল্লিখিত প্রক্রিয়ায় দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির সভাপতিত্বে সংসদের প্রথম অধিবেশনে নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন হবে। নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের শপথগ্রহণের মাধ্যমে নতুন সংসদের পূর্ণাঙ্গ যাত্রা শুরু হবে।
১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরদিন ২৯৭টি আসনের ফলাফল গেজেট আকারে প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতির কারণে গেজেটের তিন দিন পর সংবিধানের ১৪৮ (২ক) অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ বাক্য পাঠ করান। একই দিন রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিনের কাছে নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথগ্রহণের মাধ্যমে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকারের যাত্রা শুরু হয়। এর মাধ্যমে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্রজনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের অবসান হয়। দেশ পুনরায় গণতান্ত্রিক পথে যাত্রা করে।
তবে নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি। সংবিধানের ৭২(৬) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার তাহার উত্তরাধিকারী কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত স্বীয় পদে বহাল রহিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবে।’ 
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। কারণ বিলুপ্ত দ্বাদশ সংসদের প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের বেশির ভাগই দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। যারা দেশে আছেন, তারাও কারান্তরীণ। দ্বাদশ সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী আত্মগোপনে থেকে রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র দিয়েছেন। আর ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু ছাত্র হত্যার একাধিক মামলায় কারাগারে আছেন। এ অবস্থায় জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে কে সভাপতিত্ব করবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তারা আরও বলছেন, স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে প্রথম অধিবেশনে কে সভাপতিত্ব করবেন, তা সংবিধানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই। তবে জাতীয় সংসদের ১৯৭৪ সালে গৃহীত কার্যপ্রণালি বিধি (সংশোধিত ২০০৬) অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি এ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার জন্য একজনকে মনোনীত করতে পারেন। 
কার্যপ্রণালি বিধির ৫(১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘সংবিধানের ৭১ অনুচ্ছেদের (২) দফার (গ) উপ-দফায় বর্ণিত শর্তসাপেক্ষে, সাধারণ নির্বাচনের পর অনুষ্ঠিত সংসদের প্রথম অধিবেশনের পূর্বে সংসদে নির্বাচিত প্রত্যেক ব্যক্তি সংবিধানের তৃতীয় তপশিলে প্রদত্ত সংসদ সদস্যদের জন্য নির্ধারিত ফরমে বিদায়ী স্পিকারের এবং তাহার অনুপস্থিতিতে বিদায়ী ডেপুটি স্পিকারের এবং উভয়ের অনুপস্থিতিতে বিদায়ী স্পিকার কর্তৃক মনোনীত ব্যক্তির সম্মুখে এবং স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার উভয় পদ শূন্য থাকিলে স্পিকার নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত সংসদ সদস্যদের শপথ পরিচালনা ও সংসদে সভাপতিত্ব করিবার উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক মনোনীত কোনো ব্যক্তির সম্মুখে শপথ গ্রহণ বা ঘোষণা করিবেন এবং উহাতে স্বাক্ষর করিবেন।’
মূলত কার্যপ্রণালি বিধির এই ধারা অনুযায়ী সংসদের প্রথম অধিবেশনে স্পিকার নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি একজনকে সভাপতিত্ব করার দায়িত্ব দিতে পারেন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। অথবা সাংবিধানিক শূন্যতা পূরণে করণীয় বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের কাছে রাষ্ট্রপতি পরামর্শ চাইতে পারেন।
ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব নিয়ে শূন্যতা সম্পর্কে জানতে চাইলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. কে এম মহিউদ্দিন বলেন, সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী এই শূন্যতা পূরণ করতে রাষ্ট্রপতি একজনকে প্রথম অধিবেশনে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন পর্যন্ত দায়িত্ব দিতে পারেন। তবে সবচেয়ে ভালো হবে যদি সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্টের মতামত গ্রহণ করে সিদ্ধান্ত নেন। তখন ভবিষ্যতে আর এ নিয়ে বিতর্ক তৈরির অবকাশ থাকবে না।
সূত্র: সমকাল