
যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক পার্টির কংগ্রেস সদস্য ইলহান ওমরের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়েছেন কেন্দ্রীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার কর্মকর্তারা। এ ঘটনাকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে লক্ষ্যবস্তু করার ক্ষেত্রে ‘নজিরবিহীন পদক্ষেপ’ বলে বর্ণনা করেছে ওমরের দপ্তর।
গতকাল সোমবার ওয়াশিংটন ডিসির আশপাশে ওমরের বাড়িতে এ তল্লাশি চালানো হয়। আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন। নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে লড়বে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি। নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগে এই তল্লাশির ঘটনা ঘটল।
বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) এ বিষয়ে জানাশোনা আছে এমন দুজনের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ভোরে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ইনভেস্টিগেশনসের কর্মকর্তারা ওমরের বাড়িতে তল্লাশি চালান। অন্যদিকে ফক্স নিউজ অজ্ঞাতনামা সূত্রের বরাত দিয়ে বলেছে, ওমরের বাবা মারা যাওয়ার আগে তিনি শিশু থাকাকালে অভিবাসনসংক্রান্ত যেসব নথি জমা দিয়েছিলেন, সেগুলোতে জালিয়াতির অভিযোগের সঙ্গে এই তল্লাশির সম্পর্ক রয়েছে।
সোমালিয়ায় জন্ম নেওয়া ইলহান ওমর শিশু শরণার্থী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন। পরে তিনি দেশটির নাগরিকত্ব পান। মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের যে নির্বাচনী এলাকায় মিনিয়াপোলিস শহর রয়েছে, তিনি সেই এলাকার প্রতিনিধি। অভিবাসনসহ বিভিন্ন বিষয়ে ট্রাম্পের রাজনৈতিক আক্রমণের দীর্ঘদিনের লক্ষ্য তিনি।
সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে তল্লাশির নিন্দা জানান ওমর। তিনি অভিযোগ করেন, ট্রাম্প প্রশাসন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে লক্ষ্যবস্তু করতে কেন্দ্রীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে ব্যবহার করছে।
ওমর লেখেন, ‘আমি ঠিক আছি। ভুলে গেলে চলবে না, রাজনৈতিক শত্রুদের লক্ষ্যবস্তু করা এবং কেন্দ্রীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করার চেষ্টা এটি।’
তিনি আরও লেখেন, ‘গত ১০ বছর ধরে ট্রাম্প ভিত্তিহীন মিথ্যা ও অপপ্রচারের মাধ্যমে আমাকে লক্ষ্যবস্তু করেছেন। রাজনৈতিকভাবে ভয় দেখানোর সেই প্রচারণায় এটি সর্বশেষ পদক্ষেপ।’
ওমর বলেন, ‘আমি চুপ থাকব না।’
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ জানিয়েছে, আদালতের অনুমোদন নিয়ে জারি করা তল্লাশি পরোয়ানা কার্যকর করেছেন কর্মকর্তারা। তবে ওমরের নাম উল্লেখ করেনি বিভাগটি। তদন্তের বিষয়েও বিস্তারিত জানায়নি।
ওমরের দপ্তর এই অভিযানকে ‘ক্ষমতার নির্লজ্জ অপব্যবহার’ বলে অভিহিত করেছে। দপ্তরের বক্তব্য, ‘কংগ্রেস সদস্য কোনো অন্যায় করেননি। কোনো প্রেসিডেন্টেরই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ভয় দেখাতে কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা ব্যবহারের সুযোগ থাকা উচিত নয়।’
তল্লাশির নিন্দা জানিয়েছেন ডেমোক্রেটিক পার্টির আরও কয়েকজন নেতা। প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের নেতা হাকিম জেফ্রিস, হুইপ ক্যাথরিন ক্লার্ক এবং দলীয় ককাসের চেয়ারম্যান পিট আগুইলার এক যৌথ বিবৃতিতে ঘটনাটিকে ‘গভীরভাবে উদ্বেগজনক’ বলে বর্ণনা করেন।
বিবৃতিতে তাঁরা বলেন, ‘বছরের পর বছর ধরে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও উগ্র ডানপন্থীরা নোংরা ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং ভিত্তিহীন অভিযোগের মাধ্যমে কংগ্রেস সদস্য ওমরকে নিরলসভাবে লক্ষ্যবস্তু করেছেন।’
তাঁরা আরও বলেন, ‘মধ্যবর্তী নির্বাচনের ৩০ দিনেরও কম সময় আগে তাঁর ও তাঁর পরিবারের বাড়িতে হানা দিয়েছে ট্রাম্পের নির্বিচার গণ-নির্বাসন অভিযান পরিচালনাকারী যন্ত্র। অথচ তিনি জনগণের ভোটে নির্বাচিত একজন কংগ্রেস সদস্য।’
তল্লাশির কয়েক দিন আগে টেনেসিতে এক নির্বাচনী সমাবেশে ওমরকে অবমাননাকরভাবে আক্রমণ করেছিলেন ট্রাম্প। তিনি সোমালিয়াকে ‘অপরাধ ও নোংরামিতে ভরা’ দেশ বলে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে ইঙ্গিত দেন, ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স এবং তাঁর প্রশাসনের লোকজন ওমরকে নিয়ে তদন্ত করছেন।
তল্লাশির কয়েক ঘণ্টা পর সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, এ ঘটনার সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই। বিষয়টি ‘বিচার বিভাগের ওপর নির্ভর করছে’।
এর আগে ভ্যান্স প্রমাণ ছাড়াই ওমরের বিরুদ্ধে অভিবাসন জালিয়াতির অভিযোগ তুলেছিলেন। রক্ষণশীল ধারার পডকাস্ট উপস্থাপক বেনি জনসনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স বলেন, ওমরকে কীভাবে তদন্ত করা যায়, তা নিয়ে তিনি ও হোয়াইট হাউসের উপপ্রধান কর্মকর্তা স্টিফেন মিলার আলোচনা করেছেন।
সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স বলেন, ‘তাঁর বিরুদ্ধে কীভাবে পদক্ষেপ নেওয়া যায়? কীভাবে তদন্ত করা যায়? কীভাবে বাস্তবে সেই কাজটি করা যায়?’ এভাবে একটি মামলা তৈরির সম্ভাবনা নিয়ে তিনি আলোচনা করেন।
ওমরের দপ্তর আগেই ভ্যান্সের অভিযোগকে ‘মনগড়া ও মানহানিকর’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছিল। ২০১৮ সালে প্রথমবার প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন ইলহান ওমর। ট্রাম্পের বক্তব্যের কারণে তিনি ও তাঁর পরিবার মৃত্যুর হুমকি পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন। ওমরের ভাষায়, তাঁকে নিয়ে ট্রাম্পের অতিরিক্ত আগ্রহ ‘অস্বস্তিকর’।
ওমর প্রগতিশীল আইনপ্রণেতাদের একটি গোষ্ঠী ‘দ্য স্কোয়াড’-এর সদস্য। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ থেকেই এই গোষ্ঠীর আইনপ্রণেতারা বারবার তাঁর আক্রমণের শিকার হয়েছেন।
গত ডিসেম্বরে ট্রাম্প ওমর ও অন্য সোমালি অভিবাসীদের ‘আবর্জনা’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তাঁর স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণের সমালোচনা করার পর ওমর ও ডেমোক্রেটিক কংগ্রেস সদস্য রাশিদা তালিবকে ‘প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসার আওতায় নেওয়া’ এবং ‘যেখান থেকে এসেছেন, সেখানে ফেরত পাঠানোর’ কথা বলেন তিনি।
ইলহান ওমর কংগ্রেসে নির্বাচিত প্রথম আফ্রিকান শরণার্থী। তিনি ও রাশিদা তালিব প্রতিনিধি পরিষদে নির্বাচিত প্রথম দুই মুসলিম-আমেরিকান নারী।
এদিকে গত মাসে মিনেসোটার এক ব্যক্তিকে ১৪ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। গত জানুয়ারিতে একটি টাউন হল সভায় ওমরের গায়ে ভিনেগার ছিটানোর দায়ে তাঁকে এই সাজা দেওয়া হয়। ওই সময় মিনিয়াপোলিসে ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসনবিরোধী অভিযান জোরদার হয়েছিল। সভায় ওমর যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থা (আইসিই) বিলুপ্ত করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।