
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক অভিযানে অংশ নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের স্পেশাল ফোর্সের এক সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অভিযানে ব্যবহৃত গোপন তথ্য কাজে লাগিয়ে প্রেডিকশন মার্কেটে বাজি ধরে প্রায় ৪ লাখ ডলার লাভের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। খবর সিএনএন।
বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) মার্কিন বিচার বিভাগের প্রকাশিত অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, মাস্টার সার্জেন্ট গ্যানন কেন ভ্যান ডাইক ডিসেম্বরের শেষদিকে প্রেডিকশন মার্কেট প্ল্যাটফর্ম পলিমার্কেটে একটি অ্যাকাউন্ট খুলে প্রায় ৩২ হাজার ডলার বাজি ধরেন। তার বাজি ছিল—জানুয়ারির মধ্যে মাদুরো ক্ষমতা থেকে সরে যাবেন। সে সময় এই বাজি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়েছিল।
তবে তদন্তে উঠে এসেছে, ভ্যান ডাইক ‘অপারেশন অ্যাবসোলিউট রিজলভ’ নামের গোপন সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। বাজি ধরার আগেই তার কাছে অভিযানের গোপন তথ্য ছিল, যা ব্যবহার করেই তিনি লাভবান হন বলে অভিযোগ।
ফোর্ট ব্র্যাগে কর্মরত এই সেনাসদস্যের বিরুদ্ধে গোপন তথ্য চুরি ও অপব্যবহার, প্রতারণা এবং চুরিসহ মোট পাঁচটি ফৌজদারি অভিযোগ আনা হয়েছে। তিনি নর্থ ক্যারোলিনায় আদালতে হাজিরা দেবেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২৭ ডিসেম্বর থেকে ২ জানুয়ারির মধ্যে তিনি ১৩টি বাজি ধরেন। সর্বশেষ বাজিটি করেন অভিযানের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে। পরে অর্জিত ৪ লাখ ডলারের বেশি অর্থ প্রথমে বিদেশি ক্রিপ্টোকারেন্সি ভল্টে সরিয়ে নিয়ে পরে একটি অনলাইন ব্রোকারেজ অ্যাকাউন্টে জমা করেন, যা অর্থের উৎস গোপন করার চেষ্টা হিসেবে দেখছেন প্রসিকিউটররা।
মার্কিন নিউইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্টের অ্যাটর্নি জে ক্লেটন বলেন, ‘যাদের ওপর দেশের গোপন তথ্য সুরক্ষার দায়িত্ব, তারা যদি তা ব্যক্তিগত লাভের জন্য ব্যবহার করে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’
আদালতের নথিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, অভিযানের পর ভ্যান ডাইককে একটি ছবিতে সমুদ্রে থাকা একটি জাহাজের ডেকে সামরিক পোশাক ও অস্ত্রসহ অন্য সদস্যদের সঙ্গে দেখা যায়।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কমোডিটি ফিউচার ট্রেডিং কমিশনও তার বিরুদ্ধে পৃথক অভিযোগ দায়ের করেছে। সেখানে অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ ফেরত, ক্ষতিপূরণ এবং আর্থিক জরিমানার দাবি জানানো হয়েছে।
এর আগে সিএনএন জানায়, ফেডারেল প্রসিকিউটররা এই বাজির বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু করেছিলেন এবং ম্যানহাটনের অ্যাটর্নি অফিসের কর্মকর্তারা পলিমার্কেট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠকও করেন।
অভিযানের পর মার্কিন সেনাবাহিনী কারাকাসের প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ থেকে রাতের আঁধারে মাদুরোকে আটক করে নিউইয়র্কে নিয়ে আসে। সেখানে তিনি মাদক পাচার সংক্রান্ত অভিযোগে বিচার মোকাবিলা করছেন। তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
পলিমার্কেট জানিয়েছে, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে লেনদেনের বিষয়টি শনাক্ত করার পর তারা যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগকে অবহিত করে এবং তদন্তে সহযোগিতা করেছে। তাদের ভাষায়, ‘ইনসাইডার ট্রেডিংয়ের কোনো স্থান পলিমার্কেটে নেই।’
এদিকে প্রেডিকশন মার্কেটকে ঘিরে বিতর্ক বাড়ছে। গত এক বছরে এসব প্ল্যাটফর্মে লেনদেন ব্যাপক হারে বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে ইতোমধ্যে একাধিক বিল উত্থাপন করা হয়েছে, যাতে এই খাতকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা যায়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ভূরাজনৈতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাজি ধরা উদ্বেগজনক প্রবণতা। তিনি এ ঘটনাকে বেসবল তারকা পেট রোজের নিজের দলের ওপর বাজি ধরার সঙ্গে তুলনা করেন।
‘এটা ঠিক পিট রোজ নিজের দলের ওপর বাজি ধরার মতো,’ বলেন ট্রাম্প।
ইরান যুদ্ধকে ঘিরে বাজির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘পুরো বিশ্বই যেন এক ধরনের ক্যাসিনো হয়ে গেছে... সর্বত্র এই ধরনের বাজি চলছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি এতে সন্তুষ্ট নই।’
গত বছর ট্রাম্প প্রশাসন পলিমার্কেটকে যুক্তরাষ্ট্রে কার্যক্রম চালুর অনুমোদন দিলেও এর মার্কিন সংস্করণ এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি। মাদুরো-সম্পর্কিত বাজিগুলো করা হয়েছিল প্ল্যাটফর্মটির আন্তর্জাতিক সংস্করণে, যা মার্কিন আইনের বাইরে পরিচালিত হয় এবং যেখানে যুদ্ধসংক্রান্ত বাজি ধরার সুযোগ রয়েছে—যা যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভিপিএন ব্যবহার করে সহজেই মার্কিন নাগরিকরা এই অফশোর সাইটে প্রবেশ করতে পারেন।
প্রেডিকশন মার্কেটে ইনসাইডারদের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, এই প্ল্যাটফর্মগুলো গোপন তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর একটি মাধ্যম হতে পারে।
তবে মার্চ মাসে পলিমার্কেট নতুন নীতিমালা চালু করে, যেখানে গোপন তথ্যের ভিত্তিতে লেনদেন, এমন তথ্য ফাঁসকারীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য ব্যবহার এবং কোনো ঘটনার ফলাফল প্রভাবিত করতে পারে—এমন অবস্থানে থাকা ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।