
ইরানের তেলশিল্পের নিয়ন্ত্রণ নিতে চান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ইরানে তাঁর ‘অগ্রাধিকার হবে তেলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া’।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি জোরদারের প্রেক্ষাপটে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প এ কথা বলেন।
ট্রাম্প গতকাল রোববার ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে সাক্ষাৎকারটি দেন। ইরানের তেলশিল্পের নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে সম্ভাব্য এ পদক্ষেপের সঙ্গে তিনি ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতির তুলনা করেন।
যুক্তরাষ্ট্র গত জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার প্রতাপশালী নেতা নিকোলা মাদুরোকে তুলে নিয়ে যায়। এরপর দেশটির তেলশিল্পকে ‘অনির্দিষ্টকালের জন্য’ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে ওয়াশিংটন।
ট্রাম্পের এ মন্তব্য এমন সময়ে এল, যখন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যকে গভীর সংকটে ফেলেছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম হঠাৎ করে বেড়ে গেছে। মাত্র এক মাসে তেলের দাম ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। সোমবার এশিয়ার বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৬ ডলার ছাড়িয়ে যায়, যা এই সংঘাত শুরুর পর থেকে সর্বোচ্চের কাছাকাছি।
ট্রাম্প বলেন, ‘সত্যি বলতে, আমার সবচেয়ে পছন্দের বিষয় হলো, ইরানের তেল দখল করা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে কিছু বোকা লোক বলে, “আপনি এটা করছেন কেন?” তারা আসলে বোকা মানুষ।’
এ ধরনের পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের খারগ দ্বীপ দখল করতে হবে। ইরানের মোট তেল রপ্তানির সিংহভাগই এখান থেকে হয়।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ইতিমধ্যে জোরদার করা হয়েছে। পেন্টাগন ১০ হাজার সেনা মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছে। এই সেনারা ভূমি দখল ও নিয়ন্ত্রণে প্রশিক্ষিত।
গত শুক্রবার প্রায় ৩ হাজার ৫০০ সেনা অঞ্চলটিতে পৌঁছেছেন। এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার ২০০ মেরিন সেনা রয়েছেন। আরও ২ হাজার ২০০ মেরিন সেনা পথে রয়েছেন। পাশাপাশি ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের হাজারো সেনাকেও অঞ্চলটিতে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ইরানের খারগ দ্বীপে হামলা চালানো ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা হতাহতের সংখ্যা বাড়তে পারে। যুদ্ধের খরচসহ সময়সীমাও দীর্ঘ হতে পারে।
ট্রাম্প ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, ‘হয়তো আমরা খারগ দ্বীপ দখল করব, হয়তো করব না। আমাদের হাতে অনেক বিকল্প আছে। এমনও হতে পারে যে সেখানে (খারগ দ্বীপে) আমাদের কিছু সময় অবস্থান করতে হবে।’
খারগ দ্বীপে ইরানের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, ‘আমার মনে হয় না যে তাদের তেমন কোনো প্রতিরক্ষা আছে। আমরা খুব সহজেই এটি দখল করতে পারব।’
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়েছে। গত শুক্রবার সৌদি আরবের একটি বিমানঘাঁটিতে ইরানের হামলায় ১২ মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন। হামলায় ২৭০ মিলিয়ন ডলারের একটি মার্কিন ই-থ্রি সেন্ট্রি নজরদারি বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরাও ইসরায়েলের দিকে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে, যা নতুন মাত্রার উত্তেজনার আশঙ্কা তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এতে বৈশ্বিক জ্বালানি–সংকট আরও তীব্র হতে পারে।
ইরানের তেলশিল্প দখলের হুমকি দিলেও ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেছেন, পাকিস্তানি ‘প্রতিনিধিদের’ মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার পরোক্ষ আলোচনা ভালোভাবেই এগোচ্ছে।
ট্রাম্প ইরানকে একটি চুক্তি মেনে নেওয়ার জন্য ৬ এপ্রিল পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছেন। অন্যথায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জ্বালানি খাতে হামলা করবে বলে হুমকি দিয়েছেন তিনি।
হরমুজ প্রণালি আবার পুরোপুরি খুলে দেওয়ার লক্ষ্যে শিগগিরই কোনো যুদ্ধবিরতি চুক্তি হতে পারে কি না, এ বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রাম্প নির্দিষ্ট কিছু বলেননি। বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের প্রায় তিন হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো বাকি আছে। আমরা ইতিমধ্যে ১৩ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছি। আরও কয়েক হাজার লক্ষ্যবস্তু বাকি আছে। একটি চুক্তি দ্রুতই করা সম্ভব।’
গত সপ্তাহে ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘উপহার’ হিসেবে ইরান পাকিস্তানের পতাকাবাহী ১০টি তেল ট্যাংকারকে হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার অনুমতি দিয়েছে। তিনি ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, ট্যাংকারের সেই সংখ্যা এখন বেড়ে ২০–এ দাঁড়িয়েছে।
যদিও ট্রাম্পের এ দাবি তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ট্রাম্প আরও দাবি করেন, ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও দেশের অন্যতম শীর্ষ যুদ্ধকালীন নেতা মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ অতিরিক্ত ট্যাংকারগুলো অনুমোদন দিয়েছেন।
ট্রাম্প দাবি করেন, যুদ্ধের শুরুতে এবং পরবর্তী হামলাগুলোতে ইরানের দীর্ঘদিনের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ অন্য শীর্ষ কর্মকর্তারা নিহত হওয়ায় দেশটিতে ইতিমধ্যে শাসকের পরিবর্তন ঘটেছে। ইরানের যাঁদের সঙ্গে এখন তাঁরা আলোচনা করছেন, তাঁরা সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের মানুষ, তাঁরা খুবই পেশাদার।
সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প আবার দাবি করেন, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছেলে এবং ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি হয় মারা গেছেন অথবা তিনি গুরুতর আহত অবস্থায় আছেন।
তবে তেহরান জোর দিয়ে বলে আসছে, মোজতবা খামেনি নিরাপদ ও সুস্থ আছেন।
যদিও মোজতবা খামেনিকে দীর্ঘ সময় জনসমক্ষে দেখা না যাওয়ায় তাঁকে নিয়ে নানা জল্পনা তৈরি হয়েছে।