
বাংলার পাহাড় মানেই এক অন্যরকম মায়া। সেই মায়ার টানেই ভ্রমণপিপাসুরা বারবার ছুটে যান বান্দরবানের দুর্গম পথে। বান্দরবানের আলীকদম উপজেলায় অবস্থিত মারায়ন তং (Marayan Tong) বর্তমানে ট্রেকার এবং অ্যাডভেঞ্চার-প্রিয় মানুষের কাছে এক স্বপ্নের গন্তব্য। দিগন্তবিস্তৃত পাহাড়ের সারি, মেঘেদের লুকোচুরি আর নির্জন প্রকৃতির সান্নিধ্য পেতে মারায়ন তং-এর কোনো বিকল্প নেই। একে অনেকে ‘মারায়ন ডং’ নামেও ডেকে থাকেন। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৬৫০ ফুট উচ্চতার এই পাহাড়চূড়া আপনাকে দেবে এক অন্যরকম অভিজ্ঞতার স্বাদ।
মারায়ন তং-এর অবস্থান ও ভূপ্রকৃতি
মারায়ন তং মূলত বান্দরবান জেলার আলীকদম উপজেলার মিরিঞ্জা রেঞ্জের একটি পাহাড়। এটি চট্টগ্রাম বিভাগ থেকে বেশ কিছুটা দূরে হলেও যাতায়াতব্যবস্থা তুলনামূলক সহজ হওয়ায় পর্যটকদের আনাগোনা এখানে সব সময়ই থাকে। এর ভৌগোলিক অবস্থান একে অনন্য করেছে। পাহাড়ের চূড়া থেকে একদিকে যেমন কক্সবাজারের কিছু অংশ এবং মাতামুহুরী নদী দেখা যায়, অন্যদিকে দিগন্তজোড়া পাহাড়ের সারি এক বিশালত্বের অনুভূতি দেয়। পাহাড়ের উপরিভাগ সমতল হওয়ায় এটি ক্যাম্পিং করার জন্য আদর্শ একটি স্থান।
ইতিহাসের পাতা থেকে
মারায়ন তং পাহাড়ের চূড়ায় একটি বৌদ্ধমূর্তি রয়েছে, যা স্থানীয় ত্রিপুরা ও মারমা জনগোষ্ঠীর কাছে অত্যন্ত পবিত্র। লোককথা অনুযায়ী, পাহাড়ের ওপর এই বিশাল বৌদ্ধমূর্তি স্থাপনের মাধ্যমে এক সময় শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই পাহাড়টি স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কাছে একাধারে যেমন ধর্মীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থান, তেমনি তাদের জীবন-জীবিকার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বছরের বিশেষ কিছু সময়ে বৌদ্ধধর্মাবলম্বীরা এখানে তীর্থযাত্রার উদ্দেশ্যে সমবেত হন। তবে বর্তমানে এটি ধর্মের গণ্ডি পেরিয়ে পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মারায়ন তং যাওয়ার উপযুক্ত সময়
মারায়ন তং যাওয়ার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হলো শীতকাল (নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি)। এই সময় আবহাওয়া নাতিশীতোষ্ণ থাকে এবং পাহাড়ে আরোহণ করা সহজ হয়। তবে যারা মেঘের খেলা দেখতে ভালোবাসেন, তাদের জন্য বর্ষার শেষভাগ বা শরৎকাল চমৎকার হতে পারে। বর্ষায় পাহাড় পিচ্ছিল থাকলেও চারপাশের প্রকৃতি হয়ে ওঠে সতেজ ও সবুজ। গ্রীষ্মকালে প্রচণ্ড রোদে ট্র্যাকিং করা বেশ কষ্টসাধ্য হতে পারে। তাই গরমের সময়টা এড়িয়ে চলাই ভালো।
যেভাবে পৌঁছাবেন মারায়ন তং
ঢাকা বা দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে মারায়ন তং যেতে হলে আপনাকে প্রথমে চকোরিয়া বা বান্দরবান শহরে পৌঁছাতে হবে।
ঢাকা থেকে শ্যামলী, হানিফ, এস আলম বা সৌদিয়া পরিবহনের বাসে করে সরাসরি চকোরিয়া নামতে হবে। ভাড়া সাধারণত ৮০০ থেকে ১০০০ টাকার মধ্যে।
চকোরিয়া বাস টার্মিনাল থেকে লোকাল বাসে বা চাঁদের গাড়িতে (জিপ) করে আলীকদম যেতে হবে। আলীকদম যাওয়ার পথে ‘আবাসিক’ নামক এলাকায় নামতে হবে। এখান থেকেই মারায়ন তং ট্র্যাকিং শুরু হয়।
আবাসিক এলাকা থেকে পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে প্রায় ১.৫ থেকে ২ ঘণ্টা সময় লাগে। পাহাড়ি রাস্তা বেশ খাড়া। তাই ধীরে ধীরে বিশ্রাম নিয়ে ওঠাই বুদ্ধিমানের কাজ।
ভ্রমণে অভিজ্ঞতা
মারায়ন তং-এর আসল রূপ উপভোগ করতে হলে আপনাকে সেখানে অন্তত এক রাত তাঁবু টাঙিয়ে থাকতে বা ক্যাম্পিং করতে হবে। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে যখন সূর্যাস্ত দেখবেন, তখন মনে হবে রক্তিম আভা পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে মিশে যাচ্ছে। রাতের আকাশ এখানে একদম পরিষ্কার থাকে, আর ভাগ্য ভালো হলে মিলতে পারে মিল্কিওয়ে বা ছায়াপথের দেখা।
ভোরবেলায় মারায়ন তং রূপ নেয় এক মায়াবী রাজ্যে। তাঁবু থেকে বের হয়ে যখন দেখবেন চারপাশ মেঘের চাদরে ঢাকা এবং আপনার পায়ের নিচে ভাসছে মেঘের ভেলা। তখন মনে হবে পৃথিবীর সব ক্লান্তি এক নিমিষেই ধুয়েমুছে গেছে। নিচের গ্রামগুলো থেকে ভেসে আসা কুয়াশা আর মেঘের মিতালি আপনাকে অন্য কোনো গ্রহে নিয়ে যাবে।
প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও ট্র্যাকিং গাইড
মারায়ন তং যেহেতু একটি দুর্গম পাহাড়, তাই যাওয়ার আগে কিছু শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি প্রয়োজন:
জুতো: ট্র্যাকিং করার জন্য ভালো গ্রিপের কেডস্ বা বেল্ট স্যান্ডেল সঙ্গে রাখুন। পাহাড়ের রাস্তা অনেকটা ঢালু। তাই পিচ্ছিল জুতো নিয়ে বিপদে পড়তে পারেন।
পানির ব্যবস্থা: পাহাড়ে ওঠার পথে কোথাও পানি পাওয়ার সুযোগ নেই। তাই পর্যাপ্ত পানি এবং গ্লুকোজ বা স্যালাইন সঙ্গে রাখুন।
ভারি খাবার: চূড়ায় কোনো দোকান নেই। তাই নিচে আবাসিক এলাকা থেকেই শুকনো খাবার ও রাতের রান্নার সরঞ্জাম নিয়ে যেতে হবে।
সতর্কতা ও প্রয়োজনীয় নির্দেশনাবলি
পাহাড়ে ভ্রমণের সময় নিরাপত্তা এবং প্রকৃতির ক্ষতি না করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। মারায়ন তং ভ্রমণের ক্ষেত্রে নিচের বিষয়গুলো অবশ্যই খেয়াল রাখবেন:
• আবহাওয়া দেখে নিন: বৃষ্টির দিনে পাহাড়ে ওঠা বিপজ্জনক হতে পারে। অতিরিক্ত বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলে যাত্রা স্থগিত করুন।
• পরিবেশ রক্ষা: পাহাড়ে প্লাস্টিক, পলিথিন বা খাবারের উচ্ছিষ্ট ফেলবেন না। আপনার করা আবর্জনা নিজেই সঙ্গে করে নিচে নিয়ে আসুন।
• স্থানীয় সংস্কৃতিকে সম্মান: পাহাড়ের চূড়ায় বৌদ্ধমূর্তিটি স্থানীয়দের কাছে পবিত্র। তাই সেখানে কোনো উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করবেন না এবং জুতো নিয়ে মূর্তির বেদিতে উঠবেন না।
• একা ভ্রমণ করবেন না: পাহাড়ের পথ অনেক সময় বিভ্রান্তিকর হতে পারে। তাই গ্রুপে ভ্রমণ করুন অথবা স্থানীয় কাউকে গাইড হিসেবে সঙ্গে নিন।
• ফার্স্ট এইড কিট: ব্যান্ডেজ, অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম এবং প্রয়োজনীয় সাধারণ ওষুধ সঙ্গে রাখুন।
ক্যাম্পিংয়ের সরঞ্জাম ও খাদ্য তালিকা
মারায়ন তং-এ ক্যাম্পিং করার জন্য আপনাকে সঙ্গে তাঁবু, স্লিপিং ব্যাগ এবং রান্নার জন্য ছোট চুলা বা লাকড়ি বহন করতে হবে।
খাদ্য: সাধারণত পর্যটকরা রাতে বারবিকিউ বা খিচুড়ি রান্না করে থাকেন। রান্নার জন্য পানি পাহাড়ের নিচ থেকেই নিয়ে যেতে হয়, যা কিছুটা কষ্টসাধ্য। তাই শুকনো খাবার এবং প্রচুর পরিমাণে ফল সঙ্গে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ।
শেষ কথা
প্রকৃতি ও রোমাঞ্চ যাদের রক্তে মিশে আছে, তাদের জন্য মারায়ন তং এক স্বর্গরাজ্য। যান্ত্রিক জীবনের কোলাহল থেকে দূরে গিয়ে পাহাড়ের কোলে কয়েকটা দিন কাটানো আপনার মন ও শরীরকে দেবে নতুন উদ্যম। তবে মনে রাখবেন, পাহাড় আমাদের নয়, আমরা পাহাড়ের মেহমান। তাই পাহাড়ের পবিত্রতা ও সৌন্দর্য বজায় রাখা আমাদের প্রথম কাজ। মেঘ-পাহাড়ের মিতালি দেখতে আজই পরিকল্পনা করে ফেলুন আপনার পরবর্তী গন্তব্য–মারায়ন তং।