
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আগুন জ্বললে তার তাপ শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে না। তেহরান, তেল আবিব কিংবা হরমুজ প্রণালির উত্তেজনার সরাসরি প্রতিধ্বনি শোনা যায় নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসের মুদি দোকানে, ব্রুকলিনের রেস্তোরাঁয়, ব্রঙ্কসের ট্যাক্সিচালকের জীবনে, কুইন্সের ট্রাভেল এজেন্সিতে এবং আমেরিকার সাধারণ পরিবারের রান্নাঘরে। ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক সামরিক যুদ্ধ এখন শুধু কূটনৈতিক বা সামরিক সংকট নয়; এটি বাংলাদেশিসহ যুক্তরাষ্ট্রের সব আমেরিকান পরিবারের মাসিক বাজেটে নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে।
যুদ্ধক্ষেত্র হাজার হাজার মাইল দূরে হলেও অর্থনীতির দূরত্ব এখন প্রায় শূন্য। বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব কয়েক দিনের মধ্যেই আমেরিকার গ্যাস স্টেশনে দেখা যায়। গ্যাসোলিনের দাম বাড়লে শুধু গাড়ির ট্যাংক ভরার খরচ বাড়ে না; ট্রাকভাড়া, খাদ্য সরবরাহের ব্যয়, বিমানভাড়া, ব্যবসার পরিচালন ব্যয় বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত প্রতিটি পরিবারকে একই আয়ে বেশি খরচ সামলাতে হয়।
বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যবহৃত বিপুল পরিমাণ তেল ও জ্বালানি পণ্য এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এ অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়লেই তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয় এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়ে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বাজারে।
কয়েক মাস আগেও যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন গ্যাসোলিনের গড় মূল্য ছিল ৩ ডলারের নিচে। সাম্প্রতিক সংকটের পর অনেক এলাকায় তা ৪ ডলারের ওপরে উঠে গেছে। ফলে প্রতি গ্যালনে ভোক্তাদের ১.২৫ থেকে ১.৫০ ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয় করতে হচ্ছে। শুনতে অল্প মনে হলেও জাতীয় পর্যায়ে এর প্রভাব বিশাল। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিন প্রায় ৩৭৪ মিলিয়ন গ্যালন গ্যাসোলিন ব্যবহৃত হয়। সেই হিসাবে অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ প্রতিদিন ৪৬৭ থেকে ৫৬১ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। মাসে এই ব্যয় ১৪ থেকে ১৮ বিলিয়ন ডলার এবং বছরে ১৭০ থেকে ২১৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি একধরনের অঘোষিত অর্থনৈতিক চাপ, যা আন্তর্জাতিক সংকটের কারণে সাধারণ মানুষের ওপর এসে পড়ে। সরকার নতুন কোনো কর আরোপ না করলেও একই পণ্য ও সেবার জন্য এখন মানুষকে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। এই চাপ কোনো একটি কমিউনিটির নয়; বাংলাদেশি, ভারতীয়, পাকিস্তানি, হিস্পানিক, আফ্রিকান-আমেরিকান, শ্বেতাঙ্গ, আরব, চীনা, কোরিয়ানসহ আমেরিকার সব পরিবারই এর প্রভাব অনুভব করছে। তবে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে।
নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে এই চাপ আরও দৃশ্যমান। ট্যাক্সিচালক, উবারচালক, লিমোজিন চালক, ডেলিভারি কর্মী ও ট্রাকচালকদের জীবনে জ্বালানির দাম সরাসরি আঘাত হেনেছে। আগে যেখানে দৈনিক ৪০ ডলার গ্যাস খরচ হতো, এখন অনেককে ৬০ থেকে ৭০ ডলার পর্যন্ত ব্যয় করতে হচ্ছে। সপ্তাহে এই বাড়তি ব্যয় কয়েকশ ডলারে গিয়ে দাঁড়ায়। মাস শেষে সেটিই ভাড়া, বাজার, সন্তানের স্কুল খরচ কিংবা দেশে টাকা পাঠানোর সক্ষমতাকে কমিয়ে দেয়।
শুধু পরিবহন খাত নয়, ছোট ব্যবসায়ও এর প্রভাব পড়েছে। বাংলাদেশি মালিকানাধীন গ্রোসারি, রেস্তোরাঁ, মিষ্টির দোকান, হালাল মিট মার্কেট, ফার্মেসি ও খুচরা ব্যবসাগুলো বাড়তি পরিবহন ব্যয় এবং পরিচালন ব্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে। পাইকারি বাজার থেকে পণ্য আনা, ডেলিভারি ব্যবস্থা পরিচালনা এবং বিদ্যুৎ-গ্যাসের খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক ব্যবসায়ী পণ্যের দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন। এর ফলে শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা ভোক্তার ওপরই এসে পড়ছে।
খাদ্যপণ্যের বাজারেও এর প্রভাব স্পষ্ট। চাল, ডাল, তেল, মাংস, মাছ, সবজি, দুধ, ডিম, ফলমূলসহ প্রায় সব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সঙ্গে পরিবহন ব্যয় জড়িত। ট্রাকভাড়া ও জ্বালানি ব্যয় বাড়লে খাদ্যপণ্যের দামও বাড়ে। ফলে একই পরিমাণ বাজার করতে এখন আগের চেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। যেসব পরিবারে একাধিক সদস্য কর্মস্থলে যেতে গাড়ি ব্যবহার করেন, তাদের ওপর চাপ আরও বেশি।
ট্রাভেল ব্যবসায়ও বড় ধাক্কা দেখা যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ামুখী ভ্রমণ নিয়ে যাত্রীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বেড়েছে। অনেকেই বাংলাদেশ সফর স্থগিত করছেন। অনেকে টিকিট বুকিং দিচ্ছেন না, কেউ আগের বুকিং বাতিল করছেন, আবার কেউ পরিস্থিতি বুঝে অপেক্ষা করছেন। ফলে বাংলাদেশি মালিকানাধীন ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর বিক্রি কমে গেছে। ব্যবসা কমে যাওয়ায় কিছু প্রতিষ্ঠান কর্মঘণ্টা কমাচ্ছে, কেউ কেউ কর্মী ছাঁটাইয়ের মতো সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
জ্বালানির দাম বৃদ্ধি বিমান সংস্থাগুলোর পরিচালন ব্যয়ও বাড়িয়ে দিচ্ছে। তেলের দাম দীর্ঘ সময় বাড়তি থাকলে আন্তর্জাতিক রুটে বিমানভাড়া আরও বাড়তে পারে। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়বেন প্রবাসীরা, বিশেষ করে যারা পরিবার, অসুস্থ স্বজন, বিয়ে, জানাজা বা জরুরি কারণে বাংলাদেশে যেতে চান।
এই সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রেমিট্যান্স। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি নিয়মিত দেশে অর্থ পাঠান। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেকের পক্ষে আগের মতো অর্থ পাঠানো কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে এর প্রভাব বাংলাদেশের অসংখ্য পরিবারও পরোক্ষভাবে অনুভব করছে।
যুদ্ধের কারণে আর্থিক বাজারেও অস্থিরতা বাড়ছে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে শেয়ারবাজারে ওঠানামা বৃদ্ধি পায় এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। ৪০১(কে), আইআরএ, মিউচুয়াল ফান্ড ও অন্যান্য অবসর সঞ্চয় কর্মসূচিতে বিনিয়োগকারী বাংলাদেশিরাও এতে উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে, অবসরের কাছাকাছি থাকা ব্যক্তিদের জন্য বাজারের অস্থিরতা বড় উদ্বেগের কারণ।
তবে এই চাপের মধ্যেও ইতিবাচক দিক হলো, যুক্তরাষ্ট্র এখনো আনুষ্ঠানিক মন্দায় প্রবেশ করেনি। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে দেশটিতে ১ লাখ ৭২ হাজার নতুন চাকরি সৃষ্টি হয়েছে এবং বেকারত্বের হার প্রায় ৪.৩ শতাংশে স্থিতিশীল রয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা, প্রযুক্তি, স্থানীয় সরকার ও সেবা খাতে নতুন নিয়োগ অব্যাহত আছে।
তবু সাধারণ মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা ভিন্ন। চাকরি থাকলেও অনেক পরিবারের জন্য সঞ্চয় করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ মজুরি যতটা বাড়ছে; খাদ্য, ভাড়া, জ্বালানি, স্বাস্থ্যসেবা ও বিমার ব্যয় তার চেয়ে দ্রুত বাড়ছে। ফলে অর্থনীতির সরকারি সূচক ইতিবাচক থাকলেও মানুষের দৈনন্দিন জীবন ক্রমেই ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে।
ইতিহাস বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের বড় সংঘাত প্রায় সব সময়ই বিশ্ব অর্থনীতিকে নাড়া দিয়েছে। ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকট থেকে শুরু করে উপসাগরীয় যুদ্ধ, ইরাক যুদ্ধ কিংবা সাম্প্রতিক আঞ্চলিক উত্তেজনাÑপ্রতিবারই জ্বালানি বাজার প্রথম ধাক্কা খেয়েছে। জ্বালানি খাতের অস্থিরতা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে পরিবহন, খাদ্য, শিল্প, ভোক্তা ব্যয় এবং আর্থিক বাজারে।
বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য এই সংকটের আরেকটি সামাজিক দিক রয়েছে। অনেক প্রবাসী একই সঙ্গে আমেরিকার খরচ সামলান এবং বাংলাদেশে পরিবারের দায়িত্ব পালন করেন। কারও দেশে বাড়ির ঋণ আছে, কারও সন্তানের পড়াশোনার খরচ, কারও বাবা-মায়ের চিকিৎসা, কারও আত্মীয়ের বিয়ে বা পারিবারিক দায়িত্ব। নিউইয়র্কে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লে এই দুই দিক সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে।
এই বাস্তবতা শুধু বাংলাদেশিদের নয়, আমেরিকার সব অভিবাসী পরিবারই অনুভব করছে। হিস্পানিক পরিবারগুলো লাতিন আমেরিকায় রেমিট্যান্স পাঠায়, আফ্রিকান অভিবাসীরা নিজ নিজ দেশে সাহায্য পাঠান, দক্ষিণ এশীয় পরিবারগুলো দেশে আত্মীয়স্বজনকে সহায়তা করেন। ফলে জ্বালানি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি একধরনের বৈশ্বিক পারিবারিক সংকট তৈরি করে।
বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো সংঘাতের আরও বিস্তার। যদি ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায় এবং হরমুজ প্রণালিতে তেল সরবরাহ ব্যাহত হয়, তাহলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আরও বাড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে গ্যাসোলিনের পাশাপাশি ডিজেল, জেট ফুয়েল, বিদ্যুৎ, খাদ্যপণ্য ও বিমানভাড়ার খরচও নতুন করে বাড়বে।
যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেন রাষ্ট্রনেতারা, কিন্তু তার অর্থনৈতিক মূল্য পরিশোধ করেন সাধারণ মানুষ। বাড়তি জ্বালানি বিল, উচ্চ খাদ্যমূল্য, ব্যয়বহুল বিমানভাড়া, কমে যাওয়া সঞ্চয়, অনিশ্চিত বিনিয়োগ, কর্মসংস্থানের ঝুঁকি এবং জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের বোঝা শেষ পর্যন্ত এসে পড়ে শ্রমজীবী ও মধ্যবিত্ত মানুষের কাঁধে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্র আর আমেরিকার পরিবারের মধ্যে দূরত্ব হাজার হাজার মাইল হলেও অর্থনীতির হিসাবে সেই দূরত্ব এখন প্রায় শূন্য। ইরান সংকট যত দীর্ঘ হবে, তার আর্থিক অভিঘাতও তত গভীর হবে আর সেই চাপ বহন করতে হবে বাংলাদেশি কমিউনিটিসহ যুক্তরাষ্ট্রের সব পরিবারকেই।