
আদালতে একের পর এক ধাক্কা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির চারপাশে শুল্কের বিশাল দেওয়াল তুলতে মরিয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিশ্বজুড়ে ব্যাপক শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত মার্কিন সুপ্রিম কোর্টে খারিজ হওয়ার মাত্র কয়েক মাসের মাথায় ভিন্ন কৌশল নিয়ে মাঠে নেমেছেন তিনি। এবার বিশ্বজুড়ে জোরপূর্বক শ্রম বন্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ এনে বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় ৬০টি দেশের ওপর নতুন আমদানিশুল্ক আরোপের প্রস্তাব করেছে মার্কিন প্রশাসন।
গত মঙ্গলবার (২ জুন) যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয় (ইউএসটিআর) জানায়, যেসব দেশ জোরপূর্বক শ্রম দিয়ে পণ্য উৎপাদন বন্ধে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেয়নি, তাদের ওপর অন্তত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। এই তালিকায় বাংলাদেশসহ ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), যুক্তরাজ্যের মতো ঘনিষ্ঠ মিত্ররাও রয়েছে।
অন্যদিকে চীন, জাপান ও ভারতের মতো দেশগুলোকে দিতে হবে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক; কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এই দেশগুলো জোরপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে তৈরি পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করার বিষয়ে মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে কোনো চুক্তিতে সম্মত হয়নি।
বারবার বাধার মুখে ট্রাম্পের শুল্কনীতি
গত বছর মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই বিশ্বের অধিকাংশ দেশের আমদানির ওপর ব্যাপক শুল্ক আরোপ করেন ট্রাম্প। তিনি সে সময় আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইন (আইইইপিএ) প্রয়োগ করে এই পদক্ষেপ নেন।
ট্রাম্পের ১০ শতাংশ শুল্ক বাতিল হচ্ছে কাদের জন্য?
তবে গত ২০ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট রায় দেন, কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে আইইইপিএ ব্যবহার করে শুল্ক আরোপের আইনি ক্ষমতা ট্রাম্পের ছিল না।
রায়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভিন্ন আইনের আওতায় ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ক আরোপের নির্বাহী আদেশে সই করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। পরদিন তিনি ঘোষণা দেন, হার বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হবে এবং তা ‘তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর’ হবে।
হোয়াইট হাউজ জানায়, নতুন সেই শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল ১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের সেকশন ১২২-এর অধীনে। এই আইনের অধীনে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া সর্বোচ্চ ১৫০ দিন পর্যন্ত শুল্ক বজায় রাখা যায়। সেই অনুযায়ী এ অস্থায়ী শুল্কের মেয়াদ ২০২৬ সালের ২৪ জুলাই শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
নতুন শুল্ক কোন আইনে?
আদালতে একের পর এক ধাক্কা সামলে চড়া শুল্ক বজায় রাখতে ট্রাম্প প্রশাসন আইনের নানা ফাঁকফোকর ব্যবহার করে আসছে। এবার তারা বেছে নিয়েছে ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ‘সেকশন ৩০১’ ধারাটি।
এই আইনের অধীনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট যে কোনো দেশের ‘অন্যায্য বাণিজ্য নীতি’র বিরুদ্ধে স্থায়ী শুল্ক বসাতে পারেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে চীনের বিরুদ্ধে এই আইনটি ব্যবহার করেছিলেন এবং জো বাইডেনের প্রশাসনও তা বহাল রেখেছিল।
আইনি বিশ্লেষকদের মতে, এই ধারাটি সুপ্রিম কোর্টের আগের রায়ের তুলনায় আইনিভাবে অনেক বেশি শক্তিশালী। আগামী জুলাইয়ের শুরুতে এই বিষয়ে একটি গণশুনানি অনুষ্ঠিত হবে।
এবারও আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ার শঙ্কা
কৌশল বদলালেও ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত আবার মার্কিন আদালতে মুখ থুবড়ে পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) সাবেক উপ-মহাপরিচালক ও বিশিষ্ট আইনজীবী অ্যালান উলফ এক নিবন্ধে লিখেছেন, সেকশন ৩০১ আইনটি লেখা হয়েছিল একক কোনো ‘বিদেশি রাষ্ট্র’ বা দেশের অন্যায্য নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। কংগ্রেস কখনোই একসঙ্গে কয়েক ডজন দেশের ওপর পাইকারি শুল্ক বসানোর জন্য এই আইন তৈরি করেনি। আদালত এটিকে আবারও কংগ্রেসের শুল্ক আরোপের ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের নিজের হাতে নেওয়ার চেষ্টা হিসেবে দেখতে পারে, যা মার্কিন সংবিধানের পরিপন্থি।
এরই মধ্যে মার্কিন মিত্র ইইউ ট্রাম্পের এই শুল্ককে ‘অন্যায্য’ বলে অভিহিত করেছে। অন্যদিকে, চীন তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছে, তাদের দেশে কোনো জোরপূর্বক শ্রম নেই এবং শুল্ককে ‘রাজনৈতিক হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহারের বিরোধিতা করছে তারা।
কবে কার্যকর হচ্ছে এই নতুন শুল্ক?
ইউএসটিআর জানিয়েছে, প্রস্তাবিত নতুন শুল্কের বিষয়ে আগামী ৬ জুলাই পর্যন্ত জনসাধারণের মতামত নেওয়া হবে এবং ৭ জুলাই একটি গণশুনানি অনুষ্ঠিত হবে।
প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদপত্র দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের খবর অনুসারে, সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ২৪ জুলাইয়ের পর যে কোনো সময় এই শুল্ক কার্যকর হতে পারে। কারণ, গত ২০ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ট্রাম্পের মূল শুল্কনীতি বাতিলের পর একই দিনে যে ‘সাময়িক শুল্ক’ বসানো হয়েছিল, তার মেয়াদ আগামী ২৪ জুলাই শেষ হচ্ছে।
উপরন্তু, গত মাসে একটি বিশেষায়িত বাণিজ্য আদালত ট্রাম্পের ওই সাময়িক শুল্ককেও অবৈধ ঘোষণা করেছেন। তবে আদালতে মামলা চলাকালীন সরকার এই শুল্ক আদায় জারি রাখতে পারবে।
মোট শুল্কের হার কত হবে?
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, এই শুল্কগুলোকে মার্কিন প্রশাসন ‘অতিরিক্ত শুল্ক’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। এর ফলে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি রয়েছে, তার নির্ধারিত শুল্কের ওপর এই ১০ বা ১২ দশমিক ৫ শতাংশ যোগ হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
যেমন, গত বছরের জুলাইয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) তাদের পণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ শুল্ক মেনে নিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে চুক্তি করেছিল। এখন নতুন করে আরও ১০ শতাংশ যোগ হলে ইইউয়ের মোট শুল্কের হার দাঁড়াবে ২৫ শতাংশে।
এ কারণে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের বাণিজ্য কমিটির চেয়ারম্যান বার্ন্ড ল্যাঞ্জ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘মনে হচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন আগে শুল্ক বসানোর সিদ্ধান্ত নেয়, আর পরে সেটার পক্ষে সুবিধাজনক আইনি অজুহাত খোঁজে। ২০২৪ সালে ইইউতে জোরপূর্বক শ্রমের পণ্য নিষিদ্ধ করে আইন করার পরও মার্কিন তদন্তের এই ফল সম্পূর্ণ অবান্তর।’
বাংলাদেশের শুল্ক কত হবে
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যচুক্তি সই হয় চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি। চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কের হার নির্ধারণ করা হয় ১৯ শতাংশ।
এরপর মার্কিন সুপ্রিম কোর্টে ট্রাম্পের আগের শুল্কনীতি অবৈধ ঘোষণা হলেও বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত শুল্কহার বদলায়নি।
এখন নতুন করে ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক যোগ হলে বাংলাদেশের জন্য মোট শুল্কহার দাঁড়াবে ২৯ শতাংশে। এতে দেশের রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার দিক থেকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে ২৪ জুলাইয়ের পর যদি আগের শুল্ক বাতিল হয়, তবে বিশ্বের গুঁটিকয়েক দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের জন্য নতুন শুল্কহার দাঁড়াতে পারে ১০ শতাংশে। তেমনটি হলে অনেক দেশের তুলনায় রপ্তানি প্রতিযোগিতায় বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে বাংলাদেশ।
যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমান শুল্কের হার কেমন?
সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর যুক্তরাষ্ট্রে গড় আমদানিশুল্কের হার ১৪ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ২ শতাংশে নেমে এসেছিল। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন অবিলম্বে নতুন অন্তর্বর্তী শুল্ক আরোপ করায় বর্তমানে গড় শুল্কের হার ১১ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
এ ছাড়া ট্রাম্প প্রশাসন নির্দিষ্ট কিছু ব্র্যান্ডের ওষুধের ওপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক এবং মেক্সিকো ও কানাডা থেকে আমদানি করা গাড়ির ওপর শুল্ক বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে।
চাপ বাড়ছে মার্কিন ক্রেতাদের
অর্থনীতিবিদদের মতে, ট্রাম্পের এই শুল্ক নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। গত বছর মার্কিন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো লোকসান সামাল দিয়ে পণ্যের দাম বাড়ায়নি। কিন্তু চলতি বছর ‘লেভি স্ট্রস’ বা মসলা বিক্রেতা ‘ম্যাককরমিক’-এর মতো বড় বড় কোম্পানিগুলো সরাসরি পণ্যের দাম বাড়িয়ে শুল্কের বাড়তি খরচ ক্রেতাদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ট্যাক্স ফাউন্ডেশনের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৫ সালে ট্রাম্পের শুল্কনীতির কারণে মার্কিন প্রতি পরিবারকে গড়ে এক হাজার ডলার অতিরিক্ত কর দিতে হয়েছে। নতুন প্রস্তাবিত শুল্ক বাদ দিলেও, চলতি ২০২৬ সালে শুধু বিদ্যমান শুল্কের কারণেই পরিবার প্রতি খরচ বাড়বে আরও ৭০০ ডলার।
আবার, ইরান যুদ্ধ ও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি যখন মূল্যস্ফীতি বাড়াচ্ছে, তখন শুল্কের কারণে ইলেকট্রনিক্স, পোশাক, কার্পেট, কফি এবং নির্মাণ সামগ্রীর দামও আকাশচুম্বী হচ্ছে। হ্যারভার্ড ইউনিভার্সিটির একটি প্রাইস ট্র্যাকার নিশ্চিত করেছে, যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা টমেটো থেকে শুরু করে দৈনন্দিন সব পণ্যের দাম বাড়ার পেছনে প্রধান কারণ এই শুল্ক।
সুপ্রিম কোর্টের ধাক্কা সামলে ট্রাম্পের এই নতুন ‘সেকশন ৩০১’ চাল মার্কিন অর্থনীতিকে সচল করবে, নাকি নতুন করে আইনি ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করবে— এখন সেটিই দেখার বিষয়।
সূত্র: দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, আল-জাজিরা, সিএনএন, রয়টার্স