মমতার ‘এম’ ফ্যাক্টর কেন কাজ করল না!

বিশেষ প্রতিবেদন
  ০৭ মে ২০২৬, ১৩:০৬

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে বিজেপি। ক্ষমতা হারিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মেরুকরণ ও প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার মুখে তাঁর হাতিয়ার তিন ‘এম’ ফ্যাক্টর ঠিকভাবে কাজ করল না। 
এই তিন ‘এম’ ফ্যাক্টর গুলো হলো- মমতা, মহিলা ও মুসলমান। তৃণমূল নেত্রী মমতা ১৯৯৮ সালে কংগ্রেস থেকে আলাদা হয়ে দল তৈরি করেছিলেন। তিনি এই দলের সর্বময় নেত্রী। তাঁকে কেন্দ্র করে তৃণমূল কংগ্রেসের ২৮ বছরের কার্যকলাপ। গত ১৫ বছরের সরকারের নিউক্লিয়াস কালীঘাটের এই বাসিন্দা। কেন্দ্র হোক বা রাজ্য, গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে তিনি শেষ কথা। তৃণমূলের একমাত্র ভোট ক্যাচার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নিজেই বারবার বলেছেন, রাজ্যের ২৯৪টি কেন্দ্রে তিনিই প্রার্থী। 
এই বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্য জুড়ে চরকিপাক খেয়ে প্রচার করেছেন তৃণমূল নেত্রী। ২০২১ এর ভোটে হুইলচেয়ারে বসে জেলায় জেলায় প্রচার চালিয়ে বিজেপিকে পর্যুদস্ত করেছিলেন। এবারও তাঁকে দেখা গিয়েছে প্রধান প্রচারকের ভূমিকায়। কিন্তু এই নির্বাচনে তিনি দলকে জেতাতে পারলেন না। নিজেও জিততে পারেননি। 
রাজ্যর পাশাপাশি ভারতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো জনপ্রিয় ও অভিজ্ঞ কোনো নারী রাজনীতিক নেই। অনেকে বলেন, দক্ষিণ এশিয়াতেই তৃণমূল সুপ্রিমোর মতো শক্তিশালী নেত্রী পাওয়া যাবে না। তামিলনাড়ুর সাবেক মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতা প্রয়াত, উত্তরপ্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মায়াবতী কার্যত রাজনীতির বাইরে। 
এই পরিস্থিতিতে নারী হিসেবে মমতাকে পশ্চিমবঙ্গের নারী ভোটাররা দুই হাত তুলে সমর্থন করেছেন এত দিন। মমতা নারীদের জন্য চালু করেছেন লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মতো প্রকল্প, যার মাধ্যমে রাজ্যের সোয়া দুই কোটির বেশি নারীর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে সরাসরি টাকা পৌঁছে যায়। নাবালিকা মেয়েদের কথা মাথায় রেখে তিনি চালু করেছিলেন কন্যাশ্রী প্রকল্প যা আন্তর্জাতিক দরবারেও প্রশংসা কুড়িয়েছে। তাঁর চালু করা স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে নাম নথিভুক্ত হয় পরিবারের নারী সদস্যের অধীনে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব ভাতা বা প্রকল্প এবারের নির্বাচনে ততটা ফায়দা দেয়নি তৃণমূলকে। সে কারণে মূলত শহরের নারী ভোটারদের একাংশ তাঁর কাছে থেকে সরে গিয়েছেন প্রকল্পের সুবিধা পাওয়া সত্ত্বেও। কেন এমন হলো?
মুসলমানদের আস্থা


কংগ্রেস ও বামেরা পশ্চিমবঙ্গের দুর্বল হয়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে রাজ্যের সংখ্যালঘু ভোট মমতার পক্ষে চলে যায়। ২০১৬ সালে বিধানসভা ভোটে বাম-কংগ্রেস জোট তৃণমূলের কাছে পরাজিত হওয়ার পরে এই প্রবণতা বাড়ে। ২০১৯-এ বিজেপির উত্থানের জেরে আরো বেশি সংখ্যালঘু মুসলমান কংগ্রেস ও বামেদের সঙ্গ ছেড়ে মমতার হাত ধরেন। 
পশ্চিমবঙ্গের জনবিন্যাস অনুযায়ী ২৫ শতাংশ সংখ্যালঘু আছে এমন কেন্দ্রের সংখ্যা ১৪৬টি। ২০২১-এ এর মধ্যে তৃণমূল জয় পায় ১৩১টিতে। বিজেপি জেতে মাত্র ১৪ কেন্দ্রে। এবারের ফলাফলে এই সংখ্যা যথাক্রমে ৭৩ ও ৬৬।
পাঁচ বছর আগে তৃণমূলের পক্ষে মুসলমানদের আরো জোটবদ্ধ করেছিল এনআরসি বা নাগরিকত্বের ইস্যু। এবারও এসআইআর-এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রচার চালান মমতা। কিন্তু মালদা ও মুর্শিদাবাদের মতো জেলা যেখানে মুসলমানরাই সংখ্যাগুরু, সেখানে আসন হারিয়েছে তৃণমূল। 
গত বিধানসভা নির্বাচনে মুর্শিদাবাদে ২২টির মধ্যে ২০টি আসনে জিতেছিল তৃণমূল। এবার জয় এসেছে মাত্র নয়টি আসন। তৃণমূল প্রার্থীদের পেছনে ফেলে এই জেলায় কংগ্রেস দুটি ও বামেরা একটি আসনে জয়ী হয়েছেন। তৃণমূল ছেড়ে হুমায়ুন কবির পাশাপাশি দুটি আসনে লড়ে জিতেছেন। মালদার ১২টি আসনের মধ্যে দুটি হারিয়ে এবার তৃণমূল জিতেছে ছয়টিতে। আরেক সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জেলা উত্তর দিনাজপুরেও দুটি আসন হারিয়েছেন মমতা।
পশ্চিমবঙ্গে এমন ৯০টির মতো আসন আছে যেখানে মুসলমানদের জনসংখ্যা মোট জনসমষ্টির ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ। পর্যবেক্ষকদের মতে, তৃণমূলের পাশ থেকে সংখ্যালঘুদের একাংশ সরে গিয়েছে বলেই রাজ্য জুড়ে ৮০টির বেশি আসনে জিততে পারেনি দলটি।
বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন
মানুষের ক্ষোভের সঙ্গে তীব্র মেরুকরণের প্রভাবে তৃণমূল ধরাশায়ী হয়েছে। হিন্দু ভোটারদের বেশিরভাগই বিজেপির দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার সঙ্গে মিলে যেটা গেরুয়া ঝড় বইয়ে দিয়েছে রাজ্যে। 
এর পাশাপাশি তিনটি ‘এম’ ফ্যাক্টর কাজ না করায় তৃণমূল ৮০ আসনে আটকে গেছে, বিজেপি ২০৭ কেন্দ্রে জিতেছে। সাংবাদিক সুমন ভট্টাচার্য ডয়চে ভেলেকে বলেন, গত বিধানসভা নির্বাচনে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত আসনগুলোতে তৃণমূল একক আধিপত্য দেখিয়েছিল। এবার এই আসনগুলোর মধ্যে ৪৫ শতাংশে বিজেপি জিতেছে। প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার সঙ্গে যে হিন্দু ভোটের মেরুকরণ দেখা গেছে, এর ফলে তৃণমূল নারীদের একাংশের সমর্থন হারিয়েছে। 
সুমন বলেন, মমতার নিজস্ব কারিশমাতেও ঘাটতি দেখা গেছে। তাই তৃণমূল তাদের শক্ত ঘাঁটি কলকাতা, হাওড়া, হুগলি, উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব বর্ধমানে ভালো ফল করতে পারেনি। অর্থাৎ তিনটি এম ফ্যাক্টরের কোনোটাই ভালোভাবে কাজ করেনি।
সাংবাদিক শুভাশিস মৈত্র বলেন, মুসলমানরা যেখানে পছন্দের বিকল্প পেয়েছেন, সেখানে সরে গেছেন। মুর্শিদাবাদে এটা হয়েছে। এর ফলে বিজেপি কোথাও কোথাও জিতেছে। তবে সামগ্রিকভাবে মুসলমান ভোট মমতার থেকে সরে গেছে বিষয়টা এমনও নয়। শুধু নারী নন, সব স্তরের মানুষ তৃণমূলের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন। তাদের মধ্যে নারীরাও আছেন। 

শুভাশিস বলেন, তৃণমূল যে জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে, সেটা নেতৃত্ব বুঝতে পারেননি। কারণ, পঞ্চায়েত ও পৌরসভা নির্বাচনে তাদের হারাতে হয়নি। জনভিত্তি যে নড়ে গেছে, সেটা বোঝা গেল এই ভোটে।
অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মইদুল ইসলাম মনে করেন, তিন ‘এম’-এর সঙ্গে মতুয়া ফ্যাক্টর যোগ করতে হবে। কোনোটাই ঠিকঠাক করেনি তৃণমূলের পক্ষে। মুসলমান ভোট ভাগ হয়েছে। হিন্দু নারীদের ভোট তৃণমূলের দিকে প্রত্যাশা অনুযায়ী যায়নি। আরজি কর আন্দোলনের পরে ‘ব্র্যান্ড মমতা’ ধাক্কা খেয়েছে। বিশেষ করে কলকাতা, হাওড়া, হুগলি, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনাতে। ২০২৪ সাল থেকে গত দুই বছরে আরজি কর সবচেয়ে বড় আন্দোলন। মানুষ একটি উচিত শিক্ষা দেওয়ার অপেক্ষায় ছিল। তাই তারা ব্র্যান্ড মমতাকে প্রত্যাখ্যান করেছে।