
বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উৎপাদন ব্যবস্থা, শ্রমমান এবং শিল্প সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে নজরদারি শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। জোরপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করছে কিনা এবং বিভিন্ন দেশে উৎপাদন খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতা বা ‘ওভারক্যাপাসিটি’ তৈরি হয়েছে কিনা—এসব বিষয় খতিয়ে দেখতে একাধিক তদন্ত শুরু করেছে দেশটি। ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় নতুন করে অনিশ্চয়তার আবহ তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৬০টি দেশের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যে নতুন বাণিজ্য তদন্ত শুরু করেছে, তা আপাতদৃষ্টিতে কেবল নীতিগত যাচাই-বাছাই হলেও এর সম্ভাব্য প্রভাব বাংলাদেশের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে তৈরি পোশাকনির্ভর রফতানি অর্থনীতির জন্য এই তদন্ত ভবিষ্যতে নতুন শুল্ক, বাজার প্রবেশাধিকার সংকোচন কিংবা বাণিজ্য নীতিতে অতিরিক্ত চাপ তৈরির ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির দফতর (ইউএসটিআর) জানিয়েছে, ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের সেকশন ৩০১ অনুযায়ী এই তদন্ত পরিচালিত হবে। এতে খতিয়ে দেখা হবে—বাইরের দেশগুলো জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করতে কার্যকর ব্যবস্থা নিয়েছে কিনা এবং সংশ্লিষ্ট নীতি বা অনুশীলন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের ওপর কোনও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে কিনা।
মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার বলেছেন, আন্তর্জাতিকভাবে জোরপূর্বক শ্রমের বিরুদ্ধে ঐকমত্য থাকলেও অনেক দেশ এখনও এমন পণ্য তাদের বাজারে প্রবেশ ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। ফলে এসব অনৈতিক চর্চা মার্কিন শ্রমিক ও ব্যবসার জন্য প্রতিযোগিতামূলক ক্ষতি তৈরি করতে পারে।
এই তদন্তের আওতায় বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, চীন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন অঞ্চলের অর্থনীতিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একই সময়ে উৎপাদন খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতা বা ওভারক্যাপাসিটি রয়েছে কিনা—তা খতিয়ে দেখতে বাংলাদেশসহ ১৬টি দেশ ও অর্থনৈতিক অঞ্চলের বিরুদ্ধেও পৃথক তদন্ত শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
কেন এই তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ
বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, এই তদন্ত সরাসরি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়; তবে এটি ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক চাপ সৃষ্টির একটি প্রাথমিক ধাপ হতে পারে। তদন্তে যদি যুক্তরাষ্ট্র মনে করে যেকোনও দেশের নীতি তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর, তাহলে সেকশন ৩০১-এর অধীনে শুল্ক বৃদ্ধি, আমদানি সীমাবদ্ধতা বা অন্যান্য প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ যুক্তরাষ্ট্র দেশটির সবচেয়ে বড় একক রফতানি বাজার। তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্যের বড় অংশই যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি হয়। চলতি অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রফতানি হয়েছে প্রায় ৫ দশমিক ০৩ বিলিয়ন ডলার, যা মোট রফতানির প্রায় ১৯ দশমিক ৫০ শতাংশ।
অতএব, সম্ভাব্য নতুন শুল্ক বা বাণিজ্য সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হলে তা দেশের রফতানি প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং বিনিয়োগ পরিকল্পনার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
শুল্ক নীতিতে নতুন কৌশল
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই তদন্তের পেছনে সাম্প্রতিক একটি আইনি প্রেক্ষাপটও কাজ করছে। এর আগে জরুরি অর্থনৈতিক পরিস্থিতি দেখিয়ে বিদেশি পণ্যের ওপর যে ব্যাপক শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট সম্প্রতি সেই পদক্ষেপ বাতিল করে দেয়।
এরপর থেকে মার্কিন প্রশাসন বিকল্প আইনি কাঠামোর মাধ্যমে নতুন শুল্ক আরোপের পথ খুঁজছে। বর্তমানে ১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের সেকশন ১২২-এর আওতায় বিশ্বব্যাপী আমদানির ওপর ১০ শতাংশ অস্থায়ী শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, যার মেয়াদ আগামী জুলাইয়ে শেষ হওয়ার কথা।
এর পাশাপাশি সেকশন ৩০১-এর আওতায় তদন্ত চালিয়ে নির্দিষ্ট দেশ বা খাতভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি শুল্ক আরোপের পথ তৈরি করা হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের শুল্কের হার ভবিষ্যতে ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
বাংলাদেশের সম্ভাব্য ঝুঁকি
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, তদন্তের ফলাফল সরাসরি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্তে রূপ নাও নিতে পারে। তবে বৈশ্বিক বাণিজ্যে ক্রমবর্ধমান সুরক্ষাবাদী প্রবণতার প্রেক্ষাপটে এটি একটি সতর্ক সংকেত।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের অনেক দেশের ক্ষেত্রেই এই ধরনের তদন্ত পরিচালনা করে থাকে এবং এটি তাদের বৈশ্বিক নজরদারির অংশ। তবে এ বিষয়ে বাংলাদেশের প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন।
তার মতে, ‘অতি উৎপাদন’ বিষয়টি নির্ধারণ করা সহজ নয়। বাজার অর্থনীতিতে চাহিদা ও সরবরাহের ওঠানামার কারণে কখনও উৎপাদন বেশি হয়, কখনও কম হয়—এটি বাণিজ্যের স্বাভাবিক চক্রের অংশ।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশের রফতানি সাফল্য মূলত শ্রমঘন উৎপাদন, বেসরকারি উদ্যোক্তা উদ্যোগ এবং বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খলে সক্রিয় অংশগ্রহণের ফল। ভারী শিল্পে বড় ধরনের ভর্তুকি বা রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার কারণে এই সাফল্য আসেনি।”
শ্রমমানের প্রসঙ্গেও তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে ১৯৯০’র দশক থেকেই শিশুশ্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং শিল্প খাতে জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগও উল্লেখযোগ্যভাবে ওঠেনি।
বাণিজ্য রাজনীতির নতুন বাস্তবতা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই তদন্ত বৈশ্বিক বাণিজ্য নীতিতে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র এখন শিল্প উৎপাদন পুনরুজ্জীবিত করা এবং নিজস্ব শ্রমবাজার রক্ষার কৌশলের অংশ হিসেবে বাণিজ্য নীতি আরও সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করছে।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশের মতো রফতানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য এটি শুধু একটি দূরবর্তী ভূরাজনৈতিক ঘটনা নয়; বরং দেশের রফতানি কাঠামোর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। বিশেষ করে অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতার অভিযোগের আওতায় বাংলাদেশের মতো শ্রমঘন উৎপাদননির্ভর অর্থনীতিও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে বলে তিনি মনে করেন।
শ্রমমান ও সরবরাহ শৃঙ্খল নিয়ে নজরদারি
জোরপূর্বক শ্রম নিয়ে শুরু হওয়া তদন্তকে বিশ্লেষকরা অত্যন্ত সংবেদনশীল ইস্যু হিসেবে দেখছেন।
২০১৩ সালের রানা প্লাজা ধসের পর বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে নিরাপত্তা ও শ্রমমান উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য সংস্কার হয়েছে। তবু সরবরাহ শৃঙ্খলের কিছু অংশে অনানুষ্ঠানিকতা এবং শ্রম অধিকার বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা এখনও রয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
ড. সেলিম রায়হান বলেন, “বৈশ্বিক বাণিজ্য এখন ক্রমেই ভূরাজনীতি, শিল্পনীতি এবং সামাজিক মানদণ্ডের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে শুধু কম খরচে উৎপাদন করলেই বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।”
বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান মনে করেন, তদন্তের তালিকায় বাংলাদেশের নাম আসা কিছুটা অস্বস্তিকর হলেও এতে বড় ধরনের ঝুঁকি তিনি দেখছেন না।
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার কৌশলের অংশ হিসেবেই এ ধরনের তদন্ত পরিচালিত হচ্ছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের প্রধান রফতানি পণ্য তৈরি পোশাক, যা স্থানীয়ভাবে খুব বেশি উৎপাদিত হয় না। তবে তিনি বলেন, “যেহেতু তদন্ত শুরু হয়েছে, তাই সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর উচিত আগাম প্রস্তুতি নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপনের মাধ্যমে বিষয়টি মোকাবিলা করা।”
ভবিষ্যৎ কৌশল কী হতে পারে
বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের সামনে এখন কয়েকটি কৌশলগত পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে—
শ্রমমান ও সরবরাহ শৃঙ্খলের স্বচ্ছতা আরও জোরদার করা; রফতানি বাজার বৈচিত্র্যকরণ; উচ্চমূল্য সংযোজন পণ্যের দিকে অগ্রসর হওয়া; দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য আলোচনায় সক্রিয় কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই তদন্তকে শুধু হুমকি হিসেবে না দেখে একটি সতর্কবার্তা হিসেবেও বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ ভবিষ্যতের বৈশ্বিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতার মূল উপাদান হবে শুধু উৎপাদন খরচ নয়, বরং বিশ্বাসযোগ্যতা, শ্রমমান এবং শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো।
এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের চলমান তদন্ত বাংলাদেশের রফতানি অর্থনীতির জন্য তাৎক্ষণিক সংকট তৈরি না করলেও দীর্ঘমেয়াদে বাণিজ্য কৌশল পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি স্পষ্ট করে দিচ্ছে।
সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন