মহানবীর (সা.) জীবন থেকে স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের কৌশল

ধর্ম ডেস্ক
  ১১ জুন ২০২৬, ১৪:৪১


মানবজাতির কল্যাণে প্রেরিত সর্বশেষ রাসূল হজরত মুহাম্মদ (সা.) আমাদের শিখিয়েছেন, একটি আদর্শ দাম্পত্য জীবন তখনই সফল হয়, যখন তাতে ভালোবাসা, দয়া এবং মানসিক প্রশান্তি বজায় থাকে। তার দুই প্রিয় স্ত্রী হজরত খাদিজা (রা.) ও হজরত আয়েশা (রা.)-এর সঙ্গে কাটানো জীবনের সুন্দর গল্পগুলো থেকে আমরা এমন অনেক শিক্ষা পাই, যা বর্তমান যুগের দম্পতিদের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। মহানবী (সা.)-এর বৈবাহিক জীবন থেকে পাওয়া তিনটি প্রধান শিক্ষা নিচে তুলে ধরা হলো:
১. স্ত্রীর পরামর্শ ও মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া
তৎকালীন সমাজব্যবস্থায় নারীর প্রতি বৈষম্য বিদ্যমান থাকলেও প্রিয়তমা স্ত্রী হজরত খাদিজা (রা.)-এর সঙ্গে মহানবী (সা.)-এর সম্পর্ক ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। তিনি আমাদের দেখিয়েছেন যে, দাম্পত্য জীবনের মূল ভিত্তি হলো পারস্পরিক ভালোবাসা, বিশ্বাস এবং শ্রদ্ধা। বিয়ে মানেই শুধু পুরুষ সব সিদ্ধান্ত নেবে আর নারী সবসময় তার অনুগত থাকবে—ইসলাম এমন শিক্ষা দেয় না।
বরং আমরা দেখতে পাই, মহানবী (সা.)-এর স্ত্রী হিসেবে হজরত খাদিজা (রা.) ছিলেন একজন স্বাধীন ও সফল নারী। বিয়ের পরও তার ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড থেমে থাকেনি। সংসারে তিনি শুধু সাজিয়ে রাখার মতো কোনো অলঙ্কার ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন স্বামীর সমান অংশীদার, যেখানে স্বামী-স্ত্রী একে অপরের পরিপূরক হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন।হেরা গুহায় ফেরেশতা জিবরাইল (আ.)-এর মাধ্যমে প্রথম ওহী লাভের পর মহানবী (সা.) যখন কাঁপতে কাঁপতে বাড়ি ফিরলেন, তখন তিনি নিজেকে কম্বল দিয়ে ঢেকে দেওয়ার অনুরোধ করেন। হজরত খাদিজা (রা.) তাৎক্ষণিকভাবে অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় স্বামীকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। তিনি স্বামীর গুণাবলীর কথা মনে করিয়ে দিয়ে বলেন, আপনি তো এমন একজন মানুষ যিনি আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখেন, সত্য কথা বলেন, গরিব-দুঃখীদের পাশে দাঁড়ান এবং মেহমানদের আপ্যায়ন করেন। আল্লাহ তায়ালা আপনাকে কখনোই অপমানিত করবেন না।
এই ঘটনাটি প্রমাণ করে, খাদিজা (রা.) কীভাবে তার স্বামীকে মানসিক প্রশান্তি দিয়েছিলেন। তিনি মহানবী (সা.)-এর পাশে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন এবং সাহস জুগিয়েছিলেন। মহানবী (সা.)-ও তার স্ত্রীর পরামর্শ শুনতেন এবং মূল্যায়ন করতেন। তারা দুজনে মিলে জীবনের প্রতিটি কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছেন।
পবিত্র কোরআনের সূরা আর-রূমের ২১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয়ই এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে।
২.স্ত্রীর অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করা
একটি সুখী পরিবার গঠনে পারস্পরিক যোগাযোগ বা কথোপকথন কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা মহানবী (সা.) তার আচরণ দিয়ে শিখিয়েছেন। যোগাযোগ কখনোই একতরফা হওয়া উচিত নয়। বিয়েতে স্বামীর কোনো একচ্ছত্র বা স্বৈরাচারী কর্তৃত্ব নেই, বরং স্ত্রীরও তার অনুভূতি ও মতামত প্রকাশের পূর্ণ অধিকার রয়েছে।
হজরত আয়েশা (রা.)-এর সঙ্গে মহানবী (সা.)-এর দাম্পত্য জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায়, আয়েশা (রা.) তার মনের ভাব প্রকাশের পর্যাপ্ত স্বাধীনতা পেতেন। মহানবী (সা.) তার স্ত্রীর অনুভূতি খুব গভীরভাবে বুঝতেন। আয়েশা (রা.) কখন রেগে আছেন আর কখন খুশি আছেন, তা তার মুখের কথা বা শারীরিক হাবভাব দেখেই মহানবী (সা.) ধরে ফেলতেন।
একটি হাদিসে আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাকে বললেন, আমি খুব ভালো করেই জানি তুমি কখন আমার ওপর খুশি থাকো আর কখন রাগ করো। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি তা কীভাবে বোঝেন? তিনি বললেন, তুমি যখন খুশি থাকো, তখন বলো—হ্যাঁ, মুহাম্মদের রবের কসম! আর যখন তুমি অসন্তুষ্ট থাকো, তখন বলো—না, ইব্রাহিমের রবের কসম! আয়েশা (রা.) বলেন, আমি বললাম, হ্যাঁ, আল্লাহর রাসূল! রাগ করলে আমি কেবল আপনার নামটিই মুখে নেওয়া থেকে বিরত থাকি। (সহীহ বুখারী)
বর্তমান সমাজে অনেকে স্বামীর তথাকথিত শ্রেষ্ঠত্বের দোহাই দিয়ে স্ত্রীকে নিজের মতামত প্রকাশের সুযোগ দেন না। স্ত্রীর রাগ বা দ্বিমত পোষণ করাকে অবাধ্যতা বা বিদ্রোহ হিসেবে গণ্য করা হয়। অথচ মহানবী (সা.)-এর দেখানো ভালোবাসার আদর্শের সঙ্গে এই মানসিকতা সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।
৩. স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ
দাম্পত্য জীবনে মহানবী (সা.) সবসময় তার স্ত্রীদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতেন। আয়েশা (রা.)-এর গালের রঙ কিছুটা লালচে ছিল বলে ভালোবেসে তিনি তাকে হুমায়রা বা লালচে সুন্দরী বলে ডাকতেন, যা আয়েশা (রা.) খুব পছন্দ করতেন। ভালোবাসা বা স্নেহ প্রকাশের ক্ষেত্রে মহানবী (সা.) কখনোই কার্পণ্য করতেন না। আয়েশা (রা.) গ্লাসের যে অংশে ঠোঁট রেখে পানি খেতেন, মহানবী (সা.) ঠিক সেই অংশে ঠোঁট লাগিয়ে পানি পান করতেন।
হাদিসের বর্ণনায় আয়েশা (রা.) বলেন, আমি ঋতুবর্তী অবস্থায় পাত্র থেকে পানি পান করতাম, তারপর সেটি নবী (সা.)-কে দিতাম। তিনি পাত্রের ঠিক সেই জায়গায় তার পবিত্র মুখ রাখতেন, যেখানে আমি মুখ রেখেছিলাম এবং তিনি সেখান থেকে পানি পান করতেন। আবার আমি হাড় থেকে মাংস চিবিয়ে খাওয়ার পর সেটি নবী (সা.)-কে দিলে তিনি হাড়ের ঠিক সেই জায়গায় মুখ রেখে চিবাতেন, যেখানে আমি মুখ রেখেছিলাম। (সুনানে আন-নাসায়ী)
মহানবী (সা.) দেখিয়েছেন যে, দাম্পত্যের সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখতে এবং একে মধুর করতে দুজনেরই সমান প্রচেষ্টা ও দায়বদ্ধতা প্রয়োজন। তিনি ঘরের সব কাজ স্ত্রীর ওপর চাপিয়ে দিতেন না। ইসলামের ইতিহাস থেকে জানা যায়, মহানবী (সা.) নিজের ছেঁড়া জামা নিজেই সেলাই করতেন, জুতো মেরামত করতেন এবং ঘরের অন্যান্য কাজেও হাত বাড়াতেন।
আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, নবী (সা.) ঘরে কী করতেন? তিনি জবাবে বলেন, তিনি ঘরের কাজে তার পরিবারের সদস্যদের সাহায্য করতেন এবং যখন নামাজের সময় হতো, তখন নামাজের জন্য বের হয়ে যেতেন। (সহীহ বুখারী)
বর্তমানে আধুনিক দম্পতিদের জন্য এখানে বড় শিক্ষা রয়েছে। ঘরের কাজকর্ম শুধু নারীর একার দায়িত্ব নয়। পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে কাজ ভাগ করে নেওয়া উচিত। 
দাম্পত্য জীবনে ভালোবাসা, দয়া ও প্রশান্তির এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন মহানবী (সা.)। তিনি বলেছেন, তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম। আর আমি আমার পরিবারের কাছে তোমাদের চেয়েও বেশি উত্তম। (সুনানে তিরমিজি)