
দেরিতে শুরু হওয়া বাঙালির প্রাণের মেলা অমর একুশে বইমেলা-২০২৬ পর্দা নামল । বইমেলা আয়োজন নিয়ে দেরি করে সিদ্ধান্ত, পবিত্র রমজান মাস এবং শেষ সময়ে বৃষ্টির কারণে প্রকাশক ও অংশীজনদের অসন্তোষ ও ক্ষয়ক্ষতির মধ্য দিয়েই শেষ হচ্ছে এবারের বইমেলা।
নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যেই অনেকটা জোর করেই এবার মেলা শুরু করে বাংলা একাডেমি। গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট থাকায় অন্তবর্তী সরকার যথাসময়ে বইমেলা শুরু না করে পরে মেলা আয়োজনের উদ্যোগ নেয়। প্রকাশকদের অসন্তোষের মুখে প্রথমে ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে বইমেলা শুরুর ঘোষণা দেয় বাংলা একাডেমি।
তবে প্রকাশকরা ওই সময়ে বইমেলা আয়োজনের বিপক্ষে মত দেন। তাদের দাবি ছিল, ঈদের পর বইমেলা আয়োজন করতে হবে। কিন্তু বাংলা একাডেমি সে প্রস্তাবে রাজি হয়নি। পরে ১৮ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকের পর নতুন সিদ্ধান্ত জানায় বাংলা একাডেমি। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে অমর একুশে বইমেলা শুরু করার ঘোষণা দেওয়া হয়।
বৈঠকের সিদ্ধান্তে আরও জানানো হয়, বইমেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর স্টল ভাড়া সম্পূর্ণ মওকুফ করা হবে। ২০২৬ সালের বইমেলায় যেসব প্রকাশক আগে স্টল বরাদ্দ নেননি, তাদের ১৯ ফেব্রুয়ারি বিকাল ৩টার মধ্যে আবেদন করতে বলা হয় এবং একইদিন সন্ধ্যা ৬টায় তাদের স্টল বরাদ্দ দেওয়ার কথা জানানো হয়।
এরপর সাড়ে ৩০০ প্রকাশকের ঐক্য দাবি করে একটি পক্ষ জানায়, আগে যারা প্যাভিলিয়ন করেছে তারা প্যাভিলিয়ন রেখে দিলে তারা বইমেলায় অংশ নেবে না। এই পরিস্থিতিতে বাংলা একাডেমি প্যাভিলিয়ন সরানোর নির্দেশনা দেয়। পাশাপাশি প্যাভিলিয়ন অপসারণ এবং যারা টাকা জমা দিয়েও স্টল করতে পারেননি, তাদের অর্থ ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এসব সিদ্ধান্ত ও টানাপোড়েনের মধ্য দিয়েই শুরু হয় এবারের বইমেলা।
শনিবার (১৪ মার্চ) মেলা প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা গেছে, বই বিক্রির সংখ্যা সামান্য বাড়লেও পাঠক উপস্থিতি খুবই কম। প্রকাশকরা জানিয়েছেন, এবার নতুন বইয়ের সংখ্যাও আগের যেকোনও সময়ের তুলনায় কম। বই বিক্রিও কম হয়েছে, মেলায় জনসমাগমও তুলনামূলক কম।
বাংলা একাডেমির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অমর একুশে বইমেলায় মোট তিন হাজার ২৯৯টি নতুন বই প্রকাশিত হয়েছিল। এবার নতুন বই জমা পড়েছে মাত্র এক হাজার ৩৩৭টি, যা গত বছরের তুলনায় অনেক কম। স্টল ও বই—দুই ক্ষেত্রেই এবার সংখ্যা কমেছে।
অসন্তোষ ও ক্ষয়ক্ষতির মধ্য দিয়ে শেষ হচ্ছে বইমেলা
শুক্রবার পুথিনিলয় পাবলিকেশন ঘুরে দেখা গেছে, বিক্রয়কর্মীরা অলস সময় কাটাচ্ছেন। বিক্রি সম্পর্কে জানতে চাইলে পুথিনিলয় পাবলিকেশনের স্বত্বাধিকারী শ্যামল পাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যেকোনও সময়ের তুলনায় এবার বইমেলায় বিক্রি কম। গতবারের বিক্রির ১০ ভাগের এক ভাগও হয়নি। স্টলের বিক্রয়কর্মীর টাকাও উঠবে না। প্রত্যেক প্রকাশকেরই ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, অনেকের স্টলের খরচও উঠবে না।’
শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে ‘প্রকাশক ঐক্য’ জানিয়েছে, প্রায় পাঠকশূন্য এই মেলায় অংশ নিয়ে প্রকাশকরা ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন।
তাদের তথ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে ২০২৫ সালের বইমেলায় বিক্রি ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ কমেছিল। আর চলমান ২০২৬ সালের মেলায় বিক্রি কমেছে ২০২৫ সালের তুলনায় প্রায় ৮০ শতাংশ।
তাদের মতে, স্বাভাবিক বছরের তুলনায় এবার বই বিক্রি প্রায় ৭০ শতাংশ কম। এবারের বইমেলার ব্যবসায়িক পরিস্থিতি ২০২১ সালের করোনাকালীন মেলার চেয়েও খারাপ। অংশগ্রহণকারী প্রায় ৯০ শতাংশ প্রকাশকের স্টল নির্মাণের প্রাথমিক খরচও ওঠেনি। এর মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ প্রকাশকের ৫ হাজার টাকার বইও বিক্রি হয়নি।
এদিকে মেলার শেষ সময়ে সাধারণত যখন শেষ মুহূর্তের কেনাবেচায় মুখর থাকার কথা, ঠিক তখনই প্রকৃতি বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শুক্রবার সন্ধ্যার আকস্মিক বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ায় মেলার দৃশ্যপট বদলে যায়। শনিবার মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা গেছে, উৎসবের আমেজের বদলে প্রকাশকদের চোখেমুখে এখন ক্ষয়ক্ষতির দুশ্চিন্তা ও হতাশা।
শনিবার মেলার তথ্যকেন্দ্রে নতুন বই জমা পড়েছে ১৫৭টি।
মেলার ১৭তম দিনে শনিবার সকালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা যায়, অনেক স্টলের সামনে কাদা ও পানি জমে আছে। পলিথিন ও ত্রিপলের ওপর ভেজা বই সারিবদ্ধভাবে মেলে শুকাতে দেওয়া হয়েছে। রোদে বই শুকানোর দৃশ্যও দেখা গেছে। বিশেষ করে লেকপাড়ের স্টলগুলোর অবস্থা বেশি খারাপ।
অসন্তোষ ও ক্ষয়ক্ষতির মধ্য দিয়ে শেষ হচ্ছে বইমেলা
চমনপ্রকাশ স্টলের বিক্রয় প্রতিনিধি লেকপাড়ে ভেজা বই শুকাতে দিতে দিতে নিজের অসহায়ত্বের কথা জানান। তিনি বলেন, “গতকালের বৃষ্টিটা ছিল একেবারেই অনাকাঙ্ক্ষিত। সে সময় স্টলে আমি ছাড়া আর কেউ ছিল না। একা বই সরাতে দেরি হয়ে যায়। এর মধ্যেই অনেক বই ভিজে গেছে। ক্ষতির পরিমাণ এখনো ঠিকভাবে বলা যাচ্ছে না, তবে অনেক বই পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে।”
বড় প্রকাশনীগুলো কোনোভাবে পরিস্থিতি সামাল দিলেও সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন ছোট ও মাঝারি প্রকাশকরা।
প্রিয় বাংলা স্টলের প্রকাশক এস এম জসিম ভুঁইয়া বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, তার স্টলের অন্তত ১০০ থেকে ১২০টি বই পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, “যেগুলো বেশি ভিজেছে সেগুলো আমরা প্রকাশনীতে ফেরত পাঠাচ্ছি। সেগুলো আর ঠিক হবে না। এছাড়া আরও ৫০ থেকে ৬০টি বই কিছুটা ভিজেছে, সেগুলো শুকাতে দেওয়া হয়েছে। শুকালেও বইয়ের মান আগের মতো থাকবে না।”
প্রকাশক ঐক্যের পক্ষ থেকে আদর্শ প্রকাশনীর মাহাবুব রহমান বলেন, “মেলার ব্যবস্থাপনায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে—এটা বলা যাবে না। এখনো মেলা প্রাঙ্গণে কোথাও কোথাও বৃষ্টির পানি জমে আছে।”
তবে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ড. মোহাম্মদ আজম বলেন, “মাঠ থেকে লেকের দিকে যাওয়ার মতো এমন কোনও জায়গা নেই যেখানে পানির কারণে যাতায়াত পুরোপুরি ব্যাহত হচ্ছে।”
তিনি বলেন, “গতরাত থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত যান্ত্রিকভাবে পানি নিষ্কাশন করা হয়েছে। বেলা ১১টায় যখন আমি মেলা ঘুরেছি তখন কিছু জায়গায় হাঁটা কঠিন ছিল। তবে বিকাল ৫টায় আবার গেলে পুরো মেলায় শুধু একটি জায়গায়—বিদ্যা প্রকাশনীর স্টলের সামনে—পানি পেয়েছি। সেখানে ইট দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”