
কয়েক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে থেমে থেমে সংঘাত চললেও গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরানে হামলা চালায়নি যুক্তরাষ্ট্র। এ সময় পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত রয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে প্রচার চলছে। ধারণা করা হচ্ছিল, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ৩ নভেম্বরের নির্বাচন পর্যন্ত এই শান্ত পরিস্থিতি বজায় রাখতে চাইবেন। কারণ, যুদ্ধের বিষয়টি আবার সামনে এলে রিপাবলিকান প্রার্থীদের নির্বাচনি প্রচারে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তবে পরিস্থিতি ভিন্ন দিকেও যেতে পারে। প্রশাসনের দুই কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানা গেছে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর সম্ভাব্য পরিকল্পনা তৈরি করতে পেন্টাগনকে নির্দেশ দিয়েছে হোয়াইট হাউস। কর্মকর্তাদের মতে, নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম কমানো এবং সংঘাতে অগ্রগতি দেখাতে ট্রাম্প কতটা আগ্রহী, এই পরিকল্পনা তারই প্রতিফলন।
সম্ভাব্য হামলার পরিধি ও লক্ষ্যবস্তু এবং শেষ পর্যন্ত হামলা চালানো হবে কি না—এসব বিষয়ে এখনো আলোচনা চলছে। মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ড বা সেন্টকম এসব পরিকল্পনা তৈরি করছে।
পরিকল্পনার সমর্থকরাও স্বীকার করছেন, সীমিত হামলা একাই ইরানকে আলোচনায় বসাতে, হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌ চলাচল পুনঃস্থাপন করতে বা নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম কমাতে পারবে না। তবে তাদের ধারণা, কয়েক মাসের অস্বস্তিকর শান্তির পর সামরিক পদক্ষেপ নিলে ট্রাম্প শক্ত অবস্থান দেখাতে এবং কোনো ধরনের বিজয় দাবি করতে পারবেন।
তবে এমন হামলা মধ্যপ্রাচ্যে থাকা প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা এবং উপসাগরীয় মিত্রদের ইরানের পালটা হামলার ঝুঁকিতে ফেলবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডারও আরও চাপের মুখে পড়বে। বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করছেন, সীমিত ও অনির্ণায়ক হামলা মূল্যস্ফীতি কমানোর পরিবর্তে উলটো বাড়িয়ে দিতে পারে।
ওয়েক ফরেস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক উইল ওয়ালডর্ফ বলেন, সামরিক পদক্ষেপ এখন পর্যন্ত তেলের দাম কমাতে পারেনি; বরং এর বিপরীত প্রভাবই দেখা গেছে।
ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বেড়ে বসন্তে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১১৮ ডলারে পৌঁছেছিল। গত মাসে তা সাময়িকভাবে ১০০ ডলার ছাড়ালেও বর্তমানে প্রায় ১০০ ডলারের কাছাকাছি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসের গড় দাম এখন প্রতি গ্যালন ৪ দশমিক ৩৭ ডলার, যা যুদ্ধ শুরুর আগে ৩ ডলারের সামান্য কম ছিল।
এদিকে ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের চেষ্টা করা কয়েকটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে। এতে কিছু জাহাজ মালিক গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ ব্যবহারের বিষয়ে নতুন করে ভাবছেন। হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা মনে করছেন, এসব হামলা ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ তৈরির উদ্দেশ্যেই করা হচ্ছে।
একই সময়ে ওয়াশিংটন ও তেহরান মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পরোক্ষ আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে যুদ্ধবিরতি, হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার এবং নৌপথটি পুনরায় খুলে দেওয়ার শর্ত ও সময়সূচি নিয়ে বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন উপদেষ্টার মতে, সংঘাত শুরুর পর ইরান বর্তমানে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। দেশটির অর্থনীতি নড়বড়ে, মূল্যস্ফীতি বাড়ছে এবং নেতৃত্বের মধ্যেও বিভ্রান্তি রয়েছে। তবে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে হামলা চালালে ইরানকে চাপে ফেলার বদলে যুদ্ধ ও এর নেতিবাচক প্রভাবই ভোটারদের সামনে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে—যা রিপাবলিকানদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সূত্র: দ্য আটলান্টিক