
আইএসআইএল (আইএসআইএস) প্রতিহতের লক্ষ্য উপস্থাপন করে ইরাকে এতদিন অবস্থান করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা। গত বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে ১২ বছরের সেই অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বিষয়টি কুর্দি বাহিনীর জন্য নতুন বাস্তবতার সূচনা করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইরাকের কুর্দি বাহিনী পেশমারগা নামে পরিচিত। তারা নিবিড় সামরিক সমর্থনের জন্য জোট বাহিনীর ওপর নির্ভর করে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র বিশেষভাবে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেছে ওই অঞ্চলে। আলজাজিরার প্রতিবেদন বলছে, মার্কিন বাহিনীর সরে যাওয়া ওই অঞ্চলের জন্য নতুন রাজনৈতিক ও সুরক্ষা চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে ইরাকের জন্য।
২১ সেপ্টেম্বর ইরবিলভিত্তিক কুর্দিশ আঞ্চলিক সরকার (কেআরজি) জানায়, তারা কুর্দিশ সশস্ত্র বাহিনীকে একটি জোট বাহিনীর সঙ্গে একীভূত করেছে। কেআরজি প্রেসিডেন্ট নেচিরভান বারজানি বলেন, কুর্দিস্তানের একটি বাহিনী, একটি মন্ত্রণালয় ও একটি কমান্ডের প্রয়োজন।’
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও দোহাভিত্তিক আরব পারস্পেকটিভ ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক জেইডন আলকিনানির মতে, এই জোটবদ্ধকরণ ইরাককে স্থিতিশীল হতে সহায়তা করবে। তিনি বলেন, ‘ইরাকের ভেতরে সবচেয়ে ক্ষতিকর শত্রুতাগুলো রয়েছে কমিউনিটির মধ্যে। শিয়াদের নিজেদের মধ্যে, কুর্দিদের নিজেদের মধ্যে। কিন্তু তাদের একজনের সঙ্গে আরেকজনের না।’ তবে কাজ এখনও শেষ হয়নি। আলকিনানি বলেছেন, ‘পরীক্ষাটি হলো, এই জোট টিকে কিনা।’
কুর্দিস্তান আঞ্চলিক সরকারের পেশমারগা মন্ত্রণালয়ের সাবেক মহাসচিব অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল জাব্বার আল-ইয়াওয়ার আলজাজিরাকে বলেন, এসব দল বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক বিরোধে জড়িয়ে ছিল। এর মধ্যে ছিল কুর্দিস্তানের শাসনব্যবস্থা এবং বাগদাদের সঙ্গে সম্পর্কের মতো বিষয়।
তাঁর মতে, বাহিনীগুলো যদি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যুক্তই থাকে, তাহলে এসব বিরোধ সামরিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। মাঠ পর্যায়ে পেশমারগা মন্ত্রণালয় অবশ্য জোর দিয়ে বলছে, নতুন যুগের জন্য তাদের বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মেজর জেনারেল ওসমান মোহাম্মদ আলজাজিরাকে বলেন, পেশমারগা সব সময়ই পূর্ণ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। সীমিত সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ২০১৪ সালে আইএসআইএলকে প্রতিহত করার ক্ষেত্রে পেশমারগার ভূমিকার কথাও তিনি তুলে ধরেন। ইরাকের অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে পেশমারগার সম্পর্কের কথাও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, দুপক্ষের কমান্ডারদের মধ্যে খুব ভালো সহযোগিতা ও সমন্বয় রয়েছে।
আন্তর্জাতিক জোট তাদের মিশন শেষ করার পর এই সমন্বয় আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, এখন আইএসআইএলের তৎপরতা শনাক্ত ও তা প্রতিহত করতে ইরাকিরা নিজেদের সক্ষমতার ওপরই নির্ভর করছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নন-রেসিডেন্ট সিনিয়র ফেলো মোহাম্মদ সালিহ বলেন, ‘কুর্দিদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর সরে যাওয়াকে ঘিরে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ কাজ করছে।’ যুক্তরাষ্ট্র এতদিন কুর্দিস্তান অঞ্চলকে নিরাপত্তা দিচ্ছিল। ফলে এটি বহাল থাকবে কিনা– তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী যাওয়ার সময় আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নিয়ে গেছে। ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ, সাম্প্রতিক সময়ে ইরবিল ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে পড়েছে।
ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলি আল-জায়েদি দেশে সক্রিয় সব সশস্ত্র ও ইরানপন্থি গোষ্ঠীগুলোকে রাষ্ট্রের কাছে অস্ত্র সমর্পণের জন্য আগামী বছর ৩০ জুন পর্যন্ত নতুন সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন। ইরাকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক সামরিক জোটের মিশনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি উপলক্ষে গতকাল বৃহস্পতিবার দেওয়া এক বিবৃতিতে এই ঘোষণা দেন তিনি।
এর আগে এই অস্ত্র ত্যাগের চূড়ান্ত সময়সীমা ছিল ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর। তবে কাতায়েব হিজবুল্লাহসহ বেশ কিছু প্রভাবশালী ইরানপন্থি গোষ্ঠী এই সময়সীমা প্রত্যাখ্যান করায় সরকার তা পুনর্নির্ধারণ করে আরও ৯ মাস সময় বাড়িয়ে দেয়। নতুন রোডম্যাপ অনুযায়ী, প্রথমে মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোর হামলা ৯০ দিনের জন্য বন্ধ থাকবে এবং এর বিনিময়ে মার্কিন বাহিনীও তাদের ওপর কোনো হামলা চালাবে না। এর পর তারা ধাপে ধাপে অস্ত্র জমা দেবে। বেঁধে দেওয়া এই নতুন সময়সীমার পরও যেসব গোষ্ঠী অস্ত্র জমা না দিয়ে স্বাধীনভাবে কার্যক্রম চালাবে, তাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘আইন অমান্যকারী’ বা ‘অবৈধ’ হিসেবে ঘোষণা করা হবে।
ইরাকের প্রধানমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেছেন, যুদ্ধ ও শান্তির সিদ্ধান্ত নেওয়ার একমাত্র অধিকার সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষের। রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে কোনো অস্ত্র বা সামরিক শক্তি থাকবে না এবং সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের দেশের মূল নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে একীভূত করা হবে।