জাতিসংঘে অনুমোদন পেল নতুন বিশ্ব মানচিত্র

ডেস্ক রিপোর্ট
  ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪:৪৭


বিশ্বের ১৬০টিরও বেশি দেশ প্রায় ৫০০ বছরের পুরনো প্রচলিত বিশ্ব মানচিত্রের পরিবর্তে নতুন একটি মানচিত্র গ্রহণের পক্ষে ভোট দিয়েছে। নতুন মানচিত্রটিতে আফ্রিকা মহাদেশের প্রকৃত আয়তন আরো নির্ভুলভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
ষোড়শ শতাব্দীর মারকেটরের বিশ্ব মানচিত্রের ব্যবহার সীমিত করার জন্য আফ্রিকার দেশগুলো বছরের পর বছর ধরে প্রচারণা চালিয়ে আসছে। মানচিত্রটি মেরুর কাছের ভূখণ্ডগুলোকে প্রসারিত করে স্থলভাগের আপেক্ষিক আয়তনকে বিকৃত করেছে। ফলে গ্রিনল্যান্ডকে আয়তনে আফ্রিকার সমান বলে মনে হয়। তবে বাস্তবে মহাদেশটি গ্রিনল্যান্ডের চেয়ে প্রায় ১৪ গুণ বড়।
গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে এক অধিবেশনে আনুষ্ঠানিকভাবে মারকেটর প্রজেকশন বাতিল করে ২০১৮ সালের ‘ইকুয়াল আর্থ’ নকশার ওপর ভিত্তি করে তৈরি নতুন বিশ্ব মানচিত্র গ্রহণ করে সাধারণ পরিষদ। অধিবেশনে আফ্রিকার দেশ টোগোর পৃষ্ঠপোষকতা এবং আফ্রিকান ইউনিয়নের সদস্যদের সমর্থনে ‘মানচিত্র সংশোধন’ শিরোনামের প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দেয় ফ্রান্স, যুক্তরাজ্যসহ ১৬৪টি দেশ। বিপক্ষে ভোট দেয় একমাত্র যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির প্রতিনিধি প্রস্তাবটিকে ‘অপ্রয়োজনীয়’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
ছয়টি দেশ ভোটদানে বিরত ছিল। জাতিসংঘের প্রস্তাবনাগুলো বলবেযাগ্য নয়, তাই দেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন মানচিত্র ব্যবহার করতে বাধ্য করা হবে না বা পুরনোটি ব্যবহারে নিষেধও করা হবে না। তবে শিক্ষা, প্রযুক্তি ও প্রশাসনে মারকেটর প্রজেকশনের ব্যাপক ব্যবহারের পরিপ্রেক্ষিতে শ্রেণিকক্ষের পাঠ্যক্রম এবং দৈনন্দিন প্রযুক্তির হালনাগাদ করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
টোগো আফ্রিকান ইউনিয়নের পক্ষে প্রস্তাবটির জন্য একটি প্রচারণার নেতৃত্ব দিয়েছিল। প্রস্তাবটি পাস হওয়ার আগে বক্তব্য দিতে দিয়ে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট ডুসি বলেন, ‘এই আলোচনা কোনো রাজনৈতিক আলোচনা নয়, বরং একটি বৈজ্ঞানিক আলোচনা। কারণ এর বৈজ্ঞানিক প্রমাণ রয়েছে। তাই আমাদের সবাইকে এই বাস্তবতা মেনে নিতে হবে।’
১৫৬৯ সালে ফ্লেমিশ মানচিত্রকার জেরার্ডাস মারকেটর নাবিকদের সমুদ্রপথে দিকনির্দেশনায় সহায়তা করার জন্য ‘মারকেটর নকশা’ প্রবর্তন করেন। প্রায় পাঁচ শতাব্দী পরও এটি বিশ্বব্যাপী আদর্শ মান হিসেবে রয়ে গেছে। তবে এর প্রজেকশন পদ্ধতির কারণে নিরক্ষীয় অঞ্চলের কাছাকাছি থাকা এলাকাগুলো তাদের প্রকৃত আকারের চেয়ে অনেক ছোট দেখায়, অন্যদিকে উচ্চ অক্ষাংশের এলাকাগুলো অনেক বড় দেখায়।
ঐতিহাসিক ও ভূগোলবিদরা বছরের পর বছর ধরে বলে আসছেন, মারকেটর প্রজেকশন পশ্চিমা গতানুগতিক ধারণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। আন্দোলনকারীরাও এই কথার প্রতিধ্বনি করেছেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ ‘মানচিত্রগত ঔপনিবেশিকতা’ পরিভাষাটিও ব্যবহার করেছেন। অনেকে যুক্তি দেন, মানচিত্রটি বৈশ্বিক দক্ষিণের ভৌতিক উপস্থিতি কমিয়ে উত্তর গোলার্ধের দেশগুলোকে দৃশ্যত স্ফীত করে এবং নিরক্ষীয় অঞ্চলগুলোকে সংকুচিত করার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ক্ষমতার গতি-প্রকৃতিকে প্রভাবিত করেছে। বলা হয়ে থাকে, এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, উন্নয়নের অগ্রাধিকার এবং শিক্ষাগত কাঠামোতে বিদ্যমান পদ্ধতিগত পক্ষপাতিত্বকে আরো শক্তিশালী করেছে।
মারকেটর প্রজেকশনের অন্যতম সমালোচক ছিলেন জার্মান ইতিহাসবিদ আর্নো পিটার্স। তিনি ১৯৭৩ সালে গ্যাল-পিটার্স প্রজেকশনেরর ওপর ভিত্তি করে পিটার্স বিশ্ব মানচিত্র চালু করেন। এটি প্রায়ই মারকেটর মানচিত্রের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। টোগোর প্রচারাভিযানটি ২০১৮ সালের ‘ইকুয়াল আর্থ’ নকশার ব্যবহারকে উৎসাহিত করে, যা মানচিত্রকারদের একটি আন্তর্জাতিক দল তৈরি করেছিল। সমর্থকরা বলেন, এটি আফ্রিকা সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা পাল্টে দিতে এবং বৈশ্বিক পাঠ্যক্রমকে ঔপনিবেশিকতামুক্ত করতে সাহায্য করবে। কয়েকজন বিশ্লেষক এতে একমত পোষণ করেছেন।
ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকিবিষয়ক পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান জেএস হেল্ডের লন্ডনভিত্তিক সিনিয়র অ্যাসোসিয়েট জেজে ইনোক বলেছেন, ‘মারকেটর প্রজেকশন আফ্রিকার প্রকৃত আয়তনকে ছোট করে দেখিয়েছে। একটি সমক্ষেত্রফলের মানচিত্র গ্রহণ করা হলে তা শিক্ষা ও জনসচেতনতার জন্য আরো নির্ভুল ভিত্তি প্রদান করবে এবং একই সঙ্গে এই ইঙ্গিত দেবে যে আফ্রিকার জনতাত্ত্বিক, অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বকে আর উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত ও বিকৃত প্রথার মাধ্যমে দেখা উচিত নয়।’ সূত্র : বিবিসি, স্কাই নিউজ, দ্য গার্ডিয়ান