
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলায় দক্ষিণ ইরানের একটি বিয়ের অনুষ্ঠান লণ্ডভণ্ড হয়ে চার বছর বয়সী এক শিশুসহ অন্তত ৪ জন নিহত এবং ৫০ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন। মর্মান্তিক এই বেসামরিক প্রাণহানির ঘটনায় চরম ক্ষোভে ফেটে পড়ে তেহরান। ঘটনার পরপরই জর্ডান, কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে একঝাঁক ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলা চালিয়ে কড়া জবাব দিয়েছে ইরানের ইসলামিক রিভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। খবর বিবিসি।
বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলা ও বেসামরিক প্রাণহানি
ইরানের রেড ক্রিসেন্ট ও রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যমের তথ্যমতে, হরমোজগান প্রদেশের সিরিক কাউন্টির কুহেস্তাক শহরে একটি আবাসিক ভবনে বিয়ের অনুষ্ঠান চলার সময় মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রের স্প্লিন্টার এসে আঘাত হানে। এতে ঘটনাস্থলেই শিশুসহ ৪ জন নিহত হন এবং ৫০ জনেরও বেশি অতিথি মারাত্মক আহত হন। এছাড়া ইরানের চাবাহার, কোনারক এবং জিরোফটের বেসামরিক বিমানবন্দরেও মার্কিন হামলার বিকট বিস্ফোরণ শোনা গেছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) হামলা নিশ্চিত করে দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্য জাহাজে হামলার চেষ্টার জবাব হিসেবে তারা আইআরজিসি-র ঘাঁটিগুলোতে সুনির্দিষ্ট আক্রমণ চালিয়েছে। তবে বেসামরিক লোকজনকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী লক্ষ্যবস্তু বানায়নি বলে দাবি করেন মার্কিন নৌবাহিনীর মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স।
জর্ডান, কুয়েত ও বাহরাইনে ইরানের পাল্টা আঘাত
বিয়ের অনুষ্ঠানে বেসামরিক লোকজনের মৃত্যুর পর আইআরজিসি স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, “আমেরিকাকে এই ভুলের জন্য চরম অনুশোচনা করতে হবে।”
এরপর বুধবার ভোরের দিকে জর্ডানের আকাবায় অবস্থিত মার্কিন মেরিন ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে বৃষ্টির মতো ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে ইরান। জর্ডানের সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, তারা ১৩টি ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্তের পর ১০টি ধ্বংস করেছে। এ ছাড়া কুয়েত এবং বাহরাইনে থাকা মার্কিন স্থাপনাগুলোতেও পরপর একাধিক বিস্ফোরণ ঘটে, যেখানে কুয়েতের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় হতে দেখা গেছে।
ট্রাম্পের হুমকি ও সংকটের নতুন মোড়
হামলার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইরান যদি পাল্টা আঘাত হানে তবে তাদের ‘আরও কঠিন এবং উচ্চ মাত্রায়’ আক্রমণ করা হবে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান আগে জানিয়েছিলেন, ওয়াশিংটন যদি জুন মাসের যুদ্ধবিরতি সমঝোতা চুক্তিতে ফিরে আসে, তবে ইরানও তাতে ইতিবাচক সাড়া দেবে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন বিমান হামলা ও বেসামরিক নাগরিকদের মৃত্যুর ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যের এই চলমান যুদ্ধ আবারও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জর্ডান, ইরাক, কুয়েত ও বাহরাইনে মার্কিন অবস্থানে পাল্টা হামলা ইরানের
জর্ডান, ইরাক, কুয়েত ও বাহরাইনে মার্কিন সামরিক অবস্থানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে ইরান। মঙ্গলবার রাতে এসব হামলা চালানো হয় বলে জানিয়েছে ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। এর আগে দক্ষিণ ইরানের বিভিন্ন এলাকায় যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালায়।
জর্ডানের প্রিন্স হাসান বিমানঘাঁটিতে দীর্ঘপাল্লার আরকিউ-৪ এবং এমকিউ-৯ ড্রোন থাকা হ্যাঙ্গারগুলোকে লক্ষ্য করে একটি ‘ভারী’ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে আইআরজিসি।
ইরানের সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবিতে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আইআরজিসি বলেছে, এ হামলায় কয়েকটি ড্রোন ধ্বংস হয়েছে। বেশ কয়েকজন মার্কিন ফ্লাইট ও কারিগরি কর্মী নিহত হয়েছেন। কারিগরি অবকাঠামোর কয়েকটি অংশে আগুন ধরে গেছে।
তবে হামলায় কোনো ধরনের হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি নাকচ করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও জর্ডান।
এর আগে জর্ডানের ‘ক্যাম্প তিতিন’–এ মার্কিন মেরিন সেনাদের ব্যারাকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছিল আইআরজিসি। তাদের দাবি, ওই হামলায় অনেক মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। ক্যাম্পটির বেশ কয়েকটি স্থাপনা এবং শত্রুপক্ষের ‘অ্যাটক হেলিকপ্টার’ ধ্বংস করা হয়েছে।
আইআরজিসি বলেছে, হরমোজগান প্রদেশের সিরিকে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে মার্কিন হামলার জবাবে এই হামলা চালানো হয়েছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, ওই হামলায় এক শিশুসহ চারজন নিহত এবং কয়েকজন গুরুতর আহত হয়েছেন।
এদিকে জর্ডানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরানি ভূখণ্ড থেকে উৎক্ষেপণ করা ১৩টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দেশটির আকাশসীমায় প্রবেশ করে। এর মধ্যে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ১০টি ক্ষেপণাস্ত্র মাঝপথেই ধ্বংস করে দেয়।
জর্ডানের ন্যাশনাল সেন্টার ফর সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট প্রচারিত এক বিবৃতিতে দেশটির সামরিক মুখপাত্র বলেন, অবশিষ্ট তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র লোকালয় থেকে দূরে প্রত্যন্ত অঞ্চলে পড়েছে। এতে কোনো হতাহত বা প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি।
এ ছাড়া আল–জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে একটি মার্কিন সূত্র জানিয়েছে, জর্ডানের ক্যাম্প তিতিনে মার্কিন সেনা ব্যারাকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কোনো হতাহত বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। সূত্রটি জানায়, মার্কিন বাহিনী হামলাটি প্রতিহত করেছে।
উত্তর ইরাকের এরবিল প্রদেশে অবস্থিত মার্কিন স্থাপনায় সমন্বিত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোরও কথা জানিয়েছে আইআরজিসি। এক বিবৃতিতে আইআরজিসি দাবি করেছে, হামলায় একটি মেরামতকেন্দ্র, কারিগরি সরঞ্জাম থাকা গুদাম এবং মার্কিন নজরদারি বেলুনের একটি গাইডেন্স সিস্টেম ধ্বংস হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও দাবি করা হয়, হামলায় ঘাঁটির জ্বালানি ট্যাংকে আগুন ধরে যায় এবং বেশ কয়েকজন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন।
এদিকে কুয়েতের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তাদের দেশের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ‘শত্রু ড্রোন’ হামলা প্রতিহত করেছে। এ ঘটনাকে তারা ইরানের আগ্রাসনের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে কুয়েত সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফ জানান, যেসব বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে, তা আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কর্তৃক ড্রোন ভূপাতিত করার ফলে হয়েছে।
ইরানের বার্তা সংস্থা তাসনিম দেশটির সেনাবাহিনীর এক বিবৃতির বরাতে জানিয়েছে, বাহরাইনের শেখ ইসা বিমানঘাঁটিতে মার্কিন সেনা মোতায়েন থাকা এলাকা এবং রাডার স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে একঝাঁক ড্রোন ছোড়া হয়েছে।
সেনাবাহিনী জানায়, হামলাটি তাদের ‘অপারেশন থান্ডার’ নামক সামরিক অভিযানের ২৯তম ধাপের অংশ। তাদের দাবি অনুযায়ী, শেখ ইসা ঘাঁটিটি পারস্য উপসাগরে মার্কিনদের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র, যা হেলিকপ্টার রক্ষণাবেক্ষণ, ড্রোনের যন্ত্রপাতি ও নজরদারি উড়োজাহাজের জন্য ব্যবহৃত হয়।
এর আগে মঙ্গলবার দক্ষিণ ইরানে বেশ কিছু এলাকায় বিমান হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। গত জুলাই মাসের পর রোববার রাতে প্রথমবার দুই দেশের সরাসরি পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটে। তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানকে ‘কঠোর’ আঘাত হানার হুমকি দিয়েছিলেন। এরপর মঙ্গলবারের এ হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী।
ইরানের বার্তা সংস্থা ফার্সের বরাত দিয়ে আল–জাজিরা জানিয়েছে, বন্দর আব্বাস, কেশম দ্বীপ, কোনারাক, চাবাহার, জাস্ক, সিরিক, লাভান ও আসলুয়েহ এলাকায় হামলা চালানো হয়েছে। দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলীয় আহভাজ প্রদেশেও হামলার ঘটনা ঘটেছে।