
সোমবার কোনো ধরনের আলোচনা ছাড়াই ইরানে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ নীরবে শেষ হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে থেমে থেমে চলা এই যুদ্ধ এক অদ্ভুত নতুন মোড়ে প্রবেশ করেছে।
এর একটি বড় ইঙ্গিত মেলে মঙ্গলবার, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি এখন এবং ভবিষ্যতেও আমেরিকার নিয়ন্ত্রণে থাকবে। তিনি একটি মানচিত্রও প্রকাশ করেন, যেখানে এই পানিপথকে ‘যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভূখণ্ড’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
এর প্রতিক্রিয়ায় তাৎক্ষণিক ও কড়া জবাব দিয়েছে ইরান। দেশটির এক উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ট্রাম্পের এই দাবিকে ‘উদ্ভট কল্পনা’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন, এই প্রণালি কেবল ‘ইরানের নির্দেশেই খোলা ও বন্ধ হবে। আর আপনারা যতক্ষণ পরাজয়ের বাস্তবতা মেনে না নিয়ে এমন বিভ্রান্তিকর ভাবনায় থাকবেন, ততক্ষণ ইরান অবরোধ বহাল রাখবে।’
পরিস্থিতি দেখে অন্তত এটুকু বোঝা যাচ্ছে, কোনো সমাধান দৃষ্টিগোচরে না থাকলেও এই অচলাবস্থা ও বৈরী মনোভাব যুদ্ধের একটি বিষয়কে নিশ্চিত পরিণতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তা হলো—তেহরানে স্বেচ্ছায় কোনো শাসন পরিবর্তন বা ক্ষমতা হস্তান্তর হচ্ছে না।
এই বাস্তবতা মেনে নেওয়া দখলদার ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি তিক্ত অভিজ্ঞতা। তবে উভয় দেশই যেন এই পরিণতির সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে শুরু করেছে। কারণ, ইরানের ওপর স্মরণকালের ভয়াবহ আঘাত আসার পরও দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বে কোনো মৌলিক পরিবর্তনের লক্ষণ নেই। যদিও যুদ্ধের সরাসরি ঘোষিত লক্ষ্য এটি ছিল না, তবে ট্রাম্প এবং ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্পষ্টতই এমন কিছুরই প্রত্যাশা করছিলেন।
উভয় পক্ষের কেউই এই বিপজ্জনক অভিযানে স্থলসেনা পাঠাতে চায়নি। তবে কুর্দি যোদ্ধাদের মাঠে নামানো যায় কিনা, তা নিয়ে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর কর্মীদের মধ্যে আলোচনা হয়েছিল। তাদের বিশ্বাস ছিল, কিছুটা সুযোগ তৈরি হলে ইরানের সাধারণ জনগণই রাজপথে নেমে সরকার পতনে সহায়তা করবে।
জানা গেছে, ইসরাইল এই ভাবনাটি যুক্তরাষ্ট্রের সামনে তুলে ধরেছিল এবং একে বাস্তবসম্মত বিকল্প মনে করেছিল। যদিও ট্রাম্প ও তার জাতীয় নিরাপত্তা দল এ বিষয়ে পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারেনি।
এদিকে ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কীভাবে এবং কখন জনগণকে এ কাজে সহায়তা করা হবে, সে বিষয়ে ইসরাইল ডিফেন্স ফোর্সেসকে (আইডিএফ) কখনোই কোনো সুস্পষ্ট ও বিস্তারিত পরিকল্পনা দেওয়া হয়নি। ফলে এই পরিকল্পনার সফল হওয়ার কোনো বাস্তব সুযোগ ছিল না।
তা সত্ত্বেও, গত ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া যুদ্ধের প্রথম দিন থেকেই মনে হয়েছিল ‘কট্টরপন্থি’ ইসলামি নেতৃত্বের জায়গায় হয়তো একটি প্রতিনিধিত্বমূলক বেসামরিক সরকার গঠিত হতে যাচ্ছে। যুদ্ধের প্রথম দিনেই এক বৈঠকে জড়ো হওয়া ইরানের শীর্ষ প্রায় ৪০ জন নেতা একসঙ্গে নিহত হন।
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু দুজনই দ্রুত দাবি করেন যে, দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিও নিহতদের মধ্যে রয়েছেন। ইরান প্রথমে তা অস্বীকার করলেও এক দিনের মাথায় দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম খামেনি ও শীর্ষ কমান্ডারদের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে।
এই চরম আক্রমণ থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, যুদ্ধের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল শাসকগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ নির্মূল করা—যাতে নতুন প্রজন্মের সংস্কারপন্থিরা ইরানকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ফিরিয়ে আনতে পারে এবং গত প্রায় ৫০ বছর ধরে চলা শিয়া বিপ্লব রপ্তানির নীতি থেকে সরে আসে।
ইরানের তৎকালীন ক্ষমতাসীন সরকার কখনই ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রকে নির্মূল করার লক্ষ্য গোপন রাখেনি। দেশটির নেতারা বারবার তাদেরকে ‘ছোট শয়তান’ এবং ‘বড় শয়তান’ হিসেবে আখ্যায়িত করে আসছিলেন।
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু একমত হয়েছিলেন যে, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের বিকাশ এবং পারমাণবিক অস্ত্রের পেছনে দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা কোনোভাবেই আর মেনে নেওয়া যায় না।
অভিযানের প্রস্তুতি
এতসব উসকানি সত্ত্বেও, শুরুর দিকে ট্রাম্প সরাসরি সরকার পরিবর্তনের আহ্বান জানানো থেকে সতর্কতার সঙ্গে বিরত ছিলেন। দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছরে কয়েক মাসের আলোচনায় তিনি লক্ষণীয় সংযম দেখিয়েছিলেন। কিন্তু একপর্যায়ে ইরানি কর্মকর্তারা বৈঠকে দম্ভভরে জানান যে, প্রায় এক ডজন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির মতো পর্যাপ্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম তাদের রয়েছে।
মার্কিন দূত স্টিভেন উইটকফের মতে, ইরানি প্রতিনিধিরা জোর দিয়ে বলেছিলেন যে, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার তারা কখনই ছাড়বেন না।
এরপরই ট্রাম্পের অবস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। একই সঙ্গে খাদ্য, পানি ও জ্বালানি সংকট এবং লাগামহীন মূল্যস্ফীতির কারণে ইরানে রাস্তায় নামা সাধারণ বিক্ষোভকারীদের ওপর দেশটির সরকারের নৃশংস দমনপীড়নও তার মনোভাব বদলে দেয়।
বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা হাজারে পৌঁছানো, এমনকি হাসপাতালে বিক্ষোভকারীদের নির্যাতন ও হত্যার খবর এবং ইন্টারনেট বন্ধের পর ট্রাম্প স্পষ্টতই আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আশা ছেড়ে দেন।
জানুয়ারিতে তিনি সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, ‘সাহায্য আসছে’ এবং বিক্ষোভকারীদের বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার আহ্বান জানান।
তবে মধ্যপ্রাচ্যে বিপুল মার্কিন সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েনের পর এবং হামলার ঠিক কয়েক দিন আগে ট্রাম্প প্রথম প্রকাশ্যে স্বীকার করেন যে, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার ও আঞ্চলিক আধিপত্য থেকে ইরানকে থামাতে হয়তো শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তনই একমাত্র পথ।
কিন্তু ছয় মাস পর আজ দেখা যাচ্ছে, সামরিক স্থাপনা ও কর্মকর্তাদের ওপর প্রচণ্ড বোমা হামলা চালানো সত্ত্বেও ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদের নাম ও পদবী ছাড়া আর কিছুই বদলায়নি।
প্রথম দিনের হামলায় গুরুতর আহত বলে খবর আসা সাবেক সর্বোচ্চ নেতার ছেলে মোজতবা খামেনিসহ ইরানের দ্বিতীয় সারির নেতারা ক্ষমতায় এসেও আগের ‘কট্টর’ নীতিতেই অটল রয়েছেন। তারা দেশে নিষ্ঠুর দমনপীড়ন এবং অঞ্চলে আধিপত্য বজায় রাখার এজেন্ডা বহাল রেখেছেন।
এর সুস্পষ্ট প্রমাণ হলো, ভিন্নমতাবলম্বীদের প্রকাশ্যে ফাঁসিসহ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা আবারও শুরু হয়েছে।
পাশাপাশি হামাস, হিজবুল্লাহ এবং হুতিদের শক্তি কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তারা এখনও অঞ্চলটি থেকে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রকে হঠাতে বদ্ধপরিকর।
‘কট্টরপন্থিদের’ আধিপত্য
সামগ্রিক এই বাস্তবতার চিত্র উঠে এসেছে ওয়াশিংটনভিত্তিক রক্ষণশীল থিংকট্যাঙ্ক ‘ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিস’-এর সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে।
বিশ্লেষণের শুরুতেই বলা হয়েছে, ‘ইরান সরকারের সাম্প্রতিক রদবদল কোনো পরিবর্তন নয়, বরং পুরোনো শাসকদের মধ্যেই ক্ষমতার পুনর্বণ্টন মাত্র।’
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গত ৯ আগস্ট মোজতবা খামেনি যুদ্ধ ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা প্রধানসহ সাতটি গুরুত্বপূর্ণ পদে নতুনদের দায়িত্ব দিয়েছেন। এই পদগুলোই সরকারের টিকে থাকার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত।
প্রতিবেদন অনুসারে, ‘মোজতবার নেতৃত্বাধীন সরকার তার বাবার আমলের মতোই কট্টরপন্থি রয়ে গেছে। নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের প্রত্যেকেরই রয়েছে কড়া আমেরিকা-বিরোধিতা এবং অভ্যন্তরীণ দমনপীড়নের দীর্ঘ রেকর্ড।’
এতে আরও বলা হয়, এসব পরিবর্তনের মাধ্যমে পুরোনো নিয়ন্ত্রণ কাঠামোই বজায় রাখা হয়েছে এবং এর ফলে ‘ওয়াশিংটনকে মূলত একই কট্টরপন্থিদের মুখোমুখি হতে হচ্ছে—শুধু তাদের বসার চেয়ারগুলো বদলে গেছে।’
হোয়াইট হাউসকে সতর্ক করে প্রতিবেদনের লেখক জানান, সেখানে কোনো ‘যৌক্তিক, বিশ্বাসযোগ্য বা আলোচনাযোগ্য’ পক্ষ রয়েছে বলে মনে করার কোনো কারণ নেই।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘অভ্যন্তরীণ বিরোধকে ওয়াশিংটনের কোনো সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত হবে না। ক্ষমতা নিয়ে টানাপোড়েন থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র, তার মিত্র এবং ইরানি জনগণের বিরুদ্ধে থাকা নীতিগুলোর প্রশ্নে এই পক্ষগুলো পুরোপুরি একতাবদ্ধ।’
সার্বিক বিশ্লেষণে একটি হতাশাজনক কিন্তু কঠোর বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে; যারা এখনও ইরানে স্বেচ্ছায় শাসন পরিবর্তনের আশা করছেন, তারা আসলে একটি অসম্ভব কল্পনার পেছনেই ছুটছেন।
লেখক: মার্কিন সাংবাদিক ও রাজনৈতিক কলামিস্ট