উপনিবেশের স্মৃতি মুছে ফেলতে দেশের নাম পরিবর্তন করল নাউরু

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  ০৪ আগস্ট ২০২৬, ১৮:০২

দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র নাউরু আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের দেশের নাম পরিবর্তন করেছে। স্থানীয় জাতীয় ভাষার বানান ও উচ্চারণ অক্ষুণ্ণ রেখে দেশটির নতুন নাম রাখা হয়েছে ‘রিপাবলিক অব নাওয়েরো’। 
সম্প্রতি দেশটির প্রেসিডেন্ট ডেভিড আদিয়াং সরকারের এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের কথা নিশ্চিত করেছেন।
এই পরিবর্তনের ফলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশটির কোড ‘এআরইউ’-এর পরিবর্তে ব্যবহৃত হবে ‘এনআরও’। পাশাপাশি, বিশ্বমঞ্চে দেশটির বাসিন্দারা ‘নাউরুয়ান’-এর বদলে এখন থেকে ‘দে-নাওয়েরো’ নামে পরিচিত হবেন। 
আন্তর্জাতিকভাবে এ যাবৎ দেশটিকে ‘নাউ-রু’ উচ্চারণে ডাকা হলেও, নিজস্ব মাতৃভাষায় এর সঠিক উচ্চারণ হলো ‘নাউ-এরো’। 
গত বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) সরকারের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, এই সিদ্ধান্ত দূরবর্তী এই দ্বীপরাষ্ট্রটিকে তার মূল ঐতিহ্যবাহী নামে ফিরিয়ে আনবে। 
পূর্বে প্রকাশিত আরেকটি সরকারি বার্তা থেকে জানা যায়, বিদেশিদের উচ্চারণের সুবিধার কথা বিবেচনা করেই ‘নাওয়েরো’ নামটিকে সংক্ষেপে ‘নাউরু’ করা হয়েছিল। এটি কোনো স্বতঃস্ফূর্ত পছন্দ ছিল না, বরং বিদেশিদের সুবিধার্থে মেনে নেওয়া একটি নাম ছিল। 
প্রেসিডেন্ট ডেভিড আদিয়াং চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রথম সংসদে প্রস্তাবটি উত্থাপন করে বলেন, ‘এই প্রস্তাবিত পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য হলো আমাদের জাতীয় ঐতিহ্য, ভাষা এবং মৌলিক পরিচয়কে শতভাগ শ্রদ্ধা জানানো ও প্রতিষ্ঠিত করা।’ সংবিধানের আইন অনুযায়ী সংসদের দুই ধাপের ভোটাভুটিতেই প্রস্তাবটি অনুমোদন লাভ করেছে। 
প্রাথমিকভাবে মে মাসে সংসদীয় চূড়ান্ত অনুমোদনের পর বিষয়টি চূড়ান্ত করতে জনমত বা গণভোটের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিলেন দেশটির প্রেসিডেন্ট। তবে বিস্তৃত আলোচনার পর জানা যায়, কোনো আলাদা গণভোটের প্রয়োজন নেই। 
সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘গণভোটের উদ্দেশ্য থাকে জনগণের আকাঙ্ক্ষা নির্ধারণ করা। তবে ‘নাওয়েরো’ শব্দটি তো আমাদের মাঝে কখনো হারিয়েই যায়নি, এটি কেবল পূর্ণাঙ্গ মর্যাদায় ফেরার অপেক্ষায় ছিল। এটি ইতোমধ্যেই আমাদের জনগণের পরিচয়ের অংশ, জাতীয় প্রতীক বা ‘কোট অব আর্মস’-এ লিখিত রয়েছে এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের মাঝে নিত্য ব্যবহৃত হচ্ছে।’ 

ইতিহাস ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ 
মাত্র ১২ হাজার অধিবাসীর এই রাষ্ট্রটি জনসংখ্যায় টুভালু ও ভ্যাটিকান সিটির পর বিশ্বের তৃতীয় ক্ষুদ্রতম দেশ। জার্মানির ঔপনিবেশিক শাসন এবং পরবর্তীকালে অস্ট্রেলিয়ার প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে থাকার পর ১৯৬৮ সালে দেশটি পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন করে। ১৯৭০-এর দশকে ফসফেট খনির সুবাদে এটি প্রচুর ধনসম্পদের মুখ দেখলেও, খনিশিল্প ধ্বংসের কারণে ১৯৯০-এর দশকে মারাত্মক অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে।
বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ নাওয়েরো। জলবায়ুর অভিঘাত সামলাতে ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে অবকাঠামো সরিয়ে নিতে তারা ‘পেইড সিটিজেনশিপ’ বা অর্থের বিনিময়ে নাগরিকত্ব প্রদানের মতো বৈদেশিক বিনিয়োগ তহবিল গঠন করছে। 

বিশ্বজুড়ে রিব্র্যান্ডিং ও স্বীকৃতি 
ঔপনিবেশিক ইতিহাস মুছে ফেলার লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশের নাম পরিবর্তনের ধারায় যোগ দিল নাওয়েরো। এর আগে ২০১৮ সালে আফ্রিকান দেশ সোয়াজিল্যান্ড নাম বদলে নিজেদের প্রাচীন নাম ‘এসোয়াতিনি’ গ্রহণ করে। ২০২২ সালে তুরস্ক জাতিসংঘে নিজেদের আন্তর্জাতিক নাম ‘তুর্কিয়ে’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে।
নাওয়েরোর জাতীয় বিমান সংস্থা, নৌজাহাজ ও আন্তর্জাতিক নথিপত্র সংশোধনের কাজ ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। জাতিসংঘ, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মতো প্রভাবশালী দেশগুলো তাদের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে এরই মধ্যে ‘নাওয়েরো’ নামটি ব্যবহার করা শুরু করেছে।