
ভারতের চিকিৎসাশাস্ত্রে স্নাতক পর্যায়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কের মধ্যে কেন্দ্র সরকারকে আরও কঠোর ও স্থায়ী পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনামূলক বার্তা দিয়েছে দেশটির সর্বোচ্চ আদালত। আদালত জানিয়েছে, প্রশ্নফাঁস রোধে সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তার বাস্তবায়নের ওপর তারা নজর রাখবে। একই সঙ্গে বছরের পর বছর অস্থায়ী ব্যবস্থা নিয়ে পরীক্ষা পরিচালনার প্রবণতারও সমালোচনা করেছে আদালত।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) মামলার শুনানিতে কেন্দ্রের পক্ষে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আদালতকে জানান, প্রশ্নফাঁস রোধে ইতোমধ্যে বেশ কিছু কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে। পরীক্ষা ব্যবস্থাকে আরও নিরাপদ, স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য করতে সরকারের সর্বোচ্চ নির্বাহী পর্যায় থেকে পুরো বিষয়টি তদারকি করা হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
শুনানিতে আদালত পর্যবেক্ষণ দেন, দীর্ঘদিন ধরে অস্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের কারণে পরীক্ষা পরিচালনা নিয়ে নানা সমস্যা তৈরি হয়েছে। এখন আর সাময়িক সমাধানের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। ভবিষ্যতের জন্য এমন একটি স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে প্রশ্নফাঁসের মতো ঘটনা আর না ঘটে।
আদালত আরও জানান, আগামী বছর থেকে চিকিৎসাশাস্ত্রে স্নাতক পর্যায়ের ভর্তি পরীক্ষা কম্পিউটারভিত্তিক পদ্ধতিতে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগে সাইবার নিরাপত্তা এবং তথ্য সুরক্ষার বিষয়ে সরকারকে দৃঢ় ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ প্রযুক্তিনির্ভর পরীক্ষা চালুর সঙ্গে নতুন ধরনের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। তাই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র, পরীক্ষার্থীদের তথ্য এবং পুরো ডিজিটাল অবকাঠামোকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তার আওতায় আনতে হবে।
তুষার মেহতা আদালতকে বলেন, দেশের শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষায় সরকার প্রয়োজন হলে আরও অনেক বেশি উদ্যোগ নিতে প্রস্তুত। শিশু ও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ যাতে কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি জানান, সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশনা ও তদারকির মধ্যেই সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে চলছে।
চিকিৎসাশাস্ত্রে স্নাতক পর্যায়ের ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে গত কয়েক মাস ধরে ভারতজুড়ে ব্যাপক বিতর্ক চলছে। প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ সামনে আসার পর শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ, আন্দোলন এবং আইনি লড়াই শুরু হয়। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও পরীক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানায়।
এই পরিস্থিতিতে পরীক্ষা পরিচালনাকারী সংস্থা ও সরকারের ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠলেও কেন্দ্র সরকার দাবি করেছে, ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে বড় ধরনের সংস্কার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আইনগত ব্যবস্থা কঠোর করার পাশাপাশি প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা জোরদার এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু কঠোর শাস্তির বিধান করলেই প্রশ্নফাঁস বন্ধ হবে না। পরীক্ষা প্রস্তুতি, প্রশ্ন সংরক্ষণ, তথ্য আদান-প্রদান, পরীক্ষাকেন্দ্র পরিচালনা এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই আধুনিক ও সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে নিয়মিত নিরীক্ষা এবং স্বাধীন পর্যবেক্ষণও জরুরি।
সর্বোচ্চ আদালতের সর্বশেষ পর্যবেক্ষণকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, আদালত শুধু বর্তমান সংকট মোকাবিলার কথা বলেনি, বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য ও স্বচ্ছ পরীক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার দিকনির্দেশনাও দিয়েছে।
এখন সরকারের ঘোষিত পদক্ষেপ কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয় এবং সেগুলোর কার্যকারিতা কতটা নিশ্চিত করা যায়, সেদিকেই নজর রয়েছে শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট মহলের।