
অস্ট্রেলিয়ার উত্তর কুইন্সল্যান্ডের একটি সমুদ্রসৈকতে হঠাৎ ভেসে এসেছে ছয়টি রহস্যময় বিশাল ধাতব গোলক। অজানা উৎসের এই বস্তুগুলো ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিষাক্ত বা দাহ্য রাসায়নিক থাকার আশঙ্কায় পুলিশ সৈকতের একটি অংশজুড়ে ৫০ মিটারব্যাপী বিশেষ নিরাপত্তা বলয় (রেড জোন) ঘোষণা করেছে। প্রাথমিকভাবে অস্ট্রেলিয়ান স্পেস এজেন্সি (এএসএ) ধারণা করছে, এগুলো কোনো রকেট বা মহাকাশযানের খসে পড়া অংশ, অর্থাৎ মহাকাশ বর্জ্য হতে পারে।
গত শনি ও রোববার কুইন্সল্যান্ডের টাউনসভিল শহরের উত্তরে অবস্থিত ফরেস্ট বিচে সাধারণ মানুষের নজরে আসে ধাতব গোলকগুলো। ঘটনার পরপরই কুইন্সল্যান্ড ফায়ার সার্ভিস এলাকা ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে এবং সম্ভাব্য ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে সৈকতের চারপাশে ৫০ মিটারের একটি রেড জোন ঘোষণা করে। একই সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দাদের কোনো অচেনা বা সন্দেহজনক বস্তু স্পর্শ না করার আহ্বান জানানো হয়।
ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জোর গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে যে, গোলকগুলো সম্ভবত কোনো মহাকাশযানের প্রোপেল্যান্ট বা জ্বালানি ট্যাংক। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এর ভেতরে এখনো অত্যন্ত দাহ্য কিংবা রাসায়নিকভাবে সক্রিয় কোনো পদার্থের অবশিষ্টাংশ থাকতে পারে।
এই আশঙ্কার কারণেই ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী (পিপিই) পরিহিত বিশেষজ্ঞদের পুলিশি নিরাপত্তার মধ্যে গোলকগুলো সংগ্রহ করে বিশেষ ‘হ্যাজম্যাট ব্যারেল’-এ সংরক্ষণ করতে দেখা গেছে, যাতে সম্ভাব্য রাসায়নিক ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
গোলকগুলোর প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর গত সোমবার অস্ট্রেলিয়ান স্পেস এজেন্সি জানায়, এগুলো দেখতে মহাকাশযান উৎক্ষেপণকারী রকেটের ‘প্রেসার ভেসেল’ বা চাপ নিয়ন্ত্রণকারী ট্যাংকের মতো। সংস্থাটির ধারণা, কোনো বিদেশি রকেট পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে পুনঃপ্রবেশের সময় এর অংশবিশেষ বিচ্ছিন্ন হয়ে সমুদ্রে পড়ে এবং পরে সেগুলো ঢেউয়ের সঙ্গে ভেসে সৈকতে এসে পৌঁছায়। তবে বস্তুগুলো ঠিক কোন দেশের রকেটের অংশ, তা নিশ্চিত হতে আন্তর্জাতিক মহাকাশ সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
ফরেস্ট বিচ টেকঅ্যাওয়ের মালিক লিসা স্কোবি বলেন, রহস্যময় গোলকগুলোর উৎস জানতে পুরো এলাকার মানুষ উৎসুক হয়ে উঠেছেন। অস্ট্রেলিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘এটি খুবই শান্ত একটি এলাকা। এখানে সাধারণত এমন কোনো ঘটনা ঘটে না। তাই হঠাৎ এত বড় নিরাপত্তা তৎপরতা মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই কৌতূহল ও উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।’
অস্ট্রেলিয়ার উপকূলে রহস্যময় মহাকাশ বর্জ্য ভেসে আসার ঘটনা অবশ্য এবারই প্রথম নয়। ২০২৩ সালে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার পার্থের কাছে একটি সৈকতে বিশাল আকৃতির ধাতব গম্বুজ উদ্ধার হওয়ার পর ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছিল। পরে ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরো নিশ্চিত করে, সেটি তাদের পোলার স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকেল (পিএসএলভি) রকেটের খসে পড়া অংশ ছিল।
এরও আগে, ২০১১ সালে আফ্রিকার নামিবিয়ার একটি প্রত্যন্ত তৃণভূমিতে একই ধরনের একটি ধাতব গোলক উদ্ধার করা হয়। সে সময় বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেছিলেন, সেটি কোনো রকেটের জ্বালানি ট্যাংক, যার ভেতরে অত্যন্ত বিপজ্জনক ও উদ্বায়ী জ্বালানি হাইড্রাজিন-এর অবশিষ্টাংশ থাকতে পারে।
সাম্প্রতিক এই ঘটনাও তাই শুধু স্থানীয়দের কৌতূহলই বাড়ায়নি; বরং মহাকাশ বর্জ্যের নিরাপত্তা, পরিবেশগত ঝুঁকি এবং আন্তর্জাতিক মহাকাশ কার্যক্রমের প্রভাব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে।