ইরানের সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছাতে পারলেন না ট্রাম্প

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  ৩১ মে ২০২৬, ২২:৪৭

আসন্ন নভেম্বর মাসের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং নিজের রেটিং কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ সমাপ্তির সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছাড়াই হোয়াইট হাউজের ‘সিচুয়েশন রুম’-এর দুই ঘণ্টার বৈঠক থেকে বেরিয়ে গেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। 
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ আনার মধ্যেই শনিবার (৩০ মে) এই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকটি কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হওয়ায় ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা নিরসনের বিষয়টি এখনো ঝুলে রইল।
নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে প্রশাসনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দুই পক্ষের মধ্যে একটি চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেও, ইরানি তহবিল অবমুক্ত করাসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এখনো আলোচনা ও চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। হোয়াইট হাউজের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সিচুয়েশন রুমের বৈঠকটি শেষ হয়েছে এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কেবল এমন একটি চুক্তিতেই সই করবেন যা আমেরিকার স্বার্থ রক্ষা করবে এবং মার্কিন শর্তগুলো পূরণ করবে। 
একই সঙ্গে বিবৃতিতে পরিষ্কার করা হয়েছে যে ইরানকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে দেওয়া হবে না। বৈঠকের আগে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ এক পোস্টে লিখেছিলেন, সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি নিয়ে একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর লক্ষ্যেই তিনি এই বৈঠকে বসছেন। তবে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি—এই দুই দেশের অনড় অবস্থানের কারণে অচলাবস্থা কাটার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প তার রূপরেখা তুলে ধরে দাবি করেন, ইরানকে হরমুজ প্রণালীতে বসানো সমস্ত মাইন অপসারণ করতে হবে এবং এর বিনিময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করবে, যাতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল শুরু হতে পারে। পাশাপাশি ইরানের উচ্চ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম খুঁজে বের করে ধ্বংস করা হবে। ইরানের পক্ষ থেকে চুক্তি এগিয়ে নেওয়ার শর্ত হিসেবে জব্দ করা ১২ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ অবিলম্বে ছাড় করার দাবির প্রেক্ষিতে ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়ে দেন, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কোনো প্রকার অর্থ লেনদেন করা হবে না। 
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূল দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করতে হবে এবং তাদের মজুদ অন্য দেশের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। এছাড়া বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি ৩০ দিনের মধ্যে মাইনমুক্ত করে খুলে দিতে হবে।
অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন আইআরআইবি টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন দাবির বিষয়ে ভিন্ন সুর তুলেছেন। তিনি জানান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এখনও কোনো চুক্তি চূড়ান্ত হয়নি, তবে দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান চলছে। ইরানের বর্তমান প্রধান লক্ষ্য যুদ্ধ বন্ধ করা এবং এই মুহূর্তে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের বিবরণ নিয়ে কোনো আলোচনার সুযোগ নেই। 
হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে তিনি স্পষ্ট করেন যে এই প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা কেবল ইরান ও ওমানের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এছাড়া তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অনাস্থা প্রকাশ করে ইঙ্গিত দেন যে ইরান কোনো চাপের মুখে নতি স্বীকার করবে না। 
ইরানের শীর্ষ আলোচনাকারী মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করেছেন, তারা আলোচনার মাধ্যমে নয়, বরং ক্ষেপণাস্ত্রের শক্তিতে দাবি আদায় করেন। কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখার আগে ইরান কোনো ছাড় দেবে না বলেও তিনি সাফ জানিয়ে দেন।
ইরানের মূল দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—বিদেশে থাকা তাদের প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলারের হিমায়িত সম্পদ অবমুক্ত করা, যার মধ্যে ১২ বিলিয়ন ডলার চুক্তির ঘোষণার শুরুতেই দিতে হবে। এছাড়াও, লেবাননে ইসরাইল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা এবং এই চুক্তির স্থায়িত্বের বিষয়ে আমেরিকার পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তা চাওয়া হয়েছে। কারণ ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তি থেকে একতরফাভাবে বেরিয়ে গিয়েছিল, যা তেহরানের মনে গভীর অনাস্থা তৈরি করেছে। গত ৮ এপ্রিল একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও চলতি সপ্তাহেও হরমুজ প্রণালি এবং এর আশেপাশে দুই দেশ একে অপরের ওপর হামলা ও যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

সূত্র: এনডিটিভি।