সিলিকন ভ্যালির আলোচিত মামলার রায়ে হেরে গেলেন ইলন মাস্ক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  ২০ মে ২০২৬, ২১:১২
আপডেট  : ২০ মে ২০২৬, ২১:১৩


সিলিকন ভ্যালির অন্যতম আলোচিত ও বহুল প্রতীক্ষিত আইনি লড়াইয়ের অবসান ঘটল। চ্যাটজিপিটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই এবং এর প্রধান নির্বাহী (সিইও) স্যাম অল্টম্যানের বিরুদ্ধে করা বহুল আলোচিত মামলায় হেরে গেছেন বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলন মাস্ক।
সোমবার (১৮ মে) যুক্তরাষ্ট্রের ওকল্যান্ডের একটি ফেডারেল জুরি এ রায় দেন। 
রায়ে বলা হয়, স্যাম অল্টম্যান ও ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে মামলা করতে অনেক বেশি দেরি করে ফেলেছেন ইলন মাস্ক। তামাদি আইনের কারণে মাস্কের এ মামলাটি আইনিভাবে গ্রহণযোগ্য নয় বলে আদালত রায় দিয়েছেন। এর ফলে বড় ধরনের আইনি বিপর্যয় থেকে বেঁচে গেল ওপেনএআই।
তিন সপ্তাহ ধরে চলা এ হাইপ্রোফাইল ট্রায়ালে সিলিকন ভ্যালির বাঘা বাঘা প্রযুক্তি ব্যক্তিত্বরা কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সাক্ষ্য দেন। মামলার মূল বিষয় ছিল—ওপেনএআই তার শুরুর দিকের অলাভজনক সত্ত্বা থেকে সরে এসে সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক বা লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়ে ইলন মাস্কের সাথে বিশ্বাসভঙ্গ করেছে।
তবে জুরি বোর্ড সবার আগে একটি মৌলিক বিষয় খতিয়ে দেখে; সেটি হলো—২০১৮ সালে ওপেনএআই ছাড়ার পর এবং ২০২০ সালে শেষ অনুদান দেওয়ার চার বছর পর, অর্থাৎ ২০২৪ সালে এসে মাস্ক যে মামলাটি করেছেন, তা নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ছিল কিনা। জুরিরা সর্বসম্মতভাবে রায় দেন যে, মাস্ক মামলা করতে আইনগতভাবে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি দেরি করে ফেলেছেন। মামলার মূল গুণাগুণ বা মেরিট বিচারের আগেই সময়সীমার মারপ্যাঁচে এটি খারিজ হয়ে যায়। মামলার বিচারক ইভন গঞ্জালেজ রজার্সও জুরির এ রায় মেনে নেন।
ইলন মাস্ক যদি এ মামলায় জিতে যেতেন, তবে তা ওপেনএআইয়ের অস্তিত্বের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াত। মাস্ক দাবি করেছিলেন, ওপেনএআই-কে যেন আবার তার আগের অলাভজনক কাঠামোতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। তেমনটি হলে প্রতিষ্ঠানটির আসন্ন আইপিও থমকে যেত এবং মাইক্রোসফট, আমাজন ও সফটব্যাংকের মতো বড় বিনিয়োগকারীদের দেওয়া শত শত কোটি ডলারের চুক্তি ভেস্তে যেত। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বৈশ্বিক দৌড়ে বর্তমানে ৮৫০ বিলিয়ন ডলারের এই টেক জায়ান্টকে এক বড় ধাক্কা থেকে বাঁচাল এ রায়।
মাস্কের অভিযোগ ছিল, তিনি মানবতার কল্যাণের জন্য একটি মুক্ত ও অলাভজনক গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে ওপেনএআই-কে ৩৮ মিলিয়ন (৩ কোটি ৮০ লাখ) ডলার অনুদান দিয়েছিলেন। কিন্তু অল্টম্যান এবং সহ-প্রতিষ্ঠাতা গ্রেগ ব্রকম্যান সেই অর্থ ব্যবহার করে নিজেদের লাভের জন্য এটিকে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করেছেন।
মামলার সমাপনী বক্তব্যে দুই পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে তীব্র বাকযুদ্ধ চলে। ইলন মাস্কের আইনজীবী স্টিভেন মোলো স্যাম অল্টম্যানের সততা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, মানবতার কল্যাণে ওপেন সোর্স ও অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এআই তৈরির যে মূল লক্ষ্য ছিল, তা তারা সম্পূর্ণ বিসর্জন দিয়েছে।
পালটা জবাবে ওপেনএআইয়ের আইনজীবী সারাহ এডি খোদ মাস্কের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই টান দেন। তিনি ইলন মাস্কের ব্যবসায়িক সহযোগী এবং তার চার সন্তানের মা শিভন জিলিসের দেওয়া সাক্ষ্যকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। সারাহ এডি বলেন, এমনকি তার (মাস্কের) নিজের প্রতিষ্ঠানে কাজ করা মানুষ, তথা তার সন্তানদের মা-ও মাস্কের এই মনগড়া গল্পকে সমর্থন করতে পারেননি।
বিচারক গঞ্জালেজ রজার্স যেমনটা বলেছিলেন, মামলাটি শেষ পর্যন্ত রূপ নিয়েছিল দুই বিলিয়নেয়ারের ব্যক্তিগত অহং ও জেদের লড়াইয়ে। ২০১৮ সালে ওপেনএআই ছেড়ে দেওয়ার পর মাস্ক তার নিজের প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স এবং এক্সএআই এর মাধ্যমে এআই নিয়ে কাজ শুরু করলেও তা ওপেনএআই বা ক্লডের মতো বড় সাফল্য পায়নি। অন্যদিকে, ২০২৩ সালে নাটকীয়ভাবে চাকরিচ্যুত হওয়া এবং কর্মীদের চাপে আবার ফিরে আসা স্যাম অল্টম্যানের বিরুদ্ধে 'বিষাক্ত কর্মপরিবেশ' তৈরির যে অভিযোগ ছিল, তা এই রায়ের পর আড়ালে চলে গেল।
একই সাথে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছে টেক জায়ান্ট মাইক্রোসফটও। ওপেনএআই-তে ১৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ট্রাস্ট ভঙ্গের সহযোগিতার যে অভিযোগ মাস্ক এনেছিলেন, মূল মামলাই খারিজ হয়ে যাওয়ায় তা কর্পূরের মতো উড়ে গেছে।

সূত্র: আল আরাবিয়া ইংলিশ