
কাবুলে মাদকাসক্তদের একটি পুনর্বাসনকেন্দ্রে পাকিস্তানের বিমান হামলায় অন্তত ২৬৯ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের বেশিরভাগই ছিলেন চিকিৎসাধীন রোগী। তাদের স্বজনদের প্রশ্ন- কেন নিরস্ত্র মানুষদের ওপর এই হামলা চালানো হলো?
গত ১৬ মার্চ রাতে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলের কাবুল-জালালাবাদ মহাসড়কের পাশে অবস্থিত ওমিদ পুনর্বাসনকেন্দ্রে এই হামলা চালানো হয়। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে নিহতের সংখ্যা ২৬৯ বলা হলেও প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ঘটনাটিকে সাম্প্রতিক আফগান ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ হামলা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
হামলায় নিহতদের একজন ২৪ বছর বয়সী মিরওয়াইস। তার বোন মাসুদা বলেন, ‘আমার ভাইয়ের শরীর টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিল। শুধু মাথা পাওয়া গিয়েছিল। জন্মদাগ দেখে তাকে চিনেছি।’
হামলার পর নিহতদের অনেককে গণকবরে দাফন করা হয়। অনেক মরদেহ এতটাই পুড়ে গিয়েছিল যে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক দপ্তরের প্রতিনিধি ফিওনা ফ্রেজার বলেন, হামলায় কেন্দ্রটির কাঠের তৈরি ভবনগুলোতে আগুন ধরে যায়। এতে হতাহতের সংখ্যা বেড়ে যায়। নিহতদের অধিকাংশই দগ্ধ ও শার্পনেলের আঘাতে মারা যান।
ওমিদ কেন্দ্রটি ২০১৬ সাল থেকে মাদকাসক্তদের চিকিৎসা দিয়ে আসছিল। এটি আগে মার্কিন ও ন্যাটো বাহিনীর ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। পরে সেটিকে পুনর্বাসনকেন্দ্রে রূপান্তর করা হয়। কেন্দ্রটি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছেও পরিচিত ছিল।
হামলার সময় দায়িত্বে থাকা এক চিকিৎসক বিবিসিকে বলেন, তিনটি বোমা ফেলা হয়েছিল। এর একটি নতুন ভর্তি হওয়া রোগীদের থাকার জায়গায় আঘাত হানে। অন্য দুটি প্রশাসনিক ভবন, খাদ্য গুদাম ও কর্মীদের আবাসিক অংশে পড়ে।
এদিকে পাকিস্তান অবশ্য দাবি করেছে, তারা কোনো হাসপাতাল বা বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়নি। তবে দেশটির সেনাবাহিনী বলেছে, তাদের লক্ষ্য ছিল ‘সামরিক ও সন্ত্রাসী অবকাঠামো’। পাকিস্তানের সেনা মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলেন, ওই কেন্দ্রটি সম্ভবত আত্মঘাতী হামলাকারীদের প্রশিক্ষণকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল।
তবে নিহতদের পরিবার ও স্থানীয়রা এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মাসুদা বলেন, ‘ওটা কোনো সামরিক ক্যাম্প ছিল না। সেখানে চিকিৎসার জন্য মানুষ ভর্তি ছিল।’
নিহত মোহাম্মদ আনোয়ার ওয়ালিজাদারের ভাই সেদিক ওয়ালিজাদা বলেন, ‘আমার ভাই দরিদ্রতার কারণে নেশায় জড়িয়ে পড়েছিল। চিকিৎসার জন্য তাকে সেখানে ভর্তি করানো হয়েছিল।’
নিহতদের মধ্যে কেন্দ্রটির কর্মচারীরাও ছিলেন। হেদায়াতুল্লাহ নামের একজন বলেন, তার ভাই এমাল আবদুল মালিক সেখানে রান্নাঘরের সহকারী হিসেবে কাজ করতেন। ওখানে সবাই রোগী ছিল। আমার ভাই শুধু রোগীদের জন্য রান্না করত, বলেন তিনি।
আফগানিস্তানের তালেবান সরকার এই হামলাকে যুদ্ধাপরাধ বলে উল্লেখ করেছে। তালেবান সরকারের উপমুখপাত্র হামদুল্লাহ ফিতরাত আন্তর্জাতিক তদন্ত দাবি করেছেন।
অন্যদিকে পাকিস্তান বলছে, আফগান ভূখণ্ড থেকে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) ও বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীরা পাকিস্তানে হামলা চালাচ্ছে এবং তালেবান সরকার তাদের আশ্রয় দিচ্ছে। তবে কাবুল এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এই হামলার পর পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সম্পর্ক আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে ২০২১ সালে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর যে তুলনামূলক শান্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, তাতেও নতুন করে ভাটা পড়েছে। সূত্র: বিবিসি