মমতার পদত্যাগের অস্বীকৃতিকে ‘হাস্যকর’ বলছে বিজেপি

পদত্যাগ না করা নিয়ে সংবিধান বিশেষজ্ঞরা যা বললেন
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  ০৬ মে ২০২৬, ১২:২৯

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বড় ব্যবধানে পরাজয়ের পরও মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে পদত্যাগ করতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অস্বীকৃতি নিয়ে জোর সমালোচনা শুরু করেছে বিজেপি। মঙ্গলবার বিজেপি নেতারা মমতার এই অবস্থানকে ‘হাস্যকর’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া এ খবর জানিয়েছে। 
রাজ্য বিজেপি মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার অভিযোগ করেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেবল কয়েক দিন আলোচনায় থাকার জন্য এই অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বলেন, তিনি নিজেকে কেবল হাস্যকরই করে তুলছেন। 
দেবজিৎ আরও জানান, নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে কোনও ক্ষোভ থাকলে মমতা ব্যানার্জি সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হতে পারেন। তিনি বলেন, সাংবিধানিক মেয়াদ শেষ হওয়ার পর এমনিতেই তিনি আর মুখ্যমন্ত্রী থাকবেন না।
বিজেপির জাতীয় মুখপাত্র শেহজাদ পুনাওয়ালা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে এই ঘটনাকে ৬ জানুয়ারি ২০২১-এ যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটল হিল হামলার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সহিংসতা উসকে দিয়ে সাংবিধানিক ব্যবস্থাকে ‘শর্ট-সার্কিট’ করার চেষ্টা করছেন। পুনাওয়ালা বলেন, মমতার পরামর্শ অসাংবিধানিক, সংবিধান বিরোধী এবং সাংবিধানিক অবমাননার শামিল। এটি নির্বাচনী পরাজয়ের পর তার ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। 
একটি ভিডিও বার্তায় তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচনে পরাজয়ের পর মমতা ‘ভিকটিম কার্ড’ খেলছেন এবং জনগণের রায় মেনে না নিয়ে নির্বাচন কমিশনকে দোষারোপ করছেন। তার মতে, পদত্যাগ না করলেও ৮ মে বিধানসভা ভেঙে যাবে এবং তিনি সদস্যপদ হারাবেন। এতে বোঝা যায়, তিনি সংবিধানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন।
উল্লেখ্য ২৯৪ সদস্যের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে ২০৭টি আসনে জয়লাভ করে বিজেপি রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়েছে।
এর আগে, কলকাতায় সংবাদ সম্মেলনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভোট গণনায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ তোলেন। তার দাবি, প্রায় ১০০ আসনের রায় ‘লুট’ করা হয়েছে এবং তার দলকে হতাশ করতে ইচ্ছাকৃতভাবে গণনা ধীর করা হয়েছে। তিনি বলেন, আমার পদত্যাগের প্রশ্নই ওঠে না, কারণ আমরা জনগণের রায়ে নয়, ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে পরাজিত হয়েছি। আমি লোকভবনে যাব না।

মমতার পদত্যাগ না করা নিয়ে সংবিধান বিশেষজ্ঞরা যা বললেন
মঙ্গলবার কলকাতায় রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলের পরদিন আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: আইএএনএস
মঙ্গলবার কলকাতায় রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলের পরদিন আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: আইএএনএস
নির্বাচনে পরাজয়ের পর মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানানো দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন এবং এটি একইসঙ্গে সাংবিধানিকভাবে অগ্রহণযোগ্য ও অপ্রাসঙ্গিক বলে মন্তব্য করেছেন দেশের বিশিষ্ট সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞরা। মঙ্গলবার সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মমতা আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করলেন কি না, তা খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়; কারণ সংবিধান অনুযায়ী গভর্নর একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতাকে সরকার গঠনের জন্য আমন্ত্রণ জানাতে বাধ্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর পুরনো বিধানসভা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে এবং মুখ্যমন্ত্রীসহ বিদায়ী মন্ত্রিসভা তাদের সাংবিধানিক ক্ষমতা হারায়।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত
সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি কে. সঞ্জয় কিশান কউল বলেন, একটি দল নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হয় এবং মেয়াদ শেষে সেই দল আর ক্ষমতায় থাকতে পারে না। তিনি বলেন, নির্বাচনের ফলাফলে অসন্তুষ্ট হলে তারা আইনি পথে লড়াই করতে পারেন, কিন্তু ক্ষমতায় আঁকড়ে থাকা সম্ভব নয়।
এই পরিস্থিতিতে গভর্নরের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে বিচারপতি কউল বলেন, এ বিষয়ে গভর্নরকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল কে.কে. বেণুগোপালও একই অভিমত প্রকাশ করে বলেন, বৃহত্তম দলের নেতাকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানানো সাংবিধানিক রীতি এবং গভর্নরের বিশেষ অধিকার। মমতা পদত্যাগ করতে অস্বীকার করলেও, সংবিধান অনুযায়ী গভর্নর নতুন মুখ্যমন্ত্রী এবং তার মন্ত্রিসভাকে শপথ পড়াতে পারেন। তিনি উল্লেখ করেন, নির্বাচন পরবর্তী পরাজয়ের পর মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ না করার এমন কোনও নজির তার জানা নেই।
সংবিধান ও আইন যা বলছে
কলকাতার আইনজীবী দীপন কুমার সরকার জানান, নতুন সরকার শপথ নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আগের মন্ত্রিসভার অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়ে যায়। এর আগে প্রয়োজনে গভর্নর আগের মন্ত্রিসভা বরখাস্ত করতে পারেন কিংবা রাষ্ট্রপতির শাসন জারি হতে পারে।
সংবিধানের ১৬৩ ও ১৬৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, গভর্নর তার বিশেষ ক্ষমতায় যেকোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং তার সেই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলে গণ্য হয়। এছাড়া সংবিধানের ১৭২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রতিটি রাজ্য বিধানসভার মেয়াদ পাঁচ বছর। ২০২১ সালের ৮ মে প্রথম অধিবেশন হওয়ায়, বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার মেয়াদ আগামী ৭ মে শেষ হচ্ছে। সংবিধানের এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নির্ধারিত মেয়াদের পর বিধানসভা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই ভেঙে যায়।
সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া