
যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করলেও, এই পদক্ষেপটি দুই দেশের সম্পর্কের এক নাজুক সময়ে সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক জনমত জরিপ ও মার্কিন প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ অসংলগ্নতা ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের ভাবমূর্তিকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
গ্যালপ-এর সাম্প্রতিক এক জরিপ অনুযায়ী, একবিংশ শতাব্দীতে এসে আমেরিকার সাধারণ মানুষের কাছে ইসরায়েলের গ্রহণযোগ্যতা সর্বনিম্ন পর্যায়ে ঠেকেছে। ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো দেখা যাচ্ছে, মার্কিন নাগরিকরা ফিলিস্তিনিদের তুলনায় ইসরায়েলিদের প্রতি খুব একটা বেশি সহানুভূতি দেখাচ্ছেন না। এমন এক বৈরী সময়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় জনমনে তীব্র সন্দেহ তৈরি হয়েছে, যার দায়ভার অনেকটা ইসরায়েলের ওপরই গিয়ে পড়ছে।
মার্কিন রক্ষণশীল রাজনীতির ভেতরেও ইসরায়েল ইস্যুতে বিভাজন স্পষ্ট হচ্ছে। কট্টর ডানপন্থীদের একটি অংশ এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বরা এখন আমেরিকার নানা সমস্যার জন্য সরাসরি ইসরায়েলকে দায়ী করছেন। বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের সাবেক কর্মকর্তা জো কেন্টের পদত্যাগ এই বিতর্ককে আরও উস্কে দিয়েছে।
ন্যাশনাল কাউন্টারটেররিজম সেন্টারের বিদায়ী পরিচালক জো কেন্ট পদত্যাগপত্রে অভিযোগ করেছেন, ‘ইসরায়েল ও দেশটির শক্তিশালী লবিংয়ের চাপেই’ যুক্তরাষ্ট্রকে এই যুদ্ধে টেনে নেওয়া হয়েছে। তিনি এমনকি রক্ষণশীল অধিকারকর্মী চার্লি কার্কের হত্যাকাণ্ডের পেছনেও ইসরায়েলের হাত থাকার মতো ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে সমর্থন দিয়েছেন। যদিও এস্টাবলিশমেন্ট রিপাবলিকানরা কেন্টকে ‘উন্মাদ’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন, তবে ট্রাম্পই তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়েছিলেন- যা এখন ইসরায়েলের জন্য নেতিবাচক প্রচারণার হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইসরায়েলের ভাবমূর্তি রক্ষায় ট্রাম্প প্রশাসন কোনো সুবিধাই করতে পারছে না, বরং তাদের কিছু দাবি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও দাবি করেছিলেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক ‘আসন্ন হুমকি’। তার যুক্তি ছিল- ইসরায়েল ইরানে হামলা চালাবেই, আর ইরান তার প্রতিশোধ নিতে মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করবে। এই বক্তব্য থেকে সাধারণ মানুষের মনে ধারণা জন্মেছে যে, ইসরায়েল আসলে যুক্তরাষ্ট্রকে বাধ্য করছে যুদ্ধে জড়াতে।
গত বুধবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের দক্ষিণ পার্স গ্যাস ক্ষেত্রে ইসরায়েলি হামলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র কিছুই জানত না। ট্রাম্পের এই দাবি ইসরায়েলকে এককভাবে দায়ী করার সুযোগ করে দিয়েছে। যদিও সিএনএন-এর তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্র এই হামলার বিষয়ে আগে থেকেই অবগত ছিল এবং ইসরায়েলি সূত্রগুলোও সমন্বিত হামলার কথা জানিয়েছে।হেগসেথকে প্রশ্ন করা হয়—ইসরায়েল যদি নিজেদের লক্ষ্যেই কাজ করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র কেন সহায়তা করছে? হেগসেথ এর কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। একইভাবে ডিরেক্টর অফ ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স তুলসি গ্যাবার্ডও ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য এক কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট জবাব দিতে ব্যর্থ হন।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, দক্ষিণ পার্স গ্যাস ক্ষেত্রে ইসরায়েল ‘একাই’ হামলা চালিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র আগে থেকে জানত কি না, সে বিষয়ে তিনি নীরব থাকেন। যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধে টেনে আনার অভিযোগকে ‘হাস্যকর’ বলে উড়িয়ে দেন তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের অসংলগ্ন বার্তা এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার প্রবণতা ইসরায়েলের সুনামকে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির মুখে ফেলছে। আমেরিকান জনগণের বড় অংশ এই যুদ্ধের যৌক্তিকতা নিয়ে সন্দিহান, আর প্রশাসনের অস্পষ্টতা সেই সন্দেহকে ষড়যন্ত্র তত্ত্বে রূপ দিচ্ছে। এর ফলে মার্কিন সমাজে ইসরায়েলের যে অবস্থান ছিল, তা ভবিষ্যতে বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে।