
ডেনমার্কের মধ্যাঞ্চলে ‘মিউজিয়াম মিডটজিল্যান্ড’-এর গবেষকরা একটি প্রাচীন মন্দির ও সুরক্ষিত জনবসতির (ফোর্টিফায়েড সেটলমেন্ট) সন্ধান পেয়েছেন। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, এই আবিষ্কার ইউরোপের প্রাচীন সমাজব্যবস্থা, ধর্মীয় রীতিনীতি এবং উত্তর ইউরোপ থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নেটওয়ার্ক সম্পর্কে যুগান্তকারী তথ্য প্রদান করবে।
স্ক্যান্ডিনেভিয়ার বৃহত্তম বসতি: হেডেগার্ড
এই আবিষ্কারের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘হেডেগার্ড’ (Hedegård) নামক এলাকাটি। এটি স্ক্যান্ডিনেভিয়ার বৃহত্তম সমাধিক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত এবং যিশু খ্রিষ্টের জন্মের সমসাময়িক শতাব্দীতে এটিই ছিল ডেনমার্কের বৃহত্তম জনবসতি। স্কজর্ন নদীর (Skjern River) উত্তর তীরের একটি উঁচু পাহাড়ের ওপর প্রায় ৪ হেক্টর এলাকা জুড়ে এই গ্রামটি বিস্তৃত ছিল, যা একটি শক্তিশালী দেয়াল দিয়ে ঘেরা ছিল।
আবিষ্কৃত মন্দিরের বিশেষত্ব প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, এই মন্দিরটি ‘খ্রিষ্টীয় শূন্য অব্দ’ (0 AD) এর কাছাকাছি সময়ে নির্মিত। দুর্গের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে অবস্থিত এই আয়তাকার মন্দিরটির আয়তন ১৫ বাই ১৬ মিটার।
কাঠামো: মন্দিরের বাইরের দিকে মাটির প্রায় ২ মিটার গভীরে একটি গভীর পরিখা পাওয়া গেছে, যেখানে ৩০ সেন্টিমিটার অন্তর গোলাকার কাঠের খুঁটি পুঁতে রাখা হয়েছিল।
অভ্যন্তরীণ সজ্জা: মন্দিরের ভেতরে মাটির দেয়াল এবং ২ বাই ২ মিটারের একটি সুসজ্জিত যজ্ঞকুণ্ড (Hearth) পাওয়া গেছে। জ্যামিতিক নকশা ও কারুকার্য খচিত এই কুণ্ডটি প্রমাণ করে যে, ভবনটি ঘরোয়া কাজের বদলে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের জন্যই ব্যবহৃত হতো।
মিউজিয়াম ইন্সপেক্টর মার্টিন উইনথার ওলেসেন বলেন, ‘হেডেগার্ডের সবকিছুই সাধারণের চেয়ে বড় এবং বিস্ময়কর। এই আবিষ্কার আমাদের ওই সময়ের ধর্মীয় স্থাপত্যের প্রথম বাস্তব চিত্র উপহার দিয়েছে।’
রোমান সাম্রাজ্যের প্রভাব ও প্রতিরক্ষা গবেষকদের মতে, এই দুর্গের নির্মাণকাল এবং রোমান সাম্রাজ্যের উত্তরমুখী সম্প্রসারণের সময়কাল একই। রোমানরা যখন বর্তমান জার্মানি ছাড়িয়ে এলবে নদী পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছিল, তখন জুটল্যান্ড (Jutland) এলাকাটি সরাসরি হুমকির মুখে পড়ে। প্রত্নতাত্ত্বিক ওলেসেনের মতে, রোমান সামরিক চাপের মুখে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার্থেই সম্ভবত এই শক্তিশালী প্রাচীর ও দুর্গ নির্মাণ করা হয়েছিল।
আবিষ্কারের প্রেক্ষাপট
হেডেগার্ডের এই লৌহ যুগের সমাধিক্ষেত্রটি প্রথম ১৯৮৬ সালে প্রত্নতাত্ত্বিক ওরলা ম্যাডসেন আবিষ্কার করেন। এরপর ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত খনন কাজ চললেও মাঝপথে তা বন্ধ হয়ে যায়। ২০১৬ সালে মিউজিয়াম মিডটজিল্যান্ড পুনরায় অনুসন্ধান শুরু করে এবং ২০২৩ সালের গ্রীষ্মে এই অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করে। প্রত্নতাত্ত্বিকরা এটিকে গত কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম দর্শনীয় (spectacular) আবিষ্কার হিসেবে অভিহিত করছেন।