এআই দক্ষতায় ঘাটতিতে কী করবে বাংলাদেশ?

ডেস্ক রিপোর্ট
  ১৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১৪:১৬


চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের দুনিয়ায় টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশকে যে দ্রুতই এআই শিখে নিতে হবে, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই কারো; তবে সেই যাত্রায় কাঠামোগত মানদণ্ড তৈরি করাই ‘সবচেয়ে জরুরি’ বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। তারা বলছেন, শক্তিশালী ডেটা গভর্ন্যান্স আইন, নিয়মিত এআই অডিট এবং স্পষ্ট নৈতিক কাঠামো ছাড়া কোনো রূপান্তর টেকসই হবে না। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই বাস্তবায়নের বাস্তব চিত্র বুঝতে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতায় নজর দেওয়া যেতে পারে।
বাংলাদেশ ইপিজেড ইনভেস্টরস অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক এবং শাশা ডেনিমস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামস মাহমুদ বলছেন, তাদের কারখানায় এআই বাস্তবায়ন খুব একটা বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।
তার ভাষায়, “বর্তমানে আমরা এডিবির বিআইআরডিআইই প্রোগ্রামের সঙ্গে কাজ করছি, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ, শিল্পখাত ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের যৌথ অংশগ্রহণে দুটি প্রকল্প জমা দেওয়া হয়েছে। আগেও আমাদের কিছু এআই অ্যাপ বাস্তবায়ন করা ছিল।” শামস মাহমুদের মতে, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল সঠিক প্রোডাক্ট অ্যাপ্লিকেশন নির্বাচন।
“বাজারে অনেক রিপ্লিকেশন বা অনুরূপ সমাধান রয়েছে। কোনটি বাস্তবে কারখানার জন্য উপযোগী, সেটি ঠিক করাটাই আসল কাজ।”
শাশা ডেনিমসের কারখানায় বর্তমানে সব মেশিন আইওটিতে যুক্ত এবং সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়। অনলাইন মনিটরিংয়ের মাধ্যমে কারখানা কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি মেশিন প্রস্তুতকারকরাও উৎপাদন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। এতে যেকোনো ‘ব্রেকডাউন’ হলে দূর থেকেই সমস্যা শনাক্ত ও সমাধানের সুযোগ তৈরি হয়।
শামস মাহমুদ মনে করেন, যদি স্থানীয়ভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ইন্টারনেট সংযুক্ত সেন্সর ও যন্ত্রের নেটওয়ার্ক (আইওটি) সফটওয়্যারের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কার্যকরী অংশ তৈরি করা সম্ভব হয়, তাহলে খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যাবে। তবে এ ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হলো মেশিনের অভ্যন্তরীণ কম্পিউটার সিস্টেমে প্রবেশাধিকারের অনুমোদন (অথোরাইজেশন), যা অনেক সময় সহজে পাওয়া যায় না।
বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের সক্ষমতা প্রসঙ্গে শামস মাহমুদ প্রচলিত ধারণার সঙ্গে একমত নন।
তিনি বলেন, “আমি একমত নই যে আমাদের একাডেমিয়া দুর্বল। মূল সমস্যা হলো আমাদের শিল্পমালিকদের মানসিকতা। আমরা অনেক সময় স্থানীয়ভাবে তৈরি প্রযুক্তিকে স্বাভাবিকভাবেই কম মানের মনে করি।”
তিনি জানান, শাশা ডেনিমস নিয়মিতভাবে ইন্টার্নশিপ, সার্টিফিকেশন ও যৌথ প্রোগ্রামের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করার জন্য বুটেক্স, বুয়েট, আহসানউল্লাহ ইউনিভার্সিটি ও বিইউএফটির সঙ্গে কাজ করছে।
তার মতে, স্থানীয় প্রতিভাবানদের উদ্ভাবনী চিন্তাকে বাস্তবে রূপ দিতে সবচেয়ে বড় বাধা অর্থায়ন। সাম্প্রতিক সময়ে এডিবির বাংলাদেশে কার্যক্রম সম্প্রসারণ এ ক্ষেত্রে সুযোগ তৈরি করেছে।
এসএমইদের জন্য চাপ বেশি
শামস মাহমুদ মনে করেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর (এসএমই) জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গ্রহণ তুলনামূলক কঠিন।
তার ভাষায়, “সামান্য বিনিয়োগও এসএমইগুলোর জন্য দৈনন্দিন ব্যবসা পরিচালনার মূলধন হয়ে দাঁড়ায়। যদিও তাত্ত্বিকভাবে ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো বেশি অভিযোজনক্ষমতা, তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ইনস্টল করার পাশাপাশি ডেটা ব্যাকআপ, রক্ষণাবেক্ষণ কিংবা দক্ষ টেকনি
শুধু এআই থাকলেই চলবে না মন্তব্য করে তিনি বলেন, “ছোট অপারেশনের ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অনেক সময় কার্যক্রমকে সংগঠিত করতে সাহায্য করে, কিন্তু ইনভেন্টরি ম্যানেজমেন্ট বা নিজস্ব ইআরপি তৈরির তুলনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সমাধান অনেক সময় বেশ ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে।”
ব্যবসার খরচ বাড়ার প্রেক্ষাপটে তিনি স্বয়ংক্রিয়তা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ‘অনিবার্য’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তবে শ্রমিকদের মধ্যে এটি অনেক সময় চাকরি হারানোর ভয় তৈরি করে। আবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনে, যেটিও কিছু ক্ষেত্রে হুমকি হিসেবে দেখা হয় বলে মনে করেন এ ব্যবসায়ী নেতা।
নীতি ও অবকাঠামো ছাড়া সমাধান কঠিন

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিষয়ে সরকারের ভূমিকায় জোর দিয়ে শামস মাহমুদ বলেন, “এআই বাস্তবায়নে সরকারের এগিয়ে আসা জরুরি। বড় ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে শিল্পখাতকে বোঝার জন্য ডেটা ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা ও ব্যবহারের নীতিগত কাঠামো প্রয়োজন।
“পাশাপাশি শিল্পখাতে ইন্টারনেট সংযোগ এখনও ব্যয়বহুল, ডেটা সংরক্ষণও খরচসাপেক্ষ। অবকাঠামো উন্নয়ন ছাড়া ভবিষ্যৎ উপযোগী ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টর গড়ে তোলা সম্ভব নয়।”
তার মতে, এসব উদ্যোগ নেওয়া গেলে এসএমই প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বয়ংক্রিয়তা গ্রহণ সহজ হবে।
শিক্ষা, গবেষণা ও নীতিই সমাধানের চাবিকাঠি
তৈরি পোশাক খাতের কারখানায় যে দক্ষতার সংকট দেখা যাচ্ছে, তার শিকড় আরও গভীরে— শিক্ষা, গবেষণা এবং নীতিগত প্রস্তুতিতে।
শিল্পখাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গ্রহণ যত দ্রুত বাড়ছে, সেই তুলনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা–সম্পন্ন দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির কাঠামো এখনো পিছিয়ে আছে। ফলে সম্ভাবনা থাকলেও তা কাজে লাগানোর সক্ষমতা গড়ে উঠছে না।
কানাডার ডালহৌসি ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করছেন শুভ্র পাল। তার গবেষণার বিষয় ‘অটোনোমাস সিস্টেম’ ও ‘এজ ইন্টেলিজেন্স’।
এর আগে তিনি বাংলাদেশে দুটি স্টার্টআপে কাজ করেছেন। একটি ‘মার্কোপলো এআই’; অন্যটি ‘যান্ত্রিক লিমিটেড’। দুটি প্রতিষ্ঠানেই তিনি শীর্ষ এআই ডেভেলপার ছিলেন।
শুভ্র পাল মনে করেন, বাংলাদেশে শিল্পের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সংযোগ এখনো কার্যকর অংশীদারত্বে রূপ নেয়নি।
তার মতে, “গবেষকদের সবচেয়ে বড় সংকট লোকাল ডেটা। আর শিল্পখাতের সংকট হলো সময় ও গবেষণা চালানোর লোকবল।”
এই সংকট দূর করার সুপারিশ হিসেবে তিনি বলেছেন, ব্যাংক বা টেলিকম কোম্পানিগুলো যদি ‘নন-সেনসিটিভ’ বা ‘অ্যানোনিমাইজড ডেটা’ এবং একটি নির্দিষ্ট সমস্যা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে দেয়, শিক্ষার্থীরা থিসিস বা প্রকল্পের মাধ্যমে তার সমাধান বের করতে পারে।
“এতে কোম্পানিগুলো তুলনামূলক কম খরচে গবেষণা সমাধান পাবে, আর শিক্ষার্থীরা বাস্তব সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হয়ে দক্ষতা অর্জন করবে। মনে রাখতে হবে, এআই বা ‘ডিপ-টেক’ তিন মাসের ইন্টার্নশিপে শেখা সম্ভব নয়।”
এ কারণে উন্নত দেশের মতো ‘কো-অপ’ মডেল প্রয়োগের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার মাঝেই ছয় মাস বা এক বছর শিল্পখাতে কাজ করবে। এতে কোম্পানিগুলো পাবে ‘প্রোডাকশন-রেডি’ কর্মী, আর শিক্ষার্থীরা কাগুজে জ্ঞানের বদলে বাস্তব দক্ষতা অর্জন করবে।”
পরিবর্তন দরকার নীতিগত জায়গায়
শিল্পখাতকে গবেষণায় যুক্ত করতে নীতিগত পরিবর্তন আনার কথাও এখন বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক বিএম মইনুল হোসেন বলেন, “দেশের অনেক পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসংক্রান্ত কোর্স চালু আছে, বিশেষ করে কম্পিউটার বিজ্ঞান, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং ও আইটি বিভাগে। কোথাও কোথাও মাস্টার্স বা সার্টিফিকেট প্রোগ্রামও রয়েছে।”
তবে বর্তমান পাঠ্যসূচি শিল্পখাতের চাহিদার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, “শুধু ল্যাবভিত্তিক অনুশীলন যথেষ্ট নয়। শিক্ষার্থীদের বাস্তব সমস্যা ও বাস্তব ডেটা নিয়ে কাজ করতে হবে।”
অপ্রতুল অবকাঠামোকে ‘আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা’ মন্তব্য করে এই অধ্যাপক বলেন, “এআই সংশ্লিষ্ট ব্যবহারিক কাজের জন্য যে উচ্চক্ষমতার গ্রাফিক্স প্রসেসর (জিপিইউ) ও ক্লাউড কম্পিউটিংসহ অন্যান্য সুবিধা থাকা উচিত, বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে সেটি নেই।”
তিনি বলেন, “প্রায়োগিক জ্ঞানের উপর গুরুত্ব দিয়ে দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রের বাস্তব সমস্যা সমাধানের সংস্কৃতি গড়ে তোলার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে একে অপরকে সহযোগিতা করতে হবে। এর সঙ্গে এআই প্রযুক্তির সর্বোচ্চ সুবিধা গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় কম্পিউটিং রিসোর্স বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে থাকাটা নিশ্চিত করতে হবে।”
মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা
‘যান্ত্রিক লিমিটেডের’ প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শুভ আল-ফারুক বলেন, “গাড়ির মডেল, জ্বালানি ও প্রযুক্তির বৈচিত্র্য দ্রুত বাড়লেও আমাদের দেশের অনেক টেকনিশিয়ান এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারছেন না। দক্ষ টেকনিশিয়ানের ঘাটতি এবং তাদের আপগ্রেড করার দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়ার কারণে আমরা একটি এআইভিত্তিক সিস্টেম তৈরি করেছি।”
“এই সিস্টেম গাড়ির মেইনটেন্যান্স হিস্ট্রি, অ্যাসেসমেন্ট এবং সাউন্ড–ভিডিও ডেটার ভিত্তিতে নির্দিষ্ট সমস্যা সমাধানে টেকনিশিয়ানকে বিশ্বমানের গাইডেন্স দেয়। ফলে স্বল্পদক্ষ টেকনিশিয়ানও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারছেন।”
দক্ষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জানা জনবলের বিষয়ে তিনি আরও বলেন, “দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি শুধু আমাদের খাতে নয়, সব খাতেই রয়েছে। তবে এটি কোনো তীব্র সংকট নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী জনবল তৈরি করা এবং ধারাবাহিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জ ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব।”
ব্যক্তিগত ব্যবহার বাড়ছে, কিন্তু দিকনির্দেশনা নেই
পর্তুগালের নোভা স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনোমিক্সের গবেষক কায়সুল খান বলেন, “বাংলাদেশে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক পর্যায়ে এআই টুল ব্যবহারের প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। চ্যাটজিপিটি, পারপ্লেক্সিটি বা কোপাইলটের মতো টুল এখন অনেকের দৈনন্দিন কাজের অংশ।”
তবে এই ব্যবহার প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পরিচালিত নয় বলে মন্তব্য করেন পাঠ্যক্রম নিয়ে কাজ করা কায়সুল খান।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশে এখনো কোনো জাতীয় এআই আইন নেই, যা নির্ধারণ করবে কোথায় এআই ব্যবহার গ্রহণযোগ্য এবং কোথায় নয়। ইউরোপ বা যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের নীতিমালা থাকায় ব্যবহারকারীরা একটি স্পষ্ট সীমারেখা পান।
বাংলাদেশেও জাতীয় এআই আইন জরুরি মন্তব্য করে তিনি বলেন, “সঠিকভাবে ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে এআই গ্রাম ও শহরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষা উপকরণের বৈষম্য কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষা ও বিজ্ঞান মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।”
ঝুঁকিটা কাঠামোগত, বলছে ইউনেস্কো
ইউনেস্কোর মূল্যায়ন অনুযায়ী, বাংলাদেশে এআই অগ্রগতির পথে সংকটগুলো বিচ্ছিন্ন নয়, বরং কাঠামোগত।
নীতিগতভাবে জাতীয় এআই নীতি এখনো খসড়া পর্যায়ে থাকায় বাস্তবায়নের দায়িত্ব ও জবাবদিহি স্পষ্ট নয়। স্বাধীন ডেটা প্রোটেকশন ও সাইবার নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের অভাব এই দুর্বলতাকে আরও বাড়িয়েছে।
ডেটা অবকাঠামোতেও বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ওপেন ডেটা কাঠামো দুর্বল, সংবেদনশীল ডেটার শ্রেণিবিন্যাস অস্পষ্ট এবং বাংলা ভাষাভিত্তিক মানসম্মত ডেটাসেটের অভাব দেশীয় এআই মডেল উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তিগত সমস্যা— ইন্টারনেট সংযোগের ব্যয়, গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং ডেটা সেন্টার ও ক্লাউড সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা। শিক্ষা ও মানবসম্পদ কাঠামোতেও সমন্বিত দক্ষতা উন্নয়ন কৌশলের অভাব স্পষ্ট।

ইউনেস্কো সতর্ক করেছে, এসব সংকট একসঙ্গে সমাধান না হলে বাংলাদেশে এআই গ্রহণের গতি শ্লথই থাকবে।
ইউনেস্কোর পর্যবেক্ষণের পর সরকার যা বলছে
ইউনেস্কোর এই মূল্যায়নের প্রেক্ষাপটে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, সরকার এআই গ্রহণের ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, বরং নীতি, ডেটা গভর্ন্যান্স এবং মানবসম্পদ— এই তিন স্তম্ভের সমন্বিত কাঠামো গড়ে তোলার দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
তিনি বলেন, “জাতীয় ডিজিটাল রূপান্তর কৌশলের আওতায় একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় এআই নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলমান রয়েছে, যেখানে দায়িত্বশীল ব্যবহার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির বিষয়গুলোতে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।”
ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব জানান, এআই সম্পর্কিত ডেটা ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে নাগরিকের ডেটার ওপর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং, তৈরি পোশাক, টেলিকম ও এসএমই খাতের জন্য প্রায়োগিক এআই দক্ষতা গড়ে তুলতে শিল্প ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতার ভিত্তিতে প্রশিক্ষণ ও অ্যাপ্রেন্টিসশিপ কর্মসূচির রোডম্যাপ তৈরি করা হচ্ছে।
তার মতে, এই কাঠামো বাস্তবায়িত হলে এআই মানুষের সিদ্ধান্তকে প্রতিস্থাপন করবে না, বরং সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে আরও দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক করে তুলবে।
উত্তরণের পথ আছে, কিন্তু সময় কম
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রথম ও সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো একটি কাঠামোগত মানদণ্ড তৈরি করা, যেখানে সরকার, শিল্প ও বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে দক্ষতার মানদণ্ড নির্ধারণ হবে। এর পাশাপাশি পাবলিক–প্রাইভেট অংশীদারত্বে এআই এক্সিলেন্স সেন্টার, অ্যাপ্লায়েড এআই ল্যাব এবং গবেষণায় আর্থিক প্রণোদনা নিশ্চিত করতে হবে।
তারা বলছেন, শক্তিশালী ডেটা গভর্ন্যান্স আইন, নিয়মিত এআই অডিট এবং স্পষ্ট নৈতিক কাঠামো ছাড়া কোনো রূপান্তর টেকসই হবে না।
এই নীতিগত বিলম্বের অর্থ হলো, বাংলাদেশে ভবিষ্যতের কাজ তৈরি হবে না, বরং তৈরি হবে অন্য দেশের প্ল্যাটফর্ম ও ইকোসিস্টেম।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা মনে করেন, এআই বিপ্লব অপেক্ষা করে না। বাংলাদেশ যদি এখন সিদ্ধান্ত না নেয়, তবে আগামী কয়েক বছরে শুধু একটি শিল্প নয়, দক্ষতা, বিনিয়োগ ও মেধার বাজার হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে।
পোশাক শিল্প একসময় যেমন অর্থনীতির চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছিল, ভবিষ্যতে সেই জায়গাটি দখল করবে এআইয়ে দক্ষ মানবসম্পদ।
এই রূপান্তরে অংশ নিতে পারলে বাংলাদেশ লাভবান হবে; আর পিছিয়ে পড়লে এই বিপ্লবের ইতিহাসে দেশটি কেবল একজন দর্শক হিসেবেই থেকে যাবে বলে সতর্ক করে দিয়েছেন বিশ্লেষকরা। সূত্র : বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম