
বারবার টনসিলের সংক্রমণ, গলা ব্যথা কিংবা ঘুমের মধ্যে নাক ডাকার সমস্যা হলে অনেক সময় চিকিৎসক টনসিল অপারেশনের পরামর্শ দেন। এই অস্ত্রোপচারের কথা শুনলে অনেকের মনে তৈরি হয় নানা ভয়–রক্তপাত হবে না তো? খুব বেশি ব্যথা হবে? অপারেশনের পর খেতে পারব তো? কতদিনে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারব?
টনসিল অপারেশনের নিয়ে এসব উদ্বেগ স্বাভাবিক। প্রয়োজনীয়তা থাকলে আধুনিক নাক-কান-গলা চিকিৎসায় টনসিল অপসারণ একটি প্রচলিত ও সাধারণত নিরাপদ অপারেশন । শুধু ভয় পাওয়ার কারণে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পিছিয়ে না দিয়ে আগে জানা দরকার–কখন টনসিল অপারেশনের প্রয়োজন এবং তারপর কী কী বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।
টনসিল বড় হলে কি অপারেশনে করতে হবে?
না, বিষয়টি এমন নয়। টনসিলের আকার বড় হওয়া মানে অপারেশনের প্রয়োজন–এমন কোনো নিয়ম নেই। অনেক শিশুর টনসিল তুলনামূলক বড় হলেও কোনো উল্লেখযোগ্য সমস্যা থাকে না এবং তাদের অস্ত্রোপচারেরও প্রয়োজন হয় না।
অপারেশনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় মূলত রোগীর উপসর্গ, সমস্যার তীব্রতা এবং দৈনন্দিন জীবনে এর প্রভাব বিবেচনা করা হয়। যেমন–বারবার গুরুতর টনসিলের সংক্রমণ, ঘন ঘন গলা ব্যথা, বড় টনসিলের কারণে খাবার গিলতে সমস্যা অথবা ঘুমের সময় নাক ডাকা ও শ্বাস-প্রশ্বাসে বাধা। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে ঘুমের মধ্যে শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা হলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। দীর্ঘদিনের ঘুমের ব্যাঘাত শিশুর দৈনন্দিন কার্যক্রম, মনোযোগ ও স্বাভাবিক বিকাশেও প্রভাব ফেলতে পারে।
অপারেশনে কি অনেক রক্তপাত হয়?
টনসিল অপারেশন নিয়ে সবচেয়ে বেশি যে ভয়টি কাজ করে, তার একটি হলো রক্তপাত। আধুনিক নাক-কান-গলা অপারেশনে রক্তপাত নিয়ন্ত্রণের জন্য বিভিন্ন সার্জিক্যাল টেকনিক বা অস্ত্রোপচারের কৌশল ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপারেশন নিয়ন্ত্রিতভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব।
তবে মনে রাখতে হবে, কোনো অপারেশনের ঝুঁকি একেবারে শূন্য নয়। টনসিল অস্ত্রোপচারের পরও রক্তপাতের ঝুঁকি থাকতে পারে। তাই অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসকের নির্দেশনা মেনে চলা এবং অস্বাভাবিক রক্তপাত হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
অস্ত্রোপচারের আগে যদি সক্রিয় টনসিলের ইনফেকশন বা সংক্রমণ থাকে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী উপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিকের পূর্ণ কোর্স সম্পন্ন করে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। এতে অস্ত্রোপচার আরও নিরাপদ ও রক্তপাত নিয়ন্ত্রিত রাখতে সহায়তা করতে পারে।
অপারেশনের পর কি খুব বেশি ব্যথা হয়?
টনসিল অস্ত্রোপচারের পর গলা ব্যথা হওয়া স্বাভাবিক। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের পর কয়েকদিন ব্যথা কিছুটা বাড়তে পারে, এরপর ধীরে ধীরে কমে আসে।
এ সময় পর্যাপ্ত পানি ও তরল পান করা, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নরম খাবার গ্রহণ এবং নির্ধারিত ব্যথানাশক ওষুধ সঠিক সময়ে গ্রহণ করা গুরুত্বপূর্ণ। মুখে ওষুধ খেতে অসুবিধা হলে, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পায়ুপথে ব্যবহারের সাপোজিটরিও ব্যথা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহার করা যেতে পারে। ব্যথার ভয়ে খাওয়া-দাওয়া একেবারে বন্ধ করে দেওয়া ঠিক নয়। পর্যাপ্ত পানি ও তরল গ্রহণ এবং নিয়মিত খাবার গ্রহণ সুস্থ হয়ে ওঠার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
টনসিল অপারেশনে বাইরে কি
কোনো সেলাই থাকে?
টনসিল অপারেশনে বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে মুখের ভেতর দিয়ে করা হয়। তাই বাইরে কোনো কাটা দাগ বা সেলাই থাকে না।
কতদিনে স্বাভাবিক জীবনে ফেরা যায়?
সুস্থ হওয়ার সময় সবার ক্ষেত্রে এক রকম নয়। সাধারণভাবে প্রায় দুই সপ্তাহের মধ্যে বেশির ভাগ রোগী স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরতে পারেন। তবে বয়স, শারীরিক অবস্থা, অস্ত্রোপচারের ধরন এবং অস্ত্রোপচার-পরবর্তী পরিচর্যার ওপর সময় কিছুটা কম-বেশি হতে পারে।
যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে
অপারেশনের পর রোগী ও অভিভাবকদের কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন—
l পর্যাপ্ত পানি ও তরল গ্রহণ করতে হবে।
l চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত নরম খাবার খেতে হবে।
l এ সময় অতিরিক্ত শক্ত ও খুব গরম খাবার এড়িয়ে চলতে হবে।
l চিকিৎসকের প্রেসক্রাইব করা অ্যান্টিবায়োটিক ও ব্যথানাশক ওষুধ নির্ধারিত সময়ে গ্রহণ করতে হবে।
l পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ফলোআপ করতে হবে।
অপারেশনের পর মুখ বা গলা দিয়ে অস্বাভাবিক রক্তপাত, শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত দুর্বলতা কিংবা পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে যা জানা দরকার
এমন অনেক রোগী আছেন, যাদের টনসিল বড় হলেও অপারেশনের প্রয়োজন নেই। তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দেখতে হবে–কত ঘন ঘন সমস্যা হচ্ছে, বারবার অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন হচ্ছে কিনা, সমস্যাটি কতটা গুরুতর, ঘুম ও শ্বাস-প্রশ্বাসে কতটা প্রভাব পড়ছে, খাওয়া বা গিলতে সমস্যা হচ্ছে কিনা, চিকিৎসায় কতটা উপকার পাওয়া যাচ্ছে এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রা কতটা ব্যাহত হচ্ছে। শুধু টনসিলের আকার নয়, রোগীর উপসর্গ ও জীবনযাত্রার ওপর এর প্রভাবই অপারেশনের প্রয়োজন নির্ধারণে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ভয় নয়, সঠিক সিদ্ধান্তই গুরুত্বপূর্ণ
টনসিল অপারেশনেকে অযথা ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই। আবার শুধু টনসিল বড় হওয়ার কারণে কিংবা অন্যের অভিজ্ঞতা শুনে অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেওয়াও ঠিক নয়।
টনসিল অপারেশনের প্রয়োজন আছে কিনা, সেটি রোগীর উপসর্গ, শারীরিক পরীক্ষা ও সামগ্রিক অবস্থার ভিত্তিতে একজন নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞের পরামর্শে নির্ধারণ করা সবচেয়ে নিরাপদ।
[লেখক: সহকারী অধ্যাপক,
নাক-কান-গলা বিভাগ,
সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ] হাসপাতাল]