পানিস্বল্পতা, হিট স্ট্রোকে সতর্কতা জরুরি

ডেস্ক রিপোর্ট
  ০৩ জুন ২০২৬, ১৩:৩৫


এখন গ্রীষ্মকাল। জ্যৈষ্ঠের তাপদাহে জনজীবন বিপর্যস্ত। এর সঙ্গে বাতাসে অস্বাভাবিক আর্দ্রতা পরিস্থিতিকে আরও অসহনীয় করে তুলেছে। বৃষ্টি না থাকায় গরমের তীব্রতা বাড়ছে। শিশু থেকে বৃদ্ধ– সব বয়সী মানুষই বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যগত সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছেন। কারও হচ্ছে পানিস্বল্পতা, কারও ঘামাচি বা অ্যালার্জি, আবার কেউ হিট স্ট্রোকের মতো প্রাণঘাতী অবস্থার মুখোমুখি হচ্ছেন।
পানিস্বল্পতা: গরমের সবচেয়ে সাধারণ সমস্যা
গরমে অতিরিক্ত ঘামের সঙ্গে শরীর থেকে পানি ও লবণ বের হয়ে যায়। ফলে রক্তচাপ কমে যেতে পারে; দুর্বলতা, মাথা ঘোরা ও ঝিমঝিম ভাব দেখা দেয়। শিশু, বয়স্ক, দীর্ঘদিনের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং রোদে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। গুরুতর ক্ষেত্রে অচেতন হয়ে যাওয়া কিংবা কিডনি বিকল হওয়ার মতো জটিলতাও দেখা দিতে পারে।
তাপদাহের প্রভাব পড়ে পুরো শরীরে
অতিরিক্ত গরমে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ঠিকমতো কাজ করে না। তখন ক্লান্তি, অবসাদ, মাথাব্যথা, ঘুমের সমস্যা ও কাজের প্রতি অনীহা তৈরি হয়। শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়ালে হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি তৈরি হয়। গরমে অতিরিক্ত ঘাম জমে ত্বকে ঘামাচি ও অ্যালার্জি দেখা দিতে পারে। অনেক সময় ঘাম ও ময়লা জমে সংক্রমণও হয়। এ ছাড়া সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির কারণে ত্বক পুড়ে যেতে পারে, যাকে সানবার্ন বলা হয়। এতে ত্বক লাল হয়ে যায়, জ্বালাপোড়া ও চুলকানি হয়, এমনকি ফোসকাও পড়তে পারে।
হিট স্ট্রোক: সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থা
হিট স্ট্রোক গরমজনিত সবচেয়ে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি। এর আগে সাধারণত হিট ক্র্যাম্প ও হিট এক্সজশ্চেনের লক্ষণ দেখা দেয়। রোগীর প্রচণ্ড তৃষ্ণা, দুর্বলতা, মাথাব্যথা, দ্রুত শ্বাসপ্রশ্বাস ও অসংলগ্ন আচরণ দেখা দিতে পারে। হিট স্ট্রোক হলে শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে যায়, ঘাম বন্ধ হয়ে যায়, ত্বক শুষ্ক ও লাল হয়ে পড়ে। রোগী খিঁচুনিতে আক্রান্ত হতে পারেন, অচেতন হয়ে যেতে পারেন, এমনকি শকের মধ্যেও চলে যেতে পারেন। এ অবস্থায় দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া জরুরি।
আর্দ্রতাও বাড়ায় বিপদ
শুধু তাপমাত্রা নয়, অতিরিক্ত আর্দ্রতাও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। আর্দ্রতা বেশি থাকলে ঘাম সহজে শুকাতে পারে না। ফলে শরীর ঠান্ডা হওয়ার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয় এবং অস্বস্তি ও শারীরিক জটিলতা বাড়ে।
খাদ্যে অসতর্কতায় ডায়রিয়া-বমি
গরমে তৃষ্ণা মেটাতে অনেকেই রাস্তার শরবত বা অবিশুদ্ধ পানি পান করেন। এতে ডায়রিয়া, বমি, টাইফয়েড, আমাশয়, জন্ডিসসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগ হতে পারে। এ সময় খাবার দ্রুত নষ্ট হয়। তাই বাসি বা অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব
তীব্র গরমে অনেকের মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। মাথা ঘোরা, চোখে ঝাপসা দেখা, অস্থিরতা ও মানসিক চাপও বাড়তে পারে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে এসব সমস্যা আরও তীব্র হয়।
কারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে
তাপদাহে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকেন শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তি, অন্তঃসত্ত্বা নারী, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কিডনি, লিভার, হৃদরোগ বা ক্যান্সারে আক্রান্ত ব্যক্তি, প্রতিবন্ধী ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম এমন মানুষ কৃষক, শ্রমিক, রিকশাচালক ও নির্মাণশ্রমিক, খেলোয়াড় ও গৃহহীন মানুষ।
গরমে সুস্থ থাকতে যা করবেন
প্রয়োজন ছাড়া বাইরে যাওয়া এড়িয়ে চলুন। রোদে বের হলে ছাতা, টুপি বা মাথায় কাপড় ব্যবহার করুন। হালকা, ঢিলেঢালা ও সুতি কাপড় পরুন। পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি পান করুন। প্রয়োজন হলে খাবার স্যালাইন বা লবণযুক্ত পানীয় পান করুন। চা ও কফি কম পান করুন। নিয়মিত গোসল করুন এবং শরীর পরিষ্কার রাখুন। অতিরিক্ত পরিশ্রম এড়িয়ে চলুন। টাটকা ও সহজপাচ্য খাবার খান।
মৌসুমি ফল ও লেবুর শরবত পান করুন। শিশু ও বয়স্কদের বিশেষ যত্ন নিন। দৈনিক সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুমান। 
কেউ অসুস্থ হলে কী করবেন
দ্রুত ছায়াযুক্ত বা শীতল স্থানে নিয়ে যান। ফ্যান বা এসির ব্যবস্থা করুন। টাইট ও ভারী কাপড় খুলে দিন। ভেজা কাপড় দিয়ে শরীর মুছে দিন। পানি, ডাবের পানি বা খাবার স্যালাইন পান করান। হিট স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিন।
প্রচণ্ড গরমকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। সামান্য অসতর্কতাও বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই নিজের ও পরিবারের সুরক্ষায় এখনই প্রয়োজন সচেতনতা, পর্যাপ্ত পানি পান এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা।
লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক