
সিমোনা মুসু এবং ডিন শিপার্স যখন গত ২২ ফেব্রুয়ারি মালদ্বীপের মালে-ভেলানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পা রেখেছিলেন, তখন তাদের চোখেমুখে ছিল কেবলই নবদম্পতির উচ্ছ্বাস। দক্ষিণ আফ্রিকান বংশোদ্ভূত এই দম্পতি, যারা বর্তমানে নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামে বসবাস করেন, সমুদ্রের পাড়ে এক নিভৃত ও জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিয়ের আজীবন বন্ধনে আবদ্ধ হতে দ্বীপরাষ্ট্রে এসেছিলেন। কিন্তু তাদের সেই স্বপ্নের মতো সুন্দর মুহূর্তগুলো খুব দ্রুতই একটি দীর্ঘস্থায়ী দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানকে লক্ষ্য করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আকস্মিক হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা সংকুচিত হয়ে পড়লে বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার ফ্লাইট বাতিল করা হয়, যার কবলে পড়েন এই দম্পতিও।
বিলাসবহুল রিসোর্টে কাটানো একটি জাদুকরি সপ্তাহ শেষে যখন তাদের আমস্টারডামে ফেরার কথা, তখন বিমানবন্দর থেকে জানানো হয় তাদের ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এরপর শুরু হয় এক চরম অনিশ্চয়তার জীবন। গত দুই সপ্তাহে অন্তত পাঁচবার তাদের টিকিট নিশ্চিত হয়েও বাতিল হয়েছে।
আমস্টারডামে যেখানে বন্ধু-বান্ধব ও স্বজনরা তাদের বরণ করে নিতে অপেক্ষায় ছিলেন, সেখানে এই দম্পতিকে মালদ্বীপের মালে বিমানবন্দরে অসহায়ের মতো বসে থাকতে হয়েছে। পাঁচ তারকা রিসোর্টের বিলাসিতা ছেড়ে তাদের আশ্রয় নিতে হয়েছে মাফুশি দ্বীপের সাধারণ মানের হোটেলে, যার একটি ছিল জানালাবিহীন অন্ধকার এক কুঠুরির মতো। সিমোনার মতে, সেই ঘরটি ছিল অনেকটা কারাগারের মতো দমবন্ধকর।
মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিরতায় এভিয়েশন খাতের ওপর নেমে আসা প্রভাবকে কোভিড-১৯ পরবর্তী সবচেয়ে বড় সংকট হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তথ্য অনুযায়ী, গত ১৩ মার্চ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৫২ হাজার ফ্লাইট বাতিল হয়েছে, যার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ৬০ লাখ যাত্রী। বিশেষ করে কাতার এয়ারওয়েজের মতো বড় বিমান সংস্থাগুলো সবচেয়ে বেশি বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। মুসু এবং শিপার্সও এই সংকটের সরাসরি শিকার। তাদের বাড়তি থাকা-খাওয়া ও নতুন টিকিটের জন্য প্রায় সাত হাজার ডলারের মতো অতিরিক্ত ব্যয় করতে হয়েছে, যার কোনো পূর্বপ্রস্তুতি তাদের ছিল না।
অচেনা দেশে আটকা পড়লেও পেশাগত দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত হননি এই দম্পতি। ডিন শিপার্স তার ল্যাপটপ সঙ্গে থাকায় একটি বিমা প্রতিষ্ঠানের ফিন্যান্স বিভাগের কাজ চালিয়ে গেছেন, অন্যদিকে সিমোনা তার স্কুলের শিক্ষার্থীদের কাছে ফেরার জন্য ব্যাকুল হয়ে আছেন। মালদ্বীপে অবস্থানরত অন্যান্য ইউরোপীয় পর্যটকদের সঙ্গে নিয়ে তারা একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ তৈরি করেছেন, যেখানে একে অপরকে যাতায়াতের খবর ও মানসিক সাহস জোগাচ্ছেন।
সিমোনা রসিকতা করে বলেন, দীর্ঘ সময় রোদে থাকায় তার ত্বক তামাটে বর্ণ ধারণ করেছে ঠিকই, কিন্তু মানুষ একে যতটা আনন্দদায়ক মনে করছে, বাস্তবতা তার উল্টো। এটি ছিল এক চরম উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তার সংগ্রাম।
অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর একপ্রকার ভাগ্যের জোরেই তারা সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা ‘সাউদিয়া’তে দুটি টিকিট সংগ্রহ করতে সক্ষম হন। জেদ্দায় ১৩ ঘণ্টার যাত্রাবিরতিসহ প্রায় ২৫ ঘণ্টার এক দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তাদের আমস্টারডামে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। যদিও মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা দিয়ে উড়ে যাওয়া নিয়ে তাদের মনে কিছুটা আতঙ্ক রয়েছে, তবু সিমোনার ভাষায়, ‘এই স্বর্গীয় কারাগার’ থেকে মুক্তি পেতে তারা যেকোনো ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত। এই কঠিন পরিস্থিতি তাদের সম্পর্কের বন্ধনকে আরও দৃঢ় করেছে এবং দক্ষিণ আফ্রিকান ‘উবুন্টু’ দর্শনের মতো একে অপরের পাশে থাকার শিক্ষা দিয়েছে। তারা এখন শুধু নিজেদের চেনা ঘরে ফেরার একটি সফল ফ্লাইটের অপেক্ষা করছেন।
সূত্র : সিএনএন