
বসন্ত মানেই কি কেবল শিমুল-পলাশের রক্তিম উৎসব? নাগরিক কোলাহল আর ইট-কাঠের জঙ্গল থেকে দৃষ্টি ফেরালে উত্তরের জনপদ ঠাকুরগাঁওয়ের দিগন্তজুড়ে এখন দেখা মিলবে এক ভিন্নতর শুভ্রতার।
অযত্ন আর অবহেলায় বেড়ে ওঠা বুনো ফুল ‘ভাট’ বা ‘বনজুঁই’ তার স্নিগ্ধ সাদা চাদরে ঢেকে দিয়েছে গ্রাম-বাংলার মেঠোপথ। প্রকৃতির এই বুনো সৌরভ আর মৌমাছির গুঞ্জনে জনপদে তৈরি হয়েছে এক মায়াবী পরিবেশ।
ঠাকুরগাঁওয়ের নারগুণ, জগন্নাথপুর থেকে উত্তর হরিহরপুর— জেলার ১ হাজার ১২টি গ্রামেই এখন ভাট ফুলের জয়জয়কার।
স্থানীয়দের কাছে যা ‘বনজুঁই’ নামেই সমধিক পরিচিত। পরিত্যক্ত মাঠ, পুরোনো ভিটে কিংবা মেঠোপথের ধারে থোঁকায় থোঁকায় ফুটে থাকা এই শুভ্র ফুল জানান দিচ্ছে— প্রকৃতি তার আপন খেয়ালে সেজেছে এক স্নিগ্ধ সাজে। দিনের আলোয় ডানা মেলা এই রূপ, রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ছড়িয়ে দেয় আরও তীব্র ও মায়াবী সুবাস।
সদর উপজেলার হরিহরপুর গ্রামের বাসিন্দা ইসমাইল হোসেন বলেন, বাড়ি থেকে বের হলেই মেঠোপথ। দুধারে ফুটে আছে ভাট ফুল। এই শুভ্রতা আর গন্ধে সত্যিই হৃদয় জুড়িয়ে যায়।
স্থানীয় স্কুলশিক্ষক রসূল মিঞা কবির ভাষায় আক্ষেপ করে বলেন, ‘তুমি যাবে ভাই যাবে মোর সাথে আমাদের ছোট গাঁয়’— কবির সেই আহ্বান যেন সার্থক করে তুলেছে এই অবহেলিত ফুলগুলো।
তবে এই সৌন্দর্যের মাঝেও প্রবীণদের কণ্ঠে শোনা গেছে আক্ষেপ। ৭৫ বছরের কৃষক ইসাহাক আলী স্মৃতিকাতর হয়ে বলেন, গ্রামে এক সময় স্বর্গ ছিল। আধুনিক নগরায়ণের দাপটে সেই স্বর্গ আমরা হারাতে বসেছি।
একই সুর শোনা গেল প্রকৃতিপ্রেমিক আবু মহিউদ্দিনের কণ্ঠেও। তিনি বলেন, আধুনিক সভ্যতার দাপটে গ্রামীণ সৌন্দর্যের আজ মৃত্যু ঘটছে।
সাঁওতাল সম্প্রদায়ের নীলিমা মুর্মু প্রকৃতির প্রতি এই অবহেলার কথা বলতে গিয়ে বিষণ্ণ হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, আমরা প্রকৃতির ওপর ভরসা করেই বেঁচে ছিলাম। শহর-নগর বেড়ে ওঠায় আমাদের অস্তিত্ব আজ সংকটে।
ভাট ফুল কেবল চোখের প্রশান্তিই নয়, জীববৈচিত্র্য রক্ষাতেও এর ভূমিকা অনন্য। এর মধু সংগ্রহে মৌমাছিদের অবিরাম আনাগোনা প্রকৃতিতে যোগ করে ভিন্ন মাত্রা। এছাড়া এই বুনো লতা-গুল্মের রয়েছে অসামান্য ঔষধিগুণ। চর্মরোগ থেকে শুরু করে বিষাক্ত পোকামাকড়ের কামড়ে এর পাতা ও মূল অব্যর্থ দাওয়াই হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
ঠাকুরগাঁও জেনারেল হাসপাতালের ভেষজ চিকিৎসক জিপি সাহা জানান, প্রাচীনকাল থেকেই চর্মরোগ, জ্বর, অ্যাজমা কিংবা পোকামাকড়ের কামড়ের চিকিৎসায় ভাট গাছ ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এটি অত্যন্ত কার্যকর একটি ভেষজ উদ্ভিদ।
অনাদর আর অবহেলায় বেড়ে ওঠা এই সাদা ফুলগুলো মনে করিয়ে দেয়, বাংলার প্রকৃতি আজও তার সবটুকু উজাড় করে সাজিয়ে রেখেছে নিজেকে। নাগরিক ব্যস্ততা ভুলে মেঠোপথের এ শুভ্রতা অবলোকন করতে গিয়ে পথিকের ক্লান্তি যেন নিমিষেই মিলিয়ে যায়।
তথ্যসূত্র:যুগান্তর