
একসময় তাঁর কণ্ঠে প্রেমের গান শুনে মুগ্ধ হয়েছে পুরো বিশ্ব। ‘মাই হার্ট উইল গো অন’, ‘দ্য পাওয়ার অব লাভ’, ‘বিকজ ইউ লাভড মি’ কিংবা ‘ইটস অল কামিং ব্যাক টু মি নাউ’– একের পর এক গান সেলিন ডিওনকে নিয়ে গেছে বিশ্বসংগীতের শীর্ষে। সেই সেলিন আবার ফিরছেন মঞ্চে। দীর্ঘ বিরতি, শারীরিক অসুস্থতা ও অনিশ্চয়তার সময় পেরিয়ে তাঁর এই প্রত্যাবর্তন যেন শুধু একজন শিল্পীর ফিরে আসা নয়, সংগীতের কাছে ফিরে আসার এক আবেগঘন গল্প।
১২ সেপ্টেম্বর প্যারিসের প্লেনিতিউড অ্যারেনায় শুরু হচ্ছে সেলিনের বহু প্রতীক্ষিত কনসার্ট ট্যুর। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে মোট ১৬টি অনুষ্ঠান করার কথা রয়েছে। এরপর ২০২৭ সালের মে মাসে আরও ১০টি কনসার্ট হবে। দীর্ঘ বিরতির পর এ আয়োজন ঘিরে দর্শকের আগ্রহও তুঙ্গে। ২০২০ সালের পর এটি তাঁর প্রথম পূর্ণাঙ্গ কনসার্ট সিরিজ।
এই প্রত্যাবর্তনের গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ ২০২২ সালে সেলিন জানিয়েছিলেন, তিনি ‘স্টিফ-পার্সন সিনড্রোম’ নামের বিরল স্নায়বিক সমস্যায় আক্রান্ত। এ রোগের কারণে পেশি শক্ত হয়ে যাওয়া এবং চলাফেরায় সমস্যা তৈরি হতে পারে। গান গাওয়ার ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়ে। অসুস্থতার কারণে তাঁর ‘কারেজ ওয়ার্ল্ড ট্যুর’-এর বাকি অংশ বাতিল করতে হয়। দীর্ঘ সময় মঞ্চের বাইরে থাকতে হয়েছে তাঁকে।
তবে থেমে থাকেননি সেলিন। ২০২৪ সালের প্যারিস অলিম্পিকের সমাপনী অনুষ্ঠানে ‘হিমন আ লামুর’ গান পরিবেশন করে তিনি আবারও বিশ্ববাসীকে মনে করিয়ে দেন। তাঁর কণ্ঠ এখনও আগের মতোই শক্তিশালী। সেই পরিবেশনা ছিল দীর্ঘ বিরতির পর তাঁর অন্যতম স্মরণীয় প্রত্যাবর্তন। এবার প্যারিসে পূর্ণাঙ্গ কনসার্টের মাধ্যমে সেই ফেরাটা আরও বড় পরিসরে হতে যাচ্ছে।
কানাডার কুইবেকে জন্ম নেওয়া সেলিনের সংগীতজীবনের শুরু খুব অল্প বয়সে। প্রথমে ফরাসি ভাষার গান দিয়ে পরিচিতি পান। পরে ইংরেজি গানে প্রবেশ করে হয়ে ওঠেন আন্তর্জাতিক তারকা। নব্বইয়ের দশকে ‘দ্য কালার অব মাই লাভ’, ‘ফলিং ইনটু ইউ’ ও ‘লেটস টক অ্যাবাউট লাভ’-এর মতো অ্যালবাম তাঁকে পৌঁছে দেয় বিশ্বসংগীতের শীর্ষে। এরপর আসে ‘টাইটানিক’। জেমস ক্যামেরনের বিখ্যাত চলচ্চিত্রের জন্য জেমস হর্নারের সুরে সেলিনের কণ্ঠে ‘মাই হার্ট উইল গো অন’ গানটি হয়ে ওঠে ইতিহাস। গানটি তাঁকে এনে দেয় গ্র্যামিসহ অসংখ্য পুরস্কার।
একই সঙ্গে তাঁর কণ্ঠ হয়ে ওঠে প্রেম ও বিরহের এক বৈশ্বিক প্রতীক। যে কণ্ঠের নিজস্ব জাদু সেলিনের জনপ্রিয়তার বড় কারণ– তাঁর কণ্ঠ। তবে শুধু কণ্ঠের ব্যাপ্তি নয়, একটি গানকে আবেগের চূড়ায় নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতাই তাঁকে আলাদা করেছে। তাঁর পরিবেশনায় কখনও কোমলতা, কখনও বিস্ফোরক শক্তি, আবার কখনও নিঃশব্দ বিরতিও হয়ে ওঠে গানের অংশ। ফরাসি ও ইংরেজি– দুই ভাষাতেই তাঁর সমান দক্ষতা তাঁকে দিয়েছে বৈশ্বিক শ্রোতা।
সময়ের সঙ্গে সংগীতের ধরন বদলেছে; নতুন প্রজন্মের অসংখ্য শিল্পী এসেছে কিন্তু সেলিনের গান এখনও শ্রোতার মনে জায়গা করে নেয়। বিশ্বজুড়ে তাঁর অ্যালবাম বিক্রির পরিমাণ ২৬ কোটিরও বেশি; যা তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ারের বিশাল জনপ্রিয়তার প্রমাণ।
সেলিনের ২০২৬ সালের প্রত্যাবর্তন তাই কেবল একটি কনসার্ট সিরিজ নয়। এটি একজন শিল্পীর প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে নিজের সবচেয়ে পরিচিত জায়গায় ফিরে আসার গল্প। দীর্ঘ বিরতির পর প্যারিসের মঞ্চে যখন আবার তাঁর কণ্ঠ ভেসে উঠবে, তখন সেটি একই সঙ্গে হবে স্মৃতি ও নতুন শুরুর মুহূর্ত।