ছাত্রদের আবাসিক হল এখন কর্মচারীদের ‘স্টাফ কোয়ার্টার’

ডেস্ক রিপোর্ট
  ০৯ মে ২০২৬, ১১:৫৬

দরজা-জানালায় পর্দা সাঁটানো, ভেতরে পরিপাটি সংসার। খাট, আলমারি, শোকেস– সবই আছে। কোথাও কায়দা করে তৈরি করা হয়েছে পাকশালা, সেখানে চলে রান্নার আয়োজন। পাশে আছে শৌচাগার! সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালে কলেজের ঝুঁকিপূর্ণ ও পরিত্যক্ত আবাসিক হলে এভাবেই চলছে বসবাস। যারা সেখানে থিতু হয়েছেন, তারা বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজের কর্মচারী। আরেকটি পরিত্যক্ত আবাসিক হলে বসে মাদকসেবীর আড্ডা। সেখানকার সব দরজা-জানালা উধাও। আগেই চুরি হয়েছে সরকারি মালপত্র। 
সরকারি আজিজুল হক কলেজের তিনটি আবাসিক হলের এমন হাল– তাও ১৭ বছর। কোটি কোটি টাকার সরকারি অবকাঠামো বছরের পর বছর অযত্নে নষ্ট হলেও দেখার, বলার কেউ নেই। এভাবেই আবাসন সংকটকে সঙ্গী করে লেখাপড়া টেনে নিয়ে যাচ্ছেন ৩০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী। উত্তরাঞ্চলের এই গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বগুড়া ছাড়াও গাইবান্ধা, জয়পুরহাট, নওগাঁ, নাটোর, সিরাজগঞ্জ, রংপুরসহ বিভিন্ন জেলা থেকে শিক্ষার্থী পড়তে আসেন। এদের বড় অংশই নিম্নবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। তাদের পক্ষে মেসে থেকে পড়াশোনার খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
২০০৯ সালের ২০ ডিসেম্বর ছাত্রলীগ ও ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষের পর শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক হল, আক্তার আলী মুন হল ও শহীদ তিতুমীর হল অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। সেই থেকে এ পর্যন্ত কলেজে ৯ জন অধ্যক্ষ বদল হয়েছেন। কিন্তু আবাসিক হল তিনটি খোলার সিদ্ধান্ত আর বাস্তবায়ন হয়নি।  
পরিত্যক্ত ভবনে কর্মচারীর বসবাস 
তিতুমীর হলে এখন তিনটি পরিবারের বাস। কলেজ মসজিদের মুয়াজ্জিন জাহিদুল ইসলাম ২০২১ সাল থেকে ছেলেমেয়েসহ পরিবারের চার সদস্য নিয়ে সেখানে আছেন। একই হলে কলেজের ইলেকট্রিশিয়ান আজাহারুল পরিবার নিয়ে থাকছেন। আরেক কক্ষে পরিবারসহ বাস করছেন কর্মচারী রশিদুজ্জামান রতন।  
অন্যদিকে, আক্তার আলী মুন হলেও বাস করছে আরও দুটি পরিবার। অধ্যক্ষের বাসার নৈশপ্রহরী হযরত আলী স্ত্রী-সন্তানসহ থাকছেন সেখানে। একই হলে অফিস সহকারী জাহাঙ্গীর আলমও স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বাস করছেন। বিস্ময়কর হলো, যেসব ভবনকে দীর্ঘদিন ধরে ‘শিক্ষার্থীদের জন্য অযোগ্য’ বলা হচ্ছে, সেখানেই চলছে কর্মচারীদের স্বাভাবিক জীবন। রান্না হচ্ছে, বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে, নিয়মিত শৌচাগার পরিষ্কারসহ দৈনন্দিন জীবনযাপন চলছে।
জানতে চাইলে ইলেকট্রিশিয়ান আজাহারুল বলেন, আমরা ওঠার আগেই কলেজ প্রশাসন সংস্কার করেছিল। থাকার মতো করেই রাখা হয়েছে। বিদ্যুৎ বিল কলেজ কর্তৃপক্ষই দেয়, থাকার ব্যবস্থা প্রশাসনের অনুমতিতেই হয়েছে। 
মুয়াজ্জিন জাহিদুল ইসলাম বলেন, আগে ফজলুল হক হলে মাদকসেবীদের আড্ডা হতো। অনেক মালপত্রও চুরি হয়েছে। এ কারণে কলেজ প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে আমি পরিবারসহ বাস করছি। এতে একদিকে ভবনটি দেখভাল হচ্ছে, আমাদেরও থাকা হচ্ছে।
কলেজ অধ্যক্ষ মো. মাহফুজুল ইসলাম জানান, বন্ধ থাকা হলগুলো চালু করতে সময় লাগবে। এগুলো বসবাস উপযোগী করতে বড় ধরনের সংস্কার ও সরকারি বরাদ্দ প্রয়োজন। ইতোমধ্যে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে সংস্কারের জন্য চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ মিললে কাজ শেষে আবাসিক হলগুলো চালু করা হবে। যে দুটি হলে কর্মচারীরা অবস্থান করছেন, তারা মূলত নিরাপত্তা ও পাহারার দায়িত্বে সেখানে থাকছেন। এ কারণে সেখানে তাদের থাকার খরচ কলেজ কর্তৃপক্ষ বহন করে। তাদের কাছ থেকে ভাড়া নেওয়া হয় না।
অধ্যক্ষের কাছে প্রশ্ন করা হয়– যদি ভবনগুলো সত্যিই বসবাসের অনুপযোগী হয়, তাহলে সেখানে কীভাবে বছরের পর বছর কর্মচারীরা পরিবার নিয়ে থাকছেন? আর যদি তা বসবাসযোগ্য হয়, তাহলে শিক্ষার্থীদের জন্য কেন তা খোলা হচ্ছে না– এ প্রশ্নে অধ্যক্ষের ভাষ্য, তিনি নতুন এসেছেন। আগে আরও অনেকে দায়িত্ব পালন করলেও কেন চালু করার উদ্যোগ নেননি, সেটি তিনি জানেন না।
ফজলুল হক হলে মাদকসেবীদের আড্ডা 
শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক হলের পরিস্থিতি সবচেয়ে নাজুক। ভবনটির বিভিন্ন কক্ষের দরজা-জানালা কিছুই নেই। দেয়ালের প্লাস্টার খসে পড়ছে, চারপাশজুড়ে আগাছা আর ঝোপঝাড়। সন্ধ্যার পর ভবন ঘিরে তৈরি হয় ভিন্ন এক পরিবেশ। স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই এলাকায় নিয়মিত মাদকসেবী ও বহিরাগতদের আড্ডা বসে। শিক্ষার্থীরা জানান, রাতে সেখানে যেতে পর্যন্ত ভয় লাগে। 
ইসলামের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান বিপুল বলেন, প্রথমে নাটোর থেকে যাতায়াত করতাম। পরে বুঝলাম এটা সম্ভব না। এখন মেসে থাকি। মাসে প্রায় সাত হাজার টাকা খরচ হয়। গাইবান্ধা থেকে আসা আরেক শিক্ষার্থী আবু তাহের বলেন, বাবা কৃষক। মেস ভাড়া দিতে গিয়ে পরিবারে চাপ পড়ে যায়। অনেক সময় টিউশনি করতে হয়। সাধারণ মানের একটি সিট ভাড়া দুই থেকে চার হাজার টাকা। খাবার, বিদ্যুৎ, ইন্টারনেটসহ মাসিক খরচ দাঁড়ায় সাত থেকে ১০ হাজার টাকায়। 
আরেক শিক্ষার্থী আব্দুল কাদের বলেন, মেসে থাকতে গিয়ে আমার বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে। হলগুলো বন্ধ থাকায় কলেজ-সংলগ্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে সারি সারি মেস। 
কয়েকজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কলেজ প্রশাসনের বড় উদ্বেগ অতীতের রাজনৈতিক সংঘর্ষের অভিজ্ঞতা। একসময় হলগুলো ছাত্র রাজনীতির কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। দখল, সংঘর্ষ ও সিট বাণিজ্যের কারণে প্রশাসন নতুন করে ঝুঁকি নিতে চায় না। কর্তৃপক্ষ মনে করে, হল খুললে আবার রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
বারবার সংস্কার, খোলেনি হলের তালা 
কলেজের হলগুলো নির্মাণের পর সংস্কার ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ সমন্বিত সরকারি হিসাব পাওয়া যায়নি। তবে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকল্প সংশ্লিষ্ট নথি, কলেজ প্রশাসনের একাধিক দাপ্তরিক তথ্য, পুরোনো উন্নয়ন বরাদ্দ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে একটি আর্থিক চিত্র পাওয়া গেছে। সেই হিসেবে নব্বই দশকের শেষভাগ থেকে ২০০০ সালের শুরুর দিকে সরকারি শিক্ষা অবকাঠামো সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় হলগুলো নির্মাণ করা হয়। সেই সময় তিনটি হল নির্মাণে সম্মিলিতভাবে আট থেকে ১০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি করেছে। 
২০০৯ সালে ছাত্র রাজনীতি ও সহিংসতাজনিত অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে হলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর দীর্ঘ সময় সেগুলো অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকে। এরপর কয়েক দফায় সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা ছিল খণ্ডিত ও সীমিত পরিসরে। 
তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, ২০১৬ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর ও কলেজের নিজস্ব তহবিল থেকে ধাপে ধাপে কয়েক কোটি টাকার সংস্কার কাজ দেখানো হয়। কিন্তু সংস্কার শেষে হলগুলো শিক্ষার্থীদের জন্য খুলে দেওয়ার কার্যকর প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। ফলে সংস্কার ব্যয়ের পরও ছাত্রাবাসগুলো বছরের পর বছর তালাবদ্ধই পড়ে থাকে।