স্বাধীনতার অনল জ্বালানো বঙ্গবন্ধুর সেই ৭ মার্চের ভাষণ

খায়ের মাহমুদ
  ০৭ মার্চ ২০২৬, ১২:৪৪

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চ ১৯৭১-এর ভাষণ বাঙালি জাতির স্বাধীনতা-অভিযাত্রার সবচেয়ে কেন্দ্রীয় এবং শক্তিশালী দলিল— যার রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ভাষাতাত্ত্বিক মাত্রা একসঙ্গে বিবেচনা করলে স্পষ্ট করেই বলা যায়, এটি নিছক রাজনৈতিক প্রতিবাদের বক্তব্য ছিল না, বরং রাষ্ট্রগঠনের এক মৌলিক নৈতিক রূপরেখা ছিল। দুইশ বছরের ঔপনিবেশিক শোষণ, পাকিস্তানি শাসনামলের সীমাহীন বৈষম্য এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচন-পরবর্তী ক্ষমতা হস্তান্তর সংকট যখন পূর্ব বাংলাকে বিস্ফোরক পরিস্থিতিতে পৌঁছে দিয়েছিল, তখন রমনা রেসকোর্স ময়দানের সেদিনের সেই জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু একদিকে শান্তিপূর্ণ অসহযোগ আন্দোলনের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছিলেন এবং অপরদিকে সামনে আসন্ন সশস্ত্র দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে জাতিকে সংগঠিত হতে সতর্কও করে ছিলেন। ১৯৭১ সালের মার্চের প্রথম সপ্তাহে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করে, যা ছিল কার্যত গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ এবং এই সিদ্ধান্ত পূর্ব বাংলার জনগণের ক্ষোভকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যায়। এই প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ছিল সময়-সংবেদী। তিনি জানতেন অতিরিক্ত উত্তেজনা জনগণকে তাৎক্ষণিক সংঘাতে ঠেলে দিতে পারে, আবার অত্যধিক নরম ভাষা জাতীয় মনোবলকে দুর্বলও করতে পারে। তাঁর ভাষণ সেই সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রেখেছিল, যেখানে তিনি বলেন, “ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো,” এটি প্রতিরোধের এক গভীর রাজনৈতিক রূপক, যা অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের মধ্য দিয়েও সঙ্ঘবদ্ধ প্রতিরোধের সংকেত দিয়েছিল।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চের পর মার্কিন টাইম ম্যাগাজিনের এক সংখ্যায় বঙ্গবন্ধুর, আর সেদিনের লাখ লাখ মানুষের একটা ছবি দিয়ে লিখেছিল ‘ফ্রম হিরো টু মার্টায়ার’, বীর থেকে শহীদ।’ পাকিস্তানি ও মার্কিনিরা তখন নিশ্চিত ছিল— যে সাহস বঙ্গবন্ধু মুজিব দেখিয়েছেন, তার একমাত্র নিশ্চিত পরিণতি ছিল মৃত্যু। তাদের সে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়নি, করতে পারেনি। এদেশের আপামর মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে বীরের বেশে ফিরেছিলেন তিনি। স্বাধীনতা যেমন একদিনে অর্জিত হয়নি, তেমনই স্বাধীনতা সংগ্রামের এ পথ কখনোই মসৃণ ছিল না। পৃথিবীর ইতিহাসে যতগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ আছে, এর মধ্যে অন্যতম একটি হলো ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে দেওয়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণ। ৭ মার্চের বক্তব্যের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্য আমাদের অনুপ্রেরণা দেয়, অনুরণিত করে।
বক্তৃতাটিকে যদি ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণে দেখা হয়, তবে এর রেটরিক্যাল নির্মাণ অসাধারণ। বিগত সময় বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, ভাষণের প্রতিটি অংশে ইথোস, পেইথোস ও লোগোস বাগ্মিতা— এই তিন কৌশল অত্যন্ত পরিশীলিতভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু তাঁর বৈধ নেতৃত্বের পরিচয় (ইথোস) সামনে রেখে জনগণের সঙ্গে এমনভাবে কথা বলেছিলেন, যেন তারা তাঁর দীর্ঘদিনের সহযোদ্ধা। এর ফলে ভাষণটি কোনও শাসকের নির্দেশ নয়, বরং এক ঐতিহাসিক মুহূর্তে জনগণের অনুভূতির প্রতিধ্বনি হয়ে ওঠেছিল। আবেগ-উদ্দীপনা (পেইথোস) ভাষণের প্রতিটি উচ্চারণেই ছিল স্পষ্ট, তিনি বারবার জনগণের স্মৃতিতে পাকিস্তানি সামরিক শাসনের অন্যায় এবং শাসকের নিষ্ঠুরতা তুলে ধরেছিলেন, যা লাখ লাখ মুক্তিকামী বাঙালির  রাগ, ক্ষোভ এবং জাতীয় মর্যাদাবোধ জাগিয়ে তুলেছিল। যৌক্তিকতার (লোগোস ) দিক থেকেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত স্পষ্ট। তিনি আন্দোলনের পর্যায়গুলো ব্যাখ্যা করেন— কেন অসহযোগ চলবে, কেন প্রস্তুত থাকতে হবে, কেন সংযম দরকার, সবই ধারাবাহিকভাবে যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করেন। আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানীরা তাই ৭ মার্চের ভাষণকে বাংলা ভাষার রাজনৈতিক বক্তৃতার সর্বোচ্চ নিদর্শনগুলোর একটি হিসেবে দেখেন। এর গঠনশৈলী, পুনরুক্তি, রিদম এবং কথ্যভাষার বলিষ্ঠতা মিলে ভাষণটি ছিল সাধারণ জনতার জন্য সহজবোদ্ধ এবং একইসঙ্গে রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত কার্যকর।
ভাষণটির রাজনৈতিক প্রভাব ছিল তাৎক্ষণিক। এটি ছিল স্বাধীনতার অনানুষ্ঠানিক ঘোষণা, যেখানে তিনি সরাসরি উচ্চারণ করেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” এই ঘোষণার পর সারা বাংলায় প্রতিরোধের মন্ত্র ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। পাকিস্তানি বাহিনীর ‘অপারেশন সার্চলাইট’ (২৫-২৬ মার্চ ১৯৭১) শুরু হওয়ার পর পিছিয়ে না গিয়ে দেশবাসী লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হয়। এটি ছিল ভাষণের সরাসরি মানসিক ও সাংগঠনিক প্রভাব। গবেষণা-ডকুমেন্টেশন দেখায় যে, এই ভাষণ লক্ষ-কোটি মানুষের মনে একে অপরের প্রতি দায়বদ্ধতা, দেশের প্রতি নৈতিক দায়িত্ববোধ ও আত্মত্যাগের প্রস্তুতি গড়ে তোলে, যার ফলেই মুক্তিযুদ্ধের সামষ্টিক চরিত্র হয়েছিল অত্যন্ত দৃঢ়। ৭ মার্চের ভাষণকে তাই সামরিক নয়, বরং নৈতিকতা ও দেশপ্রেমের মহান ব্রত নিয়ে  জাতীয় প্রতিরোধের ভিত্তিপত্র বলা যায়।
আমি মনে করি, এই ভাষণটির গুরুত্ব শুধুই রাজনৈতিক ঘটনার উদ্দীপক হিসেবে নয়, এটি দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং প্রজন্মান্তর রাজনৈতিক সমাজীকরণেও গভীর প্রভাব রেখেছে। সাম্প্রতিক সমাজতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা যায়, ৭ মার্চের ভাষণ বাঙালি জাতির সমষ্টিগত অভ্যাস প্রবণতার অংশ হয়ে গেছে। একইসঙ্গে এটি একটি সাংস্কৃতিক পুঁজি  হিসেবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সঞ্চারিত হচ্ছে— শিক্ষায়, কবিতায়, গানে, নাটকে, চলচ্চিত্রে, এমনকি আমাদের দৈনন্দিন কথোপকথনের ভেতরেও এর রেশ লক্ষ্য করা যায়। বুর্দিয়ুর সমাজতাত্ত্বিক তত্ত্বে যে সিম্বলিক পাওয়ারের কথা বলা হয়েছে, জাতির পরিচয় ও স্মৃতি কে বা কীভাবে নির্ধারণ করবে, নিঃসন্দেহে এই ভাষণ সেখানে এক দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবক।
তবে অত্যন্ত দুঃখের ও লজ্জার বিষয় হচ্ছে— ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের  নেতৃত্বাধীন  অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম আলোচিত ও নিন্দনীয় পদক্ষেপ ছিল পাঠ্যপুস্তক থেকে এই ঐতিহাসিক দলিল বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত। ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের জন্য পাঠ্যপুস্তক সংশোধনের প্রক্রিয়ায় সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণি এবং উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের বাংলা ও ইংরেজি বই থেকে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বা সংশ্লিষ্ট অধ্যায়গুলো আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে বাদ দেওয়া হয় এবং তার স্থানে ২০২৪ সালের ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের পাঠ সংযোজন করা হয়। অনেক বইয়ে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি ও ‘জাতির পিতা’ উল্লেখ অপসারণ করা হয়। কিছু ইতিহাস অধ্যায়ে স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কিত অংশে জিয়াউর রহমানের ভূমিকাকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে। রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যদি কোনও দেশের ইতিহাস পাল্টায় তার থেকে দুঃখের-লজ্জার আর কিছু আছে বলে আমার মনে হয় না। বঙ্গবন্ধুকে এই নতুন রাজনৈতিক স্মৃতি গঠনের প্রয়াস থেকে দূরে রাখা আমাদের সবার কর্তব্য! এই পরিবর্তন প্রজন্মান্তরের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কেননা, স্কুলপাঠই একটি জাতির রাষ্ট্র অনুমোদিত স্মৃতির প্রধান উৎস। ইতিহাসের পাঠ যদি ক্ষমতার পালাবদল অনুসারে বদলে যেতে থাকে, তাহলে শিক্ষার্থীদের মনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। কোন তথ্য সত্য, কোনটি বিকল্প বয়ান, কোনটি রাজনৈতিক ব্যাখ্যা, তা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ৭ মার্চের ভাষণের মতো একটি ঐতিহাসিক দলিল, যা ইউনেস্কো স্বীকৃত এবং আন্তর্জাতিক গবেষণায় মূল্যায়িত, সেটিকে পাঠ্যপুস্তক থেকে সরানো বা প্রান্তে সরিয়ে রাখা মানে বাঙালি জাতির সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক স্মৃতিকে কাঠামোগতভাবে পুনর্গঠন করা।
একটি জাতির মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক জন্ম কাহিনি যদি পাঠ্যক্রমে ক্ষীণ হয়ে যায়, তাহলে সেই জাতির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক চেতনাও দুর্বল হয়। ইতিহাস তখন হয়ে ওঠে ক্ষমতার প্রতিযোগিতার মঞ্চ। যেখানে দলিলভিত্তিক সত্য নয়, বরং রাজনৈতিক সুবিধাবাদের নিরিখে বয়ান তৈরি হয়। বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে রাষ্ট্রগঠনের মূলভিত্তিই মুক্তিযুদ্ধ, সেখানে ৭ মার্চের ভাষণকে পাঠ্যপুস্তক থেকে সরানো বা দুর্বল করা মানে জাতীয় ঐতিহাসিক চেতনাকে অস্থিতিশীল করা।
পরিশেষে শুধু এতটুকুই বলবো, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণটি শুধু একটি রাজনৈতিক বক্তৃতা ছিল না— এটি আমাদের বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়ের কেন্দ্র। বিশ্বের ইতিহাসে এমন ভাষণ বিরল, যা উভয় প্রান্তে, একদিকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, অপরদিকে জনতার গভীর আবেগ সমানভাবে ধারণ করে। এই ভাষণ মুক্তিযুদ্ধের নৈতিক চুক্তিপত্র, যেখানে নাগরিকেরা ইতিহাসের কঠিন সময়ে একত্র হয়েছিল। এটিকে পাঠ্যক্রম থেকে সরানো বা বিবর্ণ করা, যে যুক্তিই দেওয়া হোক না কেন, জাতির স্মৃতি-পরম্পরার বিরুদ্ধে যায়। রাষ্ট্র, সরকার এবং ক্ষমতার পালাবদল সাময়িক। কিন্তু জাতির ইতিহাস, বিশেষত স্বাধীনতার ভিত্তিপত্র, তা স্থায়ী এবং বহুপক্ষীয় সত্য। তিনি যে সংগ্রামের ডাক দিয়েছিলেন, তা কেবল বাহ্যিক রাজনৈতিক মুক্তি নয়, এটি ছিল জাতির সম্মিলিত সত্তার মুক্তি। সেই কারণে ৭ মার্চের ভাষণকে পাঠ্যক্রমে শক্ত অবস্থানে রাখা শুধু শিক্ষাগত দায়িত্ব নয়, বরং রাষ্ট্রনৈতিক কর্তব্য।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন