একটি সেমিনার এবং ‘রাওয়া রিসার্চ অ্যান্ড স্টাডি ফোরাম’-এর নতুন পথচলা

 মো. বায়েজিদ সরোয়ার
ডেস্ক রিপোর্ট
  ০৩ মার্চ ২০২৬, ১৯:৪৬


সারা দেশে চলছিল নির্বাচনী প্রচারণার তুমুল ডামাডোল। বহুদিন পর জনগণের মাঝে একটি সুন্দর নির্বাচনের স্বপ্নময়তা ও ঐক্যের আবহ। এরই মধ্যে গত ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ তারিখে শীতের এক শান্ত সকালে মহাখালীস্থ রাওয়া (রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন) হেলমেট হলে ‘রাওয়া রিসার্চ অ্যান্ড স্টাডি ফোরাম’ (আরআরএসএফ)-এর উদ্যোগে “নির্বাচন ২০২৬- জাতীয় ঐক্য ও প্রত্যাশা” শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। রাওয়া ভাইস চেয়ারম্যান এয়ার কমোডর শাহে আলম (অব.)-এর সূচনা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়।
তিনি বলেন, ‘আমরা আজ আরআরএসএফ-এর মাধ্যমে জাতির সামনে কিছু বক্তব্য তুলে ধরতে চাই। আমরা যেন রাওয়ার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের ভিতরে কাজ করি, দেশের সব মানুষের সঙ্গে এক কাতারে দাঁড়িয়ে সবার মনোভাব নাগরিক হিসেবে ব্যক্ত করতে পারি।’
অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনী কর্মকর্তাদের ‘সেকেন্ড হোম’ বলে পরিচিত রাওয়া ১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। রাওয়া নিজেদের ক্লাসিক কল্যাণমূলক কার্যক্রমের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও গবেষণামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে।
এই বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যক্রম পরিচালনার ধারাবাহিকতায়, ২০১৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তারিখে রাওয়ার থিংট্যাংক বা গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে আরআরএসএফ গঠিত হয়। ২০২৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি তারিখে এই সেমিনারের মধ্য দিয়ে এই থিংট্যাংকটি সাংগঠনিক ও নেতৃত্বের নতুন আঙ্গিকে যাত্রা শুরু করল। এই লেখায় সেমিনারে আলোচিত মূল বিষয়গুলো উপস্থাপন করছি।

অনুষ্ঠানটি শুরুর আগে সুসজ্জিত ও আলোকিত রাওয়ার হেলমেট হলে বেজে চলছিল দেশাত্মবোধক গান। সেই সুরের মূর্ছনা মোহিত করে উপস্থিত শ্রোতামণ্ডলীকে। সেমিনারের মূল অংশ শুরুর আগে আরআরএসএফ-এর কিছু আনুষ্ঠানিকতা পরিচালিত হয়।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা থিংকট্যাংক হচ্ছে একটি প্রতিষ্ঠান, যারা সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক, তথ্যপ্রযুক্তি, সংস্কৃতির মতো বিষয়ে গবেষণা করে নীতিনির্ধারণ-বিষয়ক সিদ্ধান্ত নিয়ে পরামর্শ দিয়ে থাকে। ২০২৪ সালের এক হিসাব মতে বাংলাদেশে থিংকট্যাংকের সংখ্যা ৪৬টি।
এই অনুষ্ঠানের শুরুতে থিংকট্যাংক হিসেবে আরআরএসএফ-এর নতুন পথচলার কথা উচ্চারিত হয়।

আরআরএসএফ গঠনের প্রেক্ষাপট ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা
অনুষ্ঠানের সভাপতি ছিলেন আরআরএসএফ-এর বর্তমান আহ্বায়ক বা কনভেনার কর্নেল হারুন-অর-রশীদ খান (অব.)। এই মেধাবী ও কৃতি সেনাকর্মকর্তা ‘সিনিয়র সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার’ ও ‘ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট স্পেশালিস্ট’ হিসেবে দীর্ঘ প্রায় ২ যুগ জাতিসংঘে কাজ করার অনন্য অভিজ্ঞতার অধিকারী। অনুষ্ঠানের শুরুতে কর্নেল হারুন-অর-রশীদ খান আরআরএসএফ গঠনের প্রেক্ষাপট এবং উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।
এরপর তিনি আরআরএসএফ-এর অন্যান্য সদস্যদের মঞ্চে ডেকে পরিচয় করিয়ে দেন। তখন মঞ্চে আসেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোহাম্মদ কামরুজ্জামান (অব.), মেজর জেনারেল আবু নাসের মো. ইলিয়াস (অব.), ক্যাপ্টেন সৈয়দ সাইদুল ইসলাম খান (অব.), লে. কর্নেল শাহাদাত হোসেন (অব.) ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. বায়েজিদ সরোয়ার (অব.)।
অনুষ্ঠানের সভাপতি কর্নেল হারুন আরআরএসএফ গঠনের প্রেক্ষাপট উল্লেখ করে বলেন, ‘আজ আমরা বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং কৌশলগত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। জুলাই অভ্যুত্থানের ঘটনাপ্রবাহ আমাদের জাতীয় প্রেক্ষাপটকে নতুন করে বিন্যস্ত করেছে। ২০২৬ সালের নির্বাচন ও তৎপরবর্তী সময়ের দিকে তাকালে, যেসব প্রশ্ন উঠে আসে তা কেবল রাজনীতি নয়। বরং তা আমাদের অস্তিত্ব, সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো টিকে থাকার প্রশ্ন।’
ঢাকায় এত পলিসি ইনস্টিটিউট থাকার পরেও নতুন থিঙ্কট্যাংকের প্রয়োজনীয়তা কী? এর উত্তরে কর্নেল হারুন বলেন, ‘বাংলাদেশে একাডেমিক তত্ত্ব বা থিওরির অভাব নেই। আমাদের অনেক মেধাবী অর্থনীতিবিদ এবং অভিজ্ঞ কূটনীতিবিদ আছেন, যারা কাগজে-কলমে আমাদের সমস্যা চিহ্নিত করতে সক্ষম। তবে আমরা মনে করি এই দেশের অভাব রয়েছে ‘অপারেশনাল রিয়ালিজম’ বা ‘বাস্তবমুখী প্রয়োগিক অভিজ্ঞতা।’ আজকের বাংলাদেশে এই মুহূর্তে বিমূর্ত তত্ত্বের পরিবর্তে প্রয়োজন এমন সব বাস্তব কৌশল, যা সংকটময় মুহূর্তে কাজে লাগবে। তাই ঠিক এই কারণে আরআরএসএফ শুধু একটি থিঙ্কট্যাংক নয়। এটি সময়ের অপরিহার্য দাবি।’

আরআরএসএফ এর প্রাসঙ্গিকতার ভিত্তি
আরআরএসএফ-এর প্রাসঙ্গিকতার ভিত্তি ও শক্তি উল্লেখ করে কর্নেল হারুন বলেন, ‘আমাদের প্রাসঙ্গিকতার ভিত্তি হচ্ছে আমাদের অভিজ্ঞতা। এই ফোরামের সদস্যরা কেবল জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে পড়াশোনা করেননি। আমরা জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছি। আমরা শুধু সংকট ব্যবস্থাপনা নিয়ে বই পড়িনি, আমরা সংকট মোকাবেলা করেছি—সেটা পার্বত্য চট্টগ্রামে হোক, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে হোক, দুর্যোগ মোকাবেলায় হোক বা মাতৃভূমির প্রতিরক্ষায়। আমাদের গবেষক তারাই, যারা যুদ্ধের ময়দানে লজিস্টিকস সামলেছেন, সৈন্য কমান্ড করেছেন ও সংঘাতময় এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছেন। তারা যুদ্ধের ভয়াবহতা ও শান্তির জটিলতা—এ দুটোই খুব কাছ থেকে দেখেছেন ও বুঝেছেন।
 
অভিজ্ঞতালব্ধ দৃষ্টিভঙ্গি 
কর্নেল হারুন আরো বলেন, ‘আরআরএসএফ যখন জাতীয় ঐক্যের কথা বলে, তখন তা এমন একজন সামরিক অফিসারের মুখ থেকে বের হয়ে-যিনি এক পতাকার নিচে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলকে একিভূত করে নেতৃত্ব দিয়েছেন। আমরা যখন নিরাপত্তার কথা বলি, তখন তা জল্পনা কল্পনা নয়। তা পতাকা ও সংবিধান রক্ষা করার কয়েক দশকের অভিজ্ঞতার নিদর্শণ। এই ‘প্রাকটিশনারস পারসপেকটিভ’ বা ‘অভিজ্ঞতালদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি’ আমাদের অনন্য শক্তি। আমরা সিভিল গভারর্নেসের বাস্তবতার সঙ্গে সামরিক শৃংখলার চিন্তা ধারার যুক্ত করি।”
রাওয়ার সদস্যদের অভিজ্ঞতা ও বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের বিষয়ে তিনি আরো বলেন, ‘রাওয়ার সদস্যদের বিশাল অভিজ্ঞতা ও মেধা এই জাতির সম্পদ। জাতির এই ক্রান্তি লগ্নে আমরা নিয়ে আসব সুচিন্তিত মতামত ও সমাধান।’

আরআরএসএফ এর ৪টি লক্ষ্য  
কর্নেল হারুন-অর-রশীদ খান আরআরএসএফের ৪টি লক্ষ্যের কথা উল্লেখ করেন। সেগুলি হলো— জাতিয় নিরাপত্তাকে রাজনীতির উর্দ্ধে রাখা, সামরিক-বেসামরিক সেতুবন্ধন গড়া, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দিক নির্দেশনা ও আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিত্ব। এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, ‘জাতিয় নিরাপত্তাকে রাজনীতির উর্ধ্বে রাখতে হবে। আমরা নিরপেক্ষ ও নির্মোহ বিশ্লেষণ প্রদান করবো। আমাদের আনুগত্য কোন দল বা ইশতেহারের প্রতি নয়। আমাদের আনুগত্য সংবিধান ও রাষ্ট্রের প্রতি।
আরআরএসএফ সামরিক-বেসামরিক ক্ষেত্রের সেতু বন্ধন হিসেবে কাজ করবে। আমরা সামরিক ও বেসামরিক ক্ষেত্রের মধ্যে ‘বুদ্ধিবৃত্তিক সেতু’ হিসেবে কাজ করতে চাই। আমরা সামরিক প্রয়োজনগুলো তুলে ধরবো সাধারণ মানুষের কাছে। একইভাবে গণতান্ত্রিক প্রত্যাশাগুলো প্রতিরক্ষা খাতের কাছে তুলো ধরব।’ 
সভাপতি আরআরএসএফ এর অন্যান্য লক্ষ্য সম্পর্কে বলেন, ‘আরআরএসএফ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দিক নির্দেশনা দেবে। আমরা জেনজিদের শক্তি ও উদ্দীপনা দেখেছি। তাদের রয়েছে আবেগ। আমাদের রয়েছে অভিজ্ঞতা। তারুন্যের শক্তি ও আমাদের কৌশলগত ধৈর্য সংমিশ্রণ ঘটিয়ে একটি টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ব। কর্নেল হারুন ‘আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিত্ব’ সম্পর্কে বলেন- ‘আমরা বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশ ও জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থকে সমুন্নত রাখব। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক থিঙ্কট্যাংক ফোরামে অংশ নিয়ে বাংলাদেশের চিন্তাধারা বা আইডিয়া বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দেব।’

সেমিনারে বক্তাবৃন্দ- আলোর যত ঝর্ণাধারা 
এই সেমিনারে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রাওয়া ভাইস চেয়ারম্যান (আর্মি) ও বিশ্লেষক মেজর নিয়াজ আহমেদ জাবের (অব.), নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও গবেষক লে. কর্নেল আবু ইউসুফ জোরায়ের উল্লাহ (অব.), লেখক ও গবেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাসিমুল গনি (অব.)।
সেমিনারে অন্যান্য আলোচক ছিলেন, মুক্তিযোদ্ধা লে. কর্নেল মোদাসসের হোসেন খান, বীর প্রতীক, বিশিষ্ট লেখক, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও বিইউপির ডিস্টিংগুইস্ট প্রফেসর লে. জেনারেল আমিনুল করিম (অব.) ও রাষ্ট্র বিজ্ঞানী প্রফেসর দিলারা চৌধুরী প্রমুখ। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার উপস্থিতিতে এই সভায় উপস্থিত ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা, শিক্ষক, সাংবাদিক, ছাত্র, গবেষক ও অ্যাক্টিভিস্টসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের বিশিষ্ট নাগরিকবৃন্দ। 

সেমিনারে প্রবন্ধের আলোকিত ভূবনে 
সেমিনারের প্রথম বক্তা হিসেবে মেজর নিয়াজ আহমেদ জাবের (অব.) ‘নির্বাচনী চ্যালেঞ্জ ও করনীয়’ এর উপর আলোচনা করেন। ‘ইলেকশন ইনঞ্জিনীয়ারিং’ এর বিভিন্ন কলাকৌশল সম্পর্কে অবগত ও সতর্ক থাকার প্রয়োজনীয়তার কথা শ্রোতাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেন। বিভিন্ন বাহিনীসহ প্রায় নয় লক্ষ সদস্য নির্বাচনের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকবে বলে তিনি জানান। ফলাফল যাই হোক না কেন, নির্বাচনোত্তর আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করার উপর তিনি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। নির্বাচন ঘিরে অস্থিরতা তৈরীতে বিদেশেী হস্তক্ষেপের বিষয়ে সতর্ক করে মেজর নিয়াজ আহমেদ জাবের বলেন- “একটি সুষ্ঠু নির্বাচন করতে ব্যর্থ হওয়া মানে জুলাই অভ্যুত্থানের অর্জণকে ব্যর্থতায় পর্যবসিত করা”। 
লে. কর্নেল আবু ইউসুফ জোবায়ের উল্লাহ (অব.) ‘জাতীয় স্বার্থে ঐক্যের প্রয়োজনীয়’ এর উপর বক্তব্য উপস্থাপন করেন। আগামীর বাংলাদেশে জাতীয় ঐক্যের গুরুত্ব আরোপ করে তিনি বলেন- “আমাদের জন্য আজ প্রয়োজন একদল সৎ ও সাহসী মানুষের বলিষ্ঠ নেতৃত্বের”। লেঃ কর্নেল জোবায়ের বলেন- “বিভিন্ন সময়ে আমাদের মাঝে ঐক্য হয়েছে যেমন- ১৯৫২, ১৯৬৯, ১৯৭১, ১৯৯০ ও ২০২৪ সালে...। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এই ঐক্য আমরা ধরে রাখতে পারিনি। আমাদের মাঝে জাতিয় ঐক্য না থাকলে ভবিষ্যতে আমাদের টিকে থাকা কঠিন হবে।” কর্নেলের বক্তব্যে, জাতিয় ঐক্য অর্জণের উপায়গুলো সুন্দরভাবে উঠে আসে।   
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাসিমুল গনি ‘জাতীয় প্রত্যাশার’ কথাগুলো চমৎকারভাবে বিবৃত করেন। তিনি বলেন, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য জাতীয় নির্বাচন রাজনৈতিক বৈধতার ভিত্তি। জুলাই বিপ্লবকে শুধু স্মৃতি হিসেবে পালন ও উদযাপন নয়, জুলাই বিপ্লবকে রাষ্ট্রীয় নীতি ও প্রেরণার স্তম্ভে রূপান্তর করতে হবে। বাংলাদেশকে বানাতে হবে একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থার মডেল। তাই দূর্নীতির প্রতি শূন্য সহনীয়তা (জিরো টলারেন্স) প্রদর্শন করতে হবে। 
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাসিমুল গণি ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থের বদলে জনস্বার্থ রক্ষায় যোগ্য, সৎ ও দেশপ্রেমিক নেতৃত্বের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, “এখন ভোট রক্ষা করার অর্থ কেবল নির্বাচনে জয়ী হওয়া নয়, বরং রাষ্ট্রকে রাক্ষা করা।” 
তরুনদের প্রতিনিধি, তরুনদের আকাঙ্ক্ষা সেমিনারে জেন-জি এর একজন প্রতিনিধি ‘জুলাই যোদ্ধা’ও মেধাবী ছাত্র জনাব ইকরাম হোসেন মাহবুব বক্তব্য রাখেন।
তিনি বলেন, ‘ব্রেন-ড্রেন বন্ধ করা, বেকারত্ব দূর করা, লক্ষ লক্ষ কর্মঘণ্টার অপচয় রোধে যানজটমুক্ত একটি চলাচলব্যবস্থা নিশ্চিত করা, বায়ু দূষণ রোধ করা ইত্যাদি, সকলের নিকট যেগুলো প্রত্যাশা, আমাদের জন্য সেগুলো দাবী।” তার বয়ানে উঠে আসে তরুন প্রজন্মের আকাঙ্খার কথা।
একজন ডিসটিংগুইস্ট প্রফেসর বক্তব্যের শুরুতে বিইউপির ডিসটিংগুইস্ট প্রফেসর লে. জেনারেল আমিনুল করিম (অব.), আগামী বাংলাদেশে জাতীয় ঐক্যের বিষয়ে গুরুত্ব দেন। তিনি আশা করেন যে, আগামী নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনী নিরপেক্ষভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করবে। লে. জেনারেল আমিনুল করিম এ নেশনস অ্যাসপিরেশন: জুলাই আপরাইজিং ২০২৪’ বইটির উপর আলোকপাত করেন। তাদের মধ্যে জেন-জি এর লেখকও আছেন। বইটির প্রধান সম্পাদক হিসেবে তিনি সংক্ষেপে বইটির রূপরেখা তুলে ধরেন। এর মধ্যে উঠে আসে আগামীর বাংলাদেশের জনআকাঙক্ষার চমৎকার বয়ান।  

রণাঙ্গনের এক বীরের আহ্বান 
আমাদের গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখ সারির রণাঙ্গণের বীর মুক্তিযোদ্ধা লেঃ কর্নেল মোদাসসের হোসেন খান, বীর প্রতীক, তার আবেগপূর্ণ, দ্ব্যর্থহীন, স্পষ্ট ও খোলাখুলি বক্তব্য পেশের মাধ্যমে সেদিন সেমিনারের মধ্যমনি হয়ে উঠেছিলেন। নির্ধারিত দশ মিনিটের পরেও কিছুটা সময় অতিক্রম করাতে হয়তো উনি সঞ্চালকের কাছ থেকে কোন ইশারা পেয়ে তার বক্তব্য আচমকা থামাতে চাচ্ছিলেন, আর সাথে সাথেই শ্রোতাদের কাছ থেকে মুহূর্মুহ অনুরোধ ধ্বনিত হচ্ছিল ওনাকে বক্তব্য চালিয়ে যাবার সুযোগ দেয়ার জন্য। আমন্ত্রিত একজন অতিথি, ১৯৬৯’এর গণআন্দোলনের শহীদ আসাদের ছোট ভাই ডাঃ আজিজুল্লাহ এম নুরুজ্জামান নুর আসন থেকে উঠে মঞ্চের কাছে গিয়ে ওনাকে সনির্বন্ধ অনুরোধ জানান বক্তব্য চালিয়ে যাবার জন্য। কেননা দেশ ও জাতির প্রত্যাশা সম্পর্কে এমন নির্মোহ ও উদ্দীপনামূলক ভাষণ উনি এর আগে কখনো শোনেন নাই বলে জানান। সামরিক কর্মকর্তাদের তরফ থেকেও একই অনুরোধ আসতে থাকে। 
    সুবক্তা কর্নেল মোদাসসের বলেন- “বিদ্যমান পরিস্থিতিতে এটা অত্যন্ত সময়োপযোগী একটি সেমিনার। নির্বাচন অবশ্যই গণতন্ত্রের একটি মূল স্তম্ভ। কিন্তু গত ৫৫ বছরে এ দেশে অনুষ্ঠিত অধিকাংশ নির্বাচন আমাদেরকে নিরাশ করেছে। কারণ, নির্বাচন পদ্ধতিটা ভালো ছিল না। আমরা সঠিকভাবে আমাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারিনি। ফলে, নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকারের প্রশাসনে কোন স্তরেই জনগণের আকাঙ্খার প্রতিফলন দেখতে পাইনি। তবুও বারংবার আমরা নির্বাচন দিচ্ছি কেন? চাচ্ছি কেন? সুতরাং, দলীয় প্রতীক দেখে নয়, মানুষটাকে দেখে ভোট দিন।”
    জাতিয় ঐক্য নিয়ে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা বলেন- “আমাদের ঐক্য তো হয়েছিল; ১৯৭১’এ, ১৯৭৫’এ, ১৯৯০’এ এবং ২০২৪ এও। দুর্ভাগ্যক্রমে, নির্বাচন আসলেই প্রতিটি নির্বাচনের সময় কিছু কিছু মুক্তিযোদ্ধা বিক্রীত হয়ে যান! অথচ মুক্তিযোদ্ধাদের এ দেশের বিবেক হবার কথা ছিল! এমন কি সশস্ত্র বাহিনীগুলোর মধ্যেও অভ্যন্তরীণ অনৈক্যের অনতিক্রম্য ফাটল দেখা দিল! আমাদের প্রত্যাশাঃ বৈষম্য থাকবে না, দেশের আপদকালীন সময়ে নেতৃত্বের কোন অনৈক্য থাকবে না। এত রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা নষ্ট হতে পারেনা। কোন বহিঃশত্রুকে ভয় পাওয়ার মত কিছু নেই। আমাদের প্রতিবেশীরা জানে, দুর্যোগের সময়ে এ দেশের মানুষেরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারে। দিস কান্টি হ্যাজ কাম টু স্টে।”

একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর বয়ান
সমাপনী বক্তব্যে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রফেসর দিলারা চৌধুরী বলেন- “সমাজের এলিট গোষ্ঠির বিরুদ্ধে প্রান্তিক জনগোষ্ঠির পুঞ্জীভূত ক্ষোভ শাসকদের ক্রমাগত নৃশংস ভূমিকার কারণে আন্দোলন থেকে অভ্যুল্থানে পরিণত হয়। রাজনীতিবিদদের অনেক গোষ্ঠির মাঝে এ সময়ে সুবিধাবাদী মনোভাব পরিলক্ষিত হয়।” তিনি প্রশ্ন করেন, রাজনীতিবিদগণ কি প্রফেসর ইউনুসকে সমর্থন দিয়ে সেভাবে সাহায্য করেছেন? না, তারা জাতির প্রয়োজনে ঐক্যবদ্ধ হতে পারেন নি এবং সুষ্ঠুভাবে একত্রে সেরকম কোন কাজও করতে পারেননি।” প্রফেসর দিলারা চৌধুরী আরো বলেন- “গত ১৫ বছরে দেশের জনগণের চোখে সশস্ত্র বাহিনীগুলোর ভাবমূর্তি অনেক নিচে নেমে গেছে। সেটাকে তো ফিরিয়ে আনতে হবে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে।” 
অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন- “একটি প্রতিবেশী দেশ আমাদের নির্বাচন ভন্ডুল করতে এবং এখানে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চায়। অস্থিরতা তৈরী করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চায়। তাই সামনে চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।” তিনি শ্রোতাদেরকে একটি অনন্য সতর্কবাণী শুনিয়ে তার বক্তব্য শেষ করেনঃ “এটারনাল ভিজিলেন্স ইজ দি প্রাইস অফ লিবার্টি।” 

 প্যানেল সেশন বা প্রশ্নোত্তর পর্বের খোলা জানালা 
সেমিনারটি শেষ হলো প্রশ্নোত্তোর পর্ব দিয়ে। বক্তাদের আলোচনা এবং দর্শক শ্রোতাদের মাঝ থেকে স্বতঃস্ফূ্র্তভাবে প্রশ্ন ও মন্তব্য আসার ফলে অনুষ্ঠানটি প্রাণবন্ত হয়ে উঠে। সঞ্চালকের দৃঢ় নিয়ন্ত্রনের ফলে প্রায় ২০ জন উপস্থিত প্রশ্নকারীকে সুযোগ দেয়ার এবং কয়েকজন প্রশ্নকারীর লিখিত প্রশ্নের জবাব দেয়ার পরেও অনুষ্ঠানটি নির্ধারিত সময়সীমা খুব বেশিদূর অতিক্রম করেনি। এই সেমিনারে উঠে আসে নির্বাচন ও জাতীয় ঐক্য নিয়ে বিষয়ক নানাবিধ বুদ্ধিদীপ্ত সুপারিশ মালা। এ বিষয়গুলো হয়তো আগামীতে নতুন পথের সন্ধান দিবে।  
সেমিনার আয়োজনে আমার সামান্য কিছু সংশ্লিষ্টতা ছিল। সেদিন বক্তৃতা চলাকালে একটি বিষয় দৃষ্টি আর্কষণ করে। হলে উপস্থিত সম্মানিত অতিথি, শ্রোতামন্ডলীর অধিকাংশই আশ্চর্যরকম অভিনিবেশ, মুগ্ধতাচিত্তে বক্তৃতা শুনছিলেন। তাদের মাঝে ছিল না মোবাইল মগ্নতা। ছিল না পার্শ্ববর্তী বা পার্শ্ববর্তিনীদের সঙ্গে মধুর সংলাপ। বিষয়টা অবাক করার মতোই। 
শেষের কথা 
রাওয়ার বর্তমান সদস্য সংখ্যা প্রায় ৬ হাজার। রাওয়া সদস্যদের এই বিশাল অভিজ্ঞতা, বিশেষজ্ঞ জ্ঞান ও মেধা আমাদের জাতীয় সম্পদ। এই অভিজ্ঞতা ও মেধা ব্যবহার করে আরআরএসএফ একটি ব্যতিক্রমী গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরামর্শ সরকারের মুক্ত মনে গ্রহণ করা উচিত। গণতান্ত্রিক পরিবেশে থিংকট্যাংকের বিকাশ হয়। আশা করি বর্তমান গণতান্ত্রিক পরিবেশে আরআরএসএফসহ সব থিংকট্যাংকের বিকাশ ঘটবে। 
সেমিনারে বক্তাগণ উল্লেখ করেছেন জাতীয় ঐক্যের অপরিহার্যতার কথা। নির্বাচনের পর নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশার কথাও আলোচিত হয়। অভ্যাগত অতিথিবৃন্দ ঘরে ফিরলেন এক ধরনের জাতীয় ঐক্যের স্পিরিট নিয়ে। 
দেশ ও সমাজের প্রয়োজনে রাওয়ার এই উদ্যোগটি প্রশংসিত হয়েছে। এই সেমিনার আয়োজন করে রাওয়া কর্তৃপক্ষ ও আরআরএসএফ ক্ষুদ্র হলেও একটি সামাজিক দায়িত্ব পালন করেছে। বাংলাদেশের সব নাগরিকের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা ও অন্তর্ভুক্তির আলোকে এগিয়ে যাক আমাদের প্রাণের বাংলাদেশ।  

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, গবেষক ও বিশ্লেষক