আইএমএফের নতুন ঋণ পেতে বাংলাদেশের সামনে কঠিন শর্ত

ডেস্ক রিপোর্ট
  ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ১১:১০

নতুন করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বড় অঙ্কের ঋণ পেতে হলে বাংলাদেশকে এবার চারটি বড় পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে। রাজস্ব আদায় বাড়ানো, ব্যাংক খাতের সংস্কার, ভর্তুকি কমানো ও যৌক্তিকীকরণ এবং সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরানো—এই চার ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখতে চাইতে পারে সংস্থাটি।
এর মধ্যে চলমান ঋণ কর্মসূচির ষষ্ঠ কিস্তি ছাড়ের বিষয়টিও রয়েছে। আগামী ২৯ অক্টোবর ঢাকায় আসছে আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল। প্রায় দুই সপ্তাহের সফরে তারা বাংলাদেশের অর্থনীতির সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করবে। একইসঙ্গে আগের পাঁচ কিস্তির শর্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতিও যাচাই করা হবে।
এর আগে ১৩ থেকে ১৭ অক্টোবর ওয়াশিংটনে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভা অনুষ্ঠিত হবে। ওই সভায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে। সরকারের লক্ষ্য নতুন কর্মসূচির আওতায় আইএমএফের কাছ থেকে ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি ডলারের ঋণ সহায়তা নেওয়া।
সব মিলিয়ে অক্টোবরের আলোচনাকে নতুন ঋণের জন্য বাংলাদেশের প্রথম বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রথম শর্ত: বাড়াতে হবে রাজস্ব
নতুন ঋণ কর্মসূচিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে রাজস্ব আদায়। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘদিন ধরেই কম। ফলে সরকারের ব্যয়ের সক্ষমতা বাড়ছে না, আবার বাজেট ঘাটতি ও সরকারি ঋণের চাপও বাড়ছে।
আইএমএফের সাম্প্রতিক মূল্যায়নেও বাংলাদেশের কম রাজস্ব আহরণকে অর্থনীতির অন্যতম বড় দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সংস্থাটির মতে, রাজস্ব আয় বাড়াতে না পারলে সরকার সামাজিক সুরক্ষা, উন্নয়ন এবং জনসেবামূলক খাতে প্রয়োজনীয় ব্যয় বাড়ানোর মতো আর্থিক সক্ষমতা অর্জন করতে পারবে না।
এবারের আলোচনায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ের অগ্রগতি, করের আওতা বাড়ানো, কর প্রশাসনের সংস্কার এবং রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর পরিকল্পনা জানতে চাইতে পারে আইএমএফ।

সরকারের জন্য এখানেই বড় পরীক্ষা। কারণ অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরাতে একদিকে ব্যয় বাড়ানোর প্রয়োজন, অন্যদিকে পর্যাপ্ত রাজস্ব না থাকায় সেই ব্যয় মেটানোর সক্ষমতা সীমিত।
দ্বিতীয় শর্ত: ব্যাংক খাতকে শক্ত ভিত্তিতে ফেরানো
নতুন ঋণ কর্মসূচির দ্বিতীয় বড় বিষয় হবে ব্যাংক খাতের সংস্কার। খেলাপি ঋণ, দুর্বল ব্যাংক, মূলধন ঘাটতি, তারল্য সংকট এবং আর্থিক খাতে সুশাসনের ঘাটতি—সব মিলিয়ে ব্যাংক খাত এখনও অর্থনীতির বড় ঝুঁকি।
জুলাইয়ে বাংলাদেশ সফর শেষে আইএমএফ জানিয়েছিল, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে চাপ এখনও বেশি। এ খাত পুনর্গঠনে একটি বিশ্বাসযোগ্য ও সমন্বিত কৌশল প্রয়োজন।
এবার তাই শুধু সংস্কারের ঘোষণা নয়, বাস্তবে কী অগ্রগতি হয়েছে—সেটি দেখতে চাইতে পারে সংস্থাটি। দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন, খেলাপি ঋণ কমানো, ব্যাংকের মূলধন বাড়ানো এবং পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় সুশাসন প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা আলোচনায় আসতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা দূর না হলে নতুন ঋণের অর্থও কাঙ্ক্ষিতভাবে অর্থনীতিতে কাজে লাগানো কঠিন হবে। কারণ ব্যাংক খাত দুর্বল থাকলে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়।
তৃতীয় শর্ত: ভর্তুকির লাগাম টানা
সরকারের ব্যয়ের ওপর চাপ কমাতে ভর্তুকি ব্যবস্থাপনাও নতুন কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের দামের অস্থিরতা, আমদানি ব্যয় এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারের ব্যয়—সব মিলিয়ে ভর্তুকির চাপ বেড়েছে। এ অবস্থায় কোন খাতে কত ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে এবং তা কীভাবে যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা যায়, সে বিষয়ে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা হতে পারে।
এরই মধ্যে সরকার ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম বাড়িয়েছে। সরকারের ব্যাখ্যা, আন্তর্জাতিক বাজার, পরিবহন ও বিমা ব্যয় এবং ভর্তুকির চাপ বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
যদিও সরকার বলছে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো আইএমএফের সরাসরি কোনও শর্ত নয়। তবে নতুন ঋণ কর্মসূচিতে জ্বালানি মূল্য সমন্বয়, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম এবং ভর্তুকির পরিমাণ গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হতে পারে।
অর্থাৎ নতুন ঋণের সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও পরোক্ষভাবে যুক্ত হয়ে যেতে পারে।
চতুর্থ শর্ত: মূল্যস্ফীতি ও অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা
নতুন ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে চতুর্থ বড় পরীক্ষা হবে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফেরানো।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বিনিয়োগ, বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে চাপ এবং ধীর প্রবৃদ্ধি—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনও চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে খাদ্য ও জ্বালানির দাম সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়েছে।
আইএমএফের সাম্প্রতিক পূর্বাভাসেও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। সংস্কারে গতি না এলে মধ্য মেয়াদে প্রবৃদ্ধি আরও কমে যাওয়ার ঝুঁকির কথাও বলা হয়েছে।
তাই নতুন কর্মসূচিতে শুধু ঋণের পরিমাণ নয়, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা, বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনাও গুরুত্ব পেতে পারে।
ষষ্ঠ কিস্তির আগে ঢাকায় আইএমএফ
এই চারটি বড় বিষয় সামনে রেখেই আগামী ২৯ অক্টোবর ঢাকায় আসছে আইএমএফের প্রতিনিধিদল। আইএমএফের উন্নয়ন সামষ্টিক অর্থনীতি বিভাগের প্রধান ক্রিস পাপাজিওর নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটি বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, এনবিআর, বিদ্যুৎ বিভাগ এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সঙ্গে বৈঠক করবে বলে জানা গেছে।
সফরে চলমান ঋণ কর্মসূচির শর্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হবে। এর ভিত্তিতেই ষষ্ঠ কিস্তি ছাড়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
সরকারের জন্য তাই একই সঙ্গে দুটি লক্ষ্য সামনে—একদিকে চলমান কর্মসূচির ষষ্ঠ কিস্তি নিশ্চিত করা, অন্যদিকে নতুন কর্মসূচির জন্য আইএমএফকে রাজি করানো।
চাওয়া হবে ৪৫০–৫০০ কোটি ডলার
সরকারের প্রাথমিক লক্ষ্য নতুন কর্মসূচির আওতায় ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি ডলারের ঋণ নেওয়া। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সামষ্টিক অর্থনীতি বিভাগ এ নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছে।
নতুন কর্মসূচির সম্ভাব্য কাঠামোতে রাজস্ব আদায়, ব্যাংক খাত সংস্কার, ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।
ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন ঋণচুক্তি চূড়ান্ত করার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষ হলে আগামী বছরের শুরুতে প্রথম কিস্তি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নও গুরুত্বপূর্ণ
আইএমএফের পাশাপাশি বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকেও নতুন অর্থায়ন পাওয়ার চেষ্টা করছে সরকার। বাজেট সহায়তার পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা, খাদ্য ও সার আমদানি, ব্যাংক খাত পুনর্গঠন, সামাজিক সুরক্ষা, কর্মসংস্থান এবং জলবায়ু মোকাবিলায় অর্থায়নের প্রস্তাব দেওয়া হতে পারে।
বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক সভায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দুই সংস্থার শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেখানে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, অর্থায়নের প্রয়োজন এবং সংস্কার পরিকল্পনা তুলে ধরার কথা রয়েছে।
শুধু ঋণ নয়, সংস্কারই বড় বিষয়
অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন ঋণ বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার চাপ ও বাজেট ব্যবস্থাপনায় সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে। কিন্তু ঋণ দিয়ে অর্থনীতির মৌলিক দুর্বলতা দূর করা সম্ভব নয়।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, নতুন ঋণের অর্থ কোন খাতে ব্যবহার হবে এবং রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত কীভাবে বাড়ানো হবে, সে বিষয়ে সরকারের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকতে হবে।
সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমানের মতে, নতুন আইএমএফ কর্মসূচি প্রয়োজনীয় সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে শুধু ঋণ পাওয়ার জন্য নয়, দেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক প্রয়োজনেই রাজস্ব, ব্যাংকিং খাত ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত সংস্কার করতে হবে।
ফলে বাংলাদেশের সামনে এখন শুধু নতুন ঋণ পাওয়ার প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হচ্ছে—৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি ডলারের নতুন ঋণের দরজা খুলতে গিয়ে অর্থনীতির কোন কোন জায়গায় কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
আগামী অক্টোবরের আইএমএফ পর্যালোচনা সেই পরীক্ষার প্রথম ধাপ। আর এই পরীক্ষায় বাংলাদেশের সাফল্য বা ব্যর্থতার ওপরই অনেকটা নির্ভর করবে নতুন ঋণ কর্মসূচির পথ কতটা সহজ হবে।
সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন