বরাদ্দ দ্বিগুণ নিয়ে বিতর্ক

এমপিদের জন্য মেগা প্রকল্প: আসনপ্রতি বরাদ্দ বেড়ে ৫০ কোটি

ডেস্ক রিপোর্ট
  ২৪ জুন ২০২৬, ১৭:৪৫


নিজ নিজ সংসদীয় আসনের রাস্তাঘাট ও গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে বিপুল অঙ্কের টাকা বরাদ্দ পাচ্ছেন জাতীয় সংসদের সদস্যরা। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) প্রতিটি আসনের জন্য ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দের একটি নতুন মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে, যা পূর্ববর্তী সরকারের চেয়ে দ্বিগুণ। ‘অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পল্লি অবকাঠামো উন্নয়ন (বিভাগওয়ারি)’ নামের এই মেগা প্রকল্পের জন্য আনুমানিক ১৫ হাজার কোটি টাকার একটি খসড়া প্রস্তাব তৈরি করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাবনা অনুযায়ী, প্রতি বছর ১০ কোটি টাকা করে টানা পাঁচ বছর ধরে সংসদ সদস্যরা তাদের পছন্দসই এলাকার অবকাঠামোগত উন্নয়নে এই অর্থ ব্যয় করতে পারবেন।
উন্নয়ন বরাদ্দের এই বিশাল তহবিল মূলত নতুন সংসদ সদস্যদের জন্য বরাদ্দ করা হচ্ছে। এলজিইডির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সংসদ সদস্যরা তাদের নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার সড়ক, সেতু, কালভার্ট, গ্রামীণ হাটবাজার ও ঘাটসহ বিভিন্ন অগ্রাধিকারমূলক কাজের একটি তালিকা তৈরি করবেন। সেই তালিকা অনুযায়ী এলজিইডি মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের কাজ করবে। অতীতে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এ ধরনের প্রকল্প একাধিকবার নেওয়া হয়েছিল। এমনকি ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরও আসনপ্রতি ২৫ কোটি টাকা করে বরাদ্দ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে তৎকালীন সরকারের পতন ঘটায় সেই পরিকল্পনা আর আলোর মুখ দেখেনি।
বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে সংসদ সদস্যদের এই বিশেষ তহবিল দেওয়ার প্রক্রিয়াটি প্রথম চালু হয় ২০০৫-০৬ অর্থবছরে। তৎকালীন সময়ে সরকারি ও বিরোধী দলের তীব্র দাবির মুখে প্রতি আসনের জন্য দুই কোটি টাকা করে বরাদ্দের প্রস্তাব একনেক সভায় অনুমোদন পায়। সেই থেকে শুরু হওয়া এই রাজনৈতিক সংস্কৃতির ধারাবাহিকতায় ২০১০ সালে ৪ হাজার ৮৯২ কোটি, ২০১৫ সালে ৬ হাজার ৭৬ কোটি এবং সর্বশেষ ২০২০ সালে ৬ হাজার ৫২৬ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। নবম সংসদের সদস্যরা ১৫ কোটি এবং পরবর্তী দুটি সংসদে তা বাড়িয়ে ২০ কোটি টাকা করা হয়েছিল। তবে বর্তমানে নির্মাণসামগ্রীর আকাশচুম্বী মূল্যবৃদ্ধি ও ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির অজুহাতে এই বরাদ্দ একলাফে ৫০ কোটি টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
তবে বর্তমান বিএনপি সরকার এই প্রকল্প বাস্তবায়নে আগের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন ও কৌশলগত পদ্ধতি অবলম্বন করছে। অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে পুরো দেশের জন্য একটিমাত্র প্রকল্প না করে, এবার আটটি প্রশাসনিক বিভাগের জন্য আলাদা আটটি স্বাধীন প্রকল্প নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। গত ২৩ মে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত প্রকল্প যাচাই কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ সভায় এই প্রশাসনিক পরিবর্তনের রূপরেখা চূড়ান্ত করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, পুরো দেশের জন্য একটি একক প্রকল্প পরিচালনা করা অত্যন্ত জটিল এবং একজন প্রকল্প পরিচালকের পক্ষে দেশজুড়ে তদারকি করা প্রায় অসম্ভব। তাছাড়া বিশাল তহবিলের সমন্বয়ে একক প্রকল্প পাসেও জটিলতা তৈরি হয়।
নতুন এই কৌশলগত সিদ্ধান্তের ফলে ঢাকা বিভাগের ৫৫টি আসন, চট্টগ্রামের ৫৫টি, রাজশাহীর ৩৮টি, রংপুরের ৩৩টি, খুলনার ৩৪টি, ময়মনসিংহের ২৪টি, বরিশালের ২১টি এবং সিলেট বিভাগের ১৯টি সংসদীয় আসনের জন্য পৃথক আটটি প্রকল্প এবং আটজন স্বতন্ত্র প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নিয়োগ দেওয়া হবে। এলজিইডির পরিকল্পনা শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবু সালেহ মোহাম্মদ হানিফ জানান, এই নতুন প্রস্তাবনাটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য দ্রুতই পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হবে। তবে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, পূর্ববর্তী প্রকল্পগুলোর অধীনে যেসব রাস্তাঘাটের কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে, সেগুলোতে নতুন করে কোনো অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হবে না।
প্রকল্পের খসড়া অনুযায়ী, দেশের মোট ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৭৯ জন সংসদ সদস্য এই উন্নয়ন তহবিল ব্যবহারের সুযোগ পাবেন। দেশের প্রধান চার সিটি করপোরেশনভুক্ত ২১টি আসনকে এই গ্রামীণ অবকাঠামো প্রকল্পের আওতাভুত করা হয়নি। এর মধ্যে ঢাকার ভেতরের ১৫টি, চট্টগ্রামের ৩টি, খুলনার ২টি এবং রাজশাহীর ১টি আসন রয়েছে। একই সাথে সংরক্ষিত নারী আসনের ৫০ জন সংসদ সদস্যের জন্যও কোনো পৃথক তহবিল রাখা হচ্ছে না। ফলে ২৭৯টি আসনের বিপরীতে পাঁচ বছরে মূল খরচ দাঁড়াবে ১৩ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা এবং বাকি ১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে প্রকল্পের জনবল নিয়োগ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও আনুষঙ্গিক প্রশাসনিক খাতে।
সংসদ সদস্যদের এই বিপুল অঙ্কের তহবিল বরাদ্দ দেওয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সুশীল সমাজ এবং অর্থনীতিবিদদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক চলছে। মূলত দুই ধরনের মৌলিক প্রশ্ন সবসময় সামনে আসে। প্রথমত, সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা অনুসারে বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদে সংসদ সদস্যদের মূল দায়িত্ব স্পষ্টাক্ষরে ‘আইন প্রণয়ন’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্থানীয় যাবতীয় উন্নয়নকাজের আইনি একচ্ছত্র দায়িত্ব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের। ফলে সংসদ সদস্যদের এই ধরনের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সরাসরি যুক্ত করা স্থানীয় সরকারের কার্যকারিতাকে খর্ব করে এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্ব তৈরি করে।
দ্বিতীয় গুরুতর প্রশ্নটি হলো দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি নিয়ে। দুর্নীতি প্রতিরোধে কর্মরত সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ২০২০ সালের ‘গুরুত্বপূর্ণ পল্লি অবকাঠামো উন্নয়ন-৩’ প্রকল্পের অধীন হওয়া ৬২৮টি উন্নয়নমূলক কর্মসূচি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে একটি চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। সেই প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রায় ৩৩ শতাংশ কাজের মান অত্যন্ত নিম্নমানের ছিল। একই সাথে পুরো প্রকল্পের মোট বাজেটের ৮ থেকে ১৩ শতাংশ টাকা অদৃশ্য কমিশন বা ঘুষ বাণিজ্যের পেছনে লোপাট হয়েছে, যেখানে স্থানীয় প্রকৌশলী ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিরা ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। অনেক ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যরা সরাসরি তাদের আত্মীয়স্বজন ও দলীয় কর্মীদের কাজ পাইয়ে দিয়ে ১ থেকে ২ শতাংশ কমিশন পকেটে পুরেছেন।
এই প্রসঙ্গে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান সতর্কবার্তা দিয়ে জানিয়েছেন, অতীতে সংসদীয় আসনের বরাদ্দ নিয়ে গবেষণায় চরম রাজনৈতিক দলীয়করণ, জনগণের অর্থের অপচয় ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছে। এবারও যদি নতুন প্রকল্পে সংসদ সদস্যদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কতৃত্ব বজায় থাকে, তবে পূর্বের সেই ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির পুনরাবৃত্তি ঘটার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। তবুও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দাবি, তৃণমূলের জরুরি চাহিদা পূরণে এই প্রকল্প অপরিহার্য। যেমন লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য আবুল খায়ের ভূঁইয়া জানান, বিগত সরকারের রাজনৈতিক বৈষম্যের কারণে তাঁর এলাকায় গ্রামীণ রাস্তাঘাটের কোনো উন্নয়ন হয়নি, তাই জরুরি ভিত্তিতে এই ফান্ডের প্রয়োজন রয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক সালাহউদ্দিন এম আমিনুজ্জামান একটি ভিন্নমাত্রিক তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ দিয়েছেন। তাঁর মতে, তাত্ত্বিক দিক থেকে সংসদ সদস্যদের প্রধানতম কাজ কেবল আইন প্রণয়ন করা হলেও, দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তব রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সাধারণ মানুষ তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধির কাছ থেকে দৃশ্যমান এলাকার উন্নয়ন দেখতে চায়। জনগণ সরাসরি তাদের সুযোগ-সুবিধার জন্য এমপির ওপর নির্ভর করে। তবে এই ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর জন্য দীর্ঘমেয়াদে কতটা কল্যাণকর বা কাঙ্ক্ষিত, তা নিয়ে সুস্থ ও দীর্ঘস্থায়ী বিতর্কের অবকাশ অবশ্যই রয়েছে।