
জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এবার প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জাতীয় বাজেট। এটি বিএনপি সরকারের ১৭তম এবং অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রথম বাজেট।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকাল ৩টায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে এ বাজেট প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী।
দুর্নীতি-লুটপাটে সব প্রতিষ্ঠান অকার্যকর
বাজেট বক্তব্যে বলা হয়, ফ্যাসিবাদী সরকার রাষ্ট্র ক্ষমতা ব্যবহার করে অর্থনীতিতে সীমাহীন দুর্নীতি ও লাগামহীন লুটপাট করেছে। এর মাধ্যমে সব প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর ও ধ্বংস করা হয়েছে। তথাকথিত উন্নয়নের স্লোগান দিয়ে লুটপাট ও অর্থ পাচারের মাধ্যমে অর্থনীতির মূলভিত্তিকে দুর্বল করে দিয়েছে।
ফ্যাসিবাদী শাসনামলে অর্থনৈতিক নীতি ও পরিকল্পনায় বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে ক্ষুদ্র দলীয় ও গোষ্ঠীগত দুরভিসন্ধিই ছিল প্রধান প্রবণতা। ফলে একদিকে এদেশের খেটে খাওয়া মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ সম্পদ দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের মাধ্যমে মুষ্টিমেয় লুটেরাদের হস্তগত হয়েছে। একই সঙ্গে সম্পদ বিদেশে পাচার করা হয়েছে। অন্যদিকে সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যর্থতাগুলো ঢাকা হয়েছে মিথ্যা পরিসংখ্যান ও কথার ফুলঝুরি দিয়ে। ফলে রাষ্ট্র গঠণের মূল চালিকা শক্তি অর্থাৎ অর্থনৈতিক ইঞ্জিন বিগত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ক্রমেই দুর্বল হতে হতে একেবারে ধ্বংস হয়েছে। বিএনপি সেই ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকেই নতুন করে পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।
বিচ্ছিন্ন খাতে অগ্রাধিকার
অর্থনীতিতে অবদান কম এবং মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছে এমন খাতগুলোকে প্রস্তাবিত অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এসব খাতকে সামনে নিয়ে আসা হবে। এর মধ্যে ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি, ক্রীড়া অর্থনীতি, সবুজ অর্থনীতি এবং সুনীল অর্থনীতি। এসব খাতকে জাতীয় অর্থনীতির একেবারে কেন্দ্রে নিয়ে আসার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে বাজেটে। এসব খাতের অনুকূলে প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থও বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি এসব খাতে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে উৎসাহিত করে তুলতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক বৈচিত্র যেমন আসবে, তেমনি ঝুঁকি কমবে। পাশাপাশি বাড়বে কর্মসংস্থানের হার।
মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্যে সংকটের কারণে যে দেশের সার্বিক অর্থনীতি বড় ধরনের ঝুকির মুখে পড়েছে সেটিও প্রস্তাবিত বাজেটে স্বীকার করে নিয়েছে সরকার। পাশাপাশি এ সংকট মোকাবিলার জন্য নানামুখী পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
বাজেটে বলা হয়, বিএনপি সরকার গঠনের ১০ দিনের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে সংকট শুরু হয়। যা অর্থনীতিতে আকস্মিকভাবে ঝুঁকি তৈরি করে। মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল, এলএনজি ও সারের দাম দ্বিগুণের বেশি বেড়ে যায়। জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ, কৃষি পরিবহন ও শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়েছে। ফলে মূল্যস্ফীতি ও ভর্তুকির চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। আমদানি ব্যয় বাড়ার কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ পড়েছে।
বাজেটে আশংকা প্রকাশ করে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার কারণে কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স প্রবাহের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। বাইরের ধাক্কা এলে তা মোকাবিলা অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার ওপর জোর দিয়ে আঘাতের মাত্রাকে কমিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
৫ বছরে জিডিপি ৮ শতাংশের বৃত্তে
আগামী পাচ বছরের মধ্যে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার ৮ শতাংশের বৃত্ত অতিক্রম করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী ২০৩০-৩১ অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার সাড়ে ৮ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সময়ের মধ্যে মূল্যস্ফীতির হার ৫ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনা হবে। প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ জিডিপির ২ দশমিক ৭ শতাংশে উন্নীত করা এবং মোট বিনিয়োগ জিডিপির ৪০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।
৫ বছরে কর জিডিপির অনুপাত ৯ শতাংশের বৃত্তে
বর্তমানে কর জিডিপির অনুপাত ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। রাজস্ব আয় বাড়িয়ে আগামী পাচ বছরের মধ্যে অর্থাৎ ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে এ অনুপাত ৯ দশমিক ৬ শতাংশে উন্নীত করা হবে। পাশাপাশি রাজস্ব জিডিপির অনুপাত বর্তমানে ৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১১ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে। এ লক্ষ্যে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে ব্যাপক সংস্কার, কর প্রদান সহজ করা ও করদাতাদের হয়রানি বন্ধ করা হবে।
ঋণ স্থিতিশীলতায় ঝুঁকি
বাজেটে বলা হয়েছে দেশের ঋণ স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে ঝুকির সৃষ্টি হয়েছে। ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ে দুর্নীতি সংশ্লিষ্ট ও অপরিকল্পিত প্রকল্প গ্রহণ এবং সেসব প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য বিপুল পরিমাণ ঋণ গ্রহণ করায় দেশের ঋণ স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এ ক্ষেত্রে দেশ বর্তমানে মধ্যম মানের ঝুকিতে রয়েছে। সরকার এ খাতে নানামুখী পদক্ষেপ নিয়ে আগামীতে নিম্ন মানের ঋণ ঝুঁকিতে ফিরে আসার পরিকল্পনা করেছে। এ জন্য প্রকল্প গ্রহণ ও ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। পাশাপাশি রাজস্ব আয় বাড়ানোর মাধ্যমে বাজেট ঘাটতি একটি সহনীয় মাত্রায় নিয়ে আসা হবে। যাতে ঋণ ব্যবস্থাপনা শৃঙ্খলা ফিরে আসে। এ জন্য ঋণ নির্ভরতা কমিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানোর নীতি গ্রহণ করা হয়েছে।
ব্যাংক খাত পরিবারিক প্রভাব মুক্ত
ব্যাংক খাতে ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে বাজেটে। এ লক্ষ্যে প্রচলিত আইনি কাঠামোতেও পরিবর্তন আনা হবে। এর মাধ্যমে ব্যাংক খাতকে পরিবারিক প্রভাব মুক্ত রাখার পদক্ষেপ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকের কার্যক্রম পরিচালনায় রাজনৈতিক নিয়োগ ও হস্তক্ষেপ বন্ধ করা হবে। এ খাতকে আন্তর্জাতিক মানদন্ডে উন্নীত করার পদক্ষেপ নেওয়া হবে। যাতে প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল ও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠতে পারে।
মেধাভিত্তিক বাংলাদেশ
বাজেটে মেধাভিত্তিক বাংলাদেশ বিনির্মানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে সব ধরনের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে মেধা, সততা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ যোগ্যতাই প্রধান মাপকাঠি হিসাবে বিবেচিত হবে। এ লক্ষ্যে সরকার থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ ইতোমধ্যে নেওয়া হয়েছে। আরও পদক্ষেপ নেওয়া হবে। মেধার ভিত্তিতে তরুণ উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও তাদেরকে কম সুদে ঋণ সুবিধা দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে সব ক্ষেত্রে মেধার চর্চা করে সরকার দেশে বিদেশে মেধার বিকাশ ঘটাতে চাচ্ছে। বিদেশে চাকরি করার ক্ষেত্রে মেধাবীদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া হবে।
কৃষক কার্ড বরাদ্দ
নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকার ক্ষমতায় এসেই কৃষক কার্ড চালু করেছে। এ খাতে আগামী অর্থবছরের বাজেটে কৃষক কার্ড বাবদ ১ হাজার ৬২ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা ১০টি সেবা পাবেন। আগামী অর্থবছরে আরও ১০০টি উপজেলায় সাড়ে ৪২ লাখ কৃষককে কার্ড দেওয়া হবে। দেশের সব কৃষককে পর্যায়ক্রমে এ কার্ড দেওয়া হবে।
কৃষিঋণ মওকুফে বরাদ্দ
নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকার সুদসহ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকুফ করেছে। চলতি অর্থবছরে এ খাতে ১ হাজার ৫৬৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও কৃষকদের সহায়তা করতে ১০ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠন করা হয়েছে। এ তহবিল থেকে কম সুদে ঋণ দেওয়া হবে। পাশাপাশি কৃষিতে অন্যন্য খাতেও ভর্তুকি বাড়ানো হয়েছে।
আম চাষীদের জন্য হিমাগার
দেশে আম উৎপাদন বাড়লেও আম সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেই। ফলে মৌশুমের সময় অনেক আম নানাভাবে নষ্ট হয়। এতে আম চাষীরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে। আম চাষীদের ক্ষতি কমাতে দেশের বরেন্দ্র অঞ্চলে বিশেষ হিমাগার স্থাপনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া কৃষি খাতের পচনশীল পণ্যের জন্য কোল্ড স্টোরেজ ও কোল্ড চেইন ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হবে। কৃষি পণ্যে বহুমুখীকরণ কার্যক্রম জোরদার করা হবে।
খাদ্য পণ্যের মনিটরিং অনলাইনে
বাজেটে বলা হয়েছে খাদ্যপণ্যের বাজার দর পর্যবেক্ষণ ও মনিটরিং করা হবে অনলাইনে। অচিরেই সরকার এ ব্যবস্থা চালু করবে। যাতে অযৌক্তিকভাবে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ানো বা কৃত্রিম সংকটের সৃষ্টি করা না যায়। একই সঙ্গে উৎপাদন, সরবরাহ, আমদানি ব্যবস্থাও অনলাইনে তদারকি করা হবে। চাহিদা ও সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো সমস্যা দেখা দিলে অনলাইনে মনিটরিংয়ের তথ্য অনুযায়ী দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিলিয়ন ডলারের ঘরে মৎস্য রপ্তানি
আগামী ৫ বছরের মধ্যে মৎস্য রপ্তানি করে এক বিলিয়ন বা ১০০ কোটি ডলার আয় করার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে বাজেটে। এ লক্ষ্যে মাছের উৎপাদন বাড়ানো হবে। পাশাপাশি রপ্তানিতে মূল্য সংযোজনের হারও বাড়ানো হবে। উৎপাদন বাড়াতে জাল যার জলা তার নীতির ভিত্তিতে মৎস্য আহরণের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে মৎস্য চাষীদের ঝুঁকি মোকাবিলায় মৎস্য বীমা চালু করার কথাও বলা হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে।
ফ্রি ইন্টারনেট সুবিধা
দেশব্যাপী সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য ও উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করতে ইতোমধ্যে কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর মধ্যে দেশের সব বিমানবন্দর, ৭টি রেলওয়ে স্টেশনসহ আন্তঃনগর ট্রেনে উচ্চগতির ফ্রি ইন্টারনেট সেবা চালু করা হয়েছে। আগামী ২ বছরের মধ্যে দেশের ৯০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর কাছে ফাইভ জি সেবা পৌছে দেওয়ার লক্ষ্যে কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।