
ফ্লাইওভারের পিলারে লেখা ‘জুলাই গ্রাফিতি’ মুছে দেওয়াকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামে মুখোমুখি অবস্থানে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
এনসিপি নেতাকর্মী এবং ডা. শাহাদাতের অনুসারী বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা এ নিয়ে রোববার রাতে টাইগারপাস এলাকায় করপোরেশনের প্রবেশমুখে অবস্থান নিয়ে পালটা-পালটি বিক্ষোভ করেন।
সোমবার পুনরায় গ্রাফিতি অঙ্কনের কর্মসূচি ঘোষণা করে। পুলিশ অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে টাইগার পাস থেকে জিইসি মোড় পর্যন্ত সবধরনের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ তথা ১৪৪ ধারা জারি কর গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে সিএমপি।
এদিন সকালে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে এনসিপির নেতাকর্মীরা গ্রাফিতি অঙ্কন করতে এলে পুলিশের সঙ্গে তাদের হাতাহাতি ধস্তাধস্তি হয়। একপর্যায়ে পুলিশের গায়ে রং ছুড়ে মারে এনসিপি নেতাকর্মীরা। পুলিশও রঙ্গের বালতি কেড়ে নিয়ে তাদের দিকে ছুড়ে মারে।
এনসিপি নেতাকর্মীরা ডা. শাহাদাতের নির্দেশেই জুলাই বিপ্লবের গ্রাফিতি মুছে দেওয়ার অভিযোগ এনে তাকে ‘জুলাই গাদ্দার’ এবং অবৈধ মেয়র হিসেবে আখ্যায়িত করেন। একইসঙ্গে তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া ও তাদের ফেরানোর অভিযোগও করেন।
অন্যদিকে ডা. শাহাদাত নিজেকে জুলাই বিপ্লব তথা গ্রাফিতি অঙ্কনের পৃষ্ঠপোষক দাবি করেন। তার অভিযোগ, সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পানি ঘোলা করতেই এনসিপি গ্রাফিতি অঙ্কন নিয়ে অনাহুত পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে। তারা সাবেক মেয়র এম মনজুর আলমকে দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি অনাকাঙ্ক্ষিত এই পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য এনসিপি নেতা আরিফ মঈনুদ্দিনকে দায়ী করেছেন। জুলাই বিপ্লবের বিরুদ্ধে তাকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে দাঁড় করানোর বিষয়টি বর্ণনা করতে গিয়ে মেয়রকে অশ্রুসিক্ত হতে দেখা যায়।
চট্টগ্রামে লালখানবাজার থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বড় বড় পিলারে জুলাই বিপ্লবের পরে বিপ্লব নিয়ে নানা ধরনের গ্রাফিতি অংকন করে। আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও স্টেকহোল্ডাররা এসব গ্রাফিতি অঙ্কন করে। বেশ কয়েক দিন ধরে সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্ন কর্মীরা সেসব গ্রাফিতি মুছে ফেলতে থাকেন।
পিলারের কোন কোন জায়গায় রং করে সেখানে ‘কন্টাক্ট ফর এডভার্টাইজমেন্ট’ এবং মোবাইল নম্বর লিখে দেওয়া হয়। করপোরেশনের পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনের জন্য স্পেস ভাড়া দিতেই এসব করা হয় বলে সূত্র জানায়; কিন্তু বিষয়টি নজরে এলে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে জুলাই বিপ্লবের অংশীদার এনসিপির নেতাকর্মীরা।
রোববার রাতেই তারা টাইগারপাস এলাকায় সিটি করপোরেশনের প্রবেশ মুখে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকে। মেয়র ডা. শাহাদাতের বিরুদ্ধে নানা ধরনের স্লোগান দিতে থাকে। খবর পেয়ে মেয়রের অনুসারী বিএনপি যুবদল ছাত্রদল মহিলা দলের নেতাকর্মীরাও সেখানে জড়ো হয়ে এনসিপির বিরুদ্ধে পাল্টা বিক্ষোভ শুরু করে। ১০টা থেকে শুরু হওয়া পালটাপালটি বিক্ষোভ চলে রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত। তবে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। একপর্যায়ে দুই পক্ষকে সরিয়ে দেয়।
এনসিপি সোমবার সকালে গ্রাফিতি অংকনের কর্মসূচি ঘোষণা করে। দুইপক্ষের এমন অবস্থানের কারণে পরিস্থিতি সামাল দিতে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ জিইসি মোড় থেকে টাইগারপাস পর্যন্ত সবধরনের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ তথা ১৪৪ ধারা জারি করে।
এদিকে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে এনসিপি নেতাকর্মীরা সাধারণ শিক্ষার্থী পরিচয়ে রং-ব্রাশ নিয়ে টাইগারপাস এলাকায় সোমবার সকালে জড়ো হয়। তারা রং করা পিলারে জুলাই গ্রাফিতি অংকন করতে চাইলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। এতে করে পুলিশ ও এনসিপি নেতাকর্মীদের মধ্যে হাতাহাতি ও ধস্তাধস্তি হয়।
এনসিপি নেতাকর্মীরা মহিলা পুলিশের গায়ে রং ছুঁড়ে মারে। পুলিশও রঙের বালতি কেড়ে নিয়ে এনসিপির পুরুষ ও নারী কর্মীদের গায়ে রং ছুঁড়ে মারে। ধস্তাধস্তির সময় এনসিপির এক নারী কর্মীকে ফুটপাতে লুটিয়ে পড়তে দেখা যায়।
পুলিশ হ্যান্ডমাইক দিয়ে এনসিপির নেতাকর্মীদের বারবার সরে যাওয়ার নির্দেশ দিলেও তারা এতে কর্ণপাত না করায় পরিস্থিতি হাতাহাতি ও ধরপাকড়ে গড়ায়। ঘটনাস্থল থেকে তিনজনকে আটক করলেও পরে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
চট্টগ্রাম মহানগর এনসিপির সদস্য সচিব আরিফ মাঈনুদ্দিন বলেন, মেয়র, অবৈধ মেয়র ও কোর্টের রায়ের মেয়র উনার মেয়াদ চলে গেছে সেটা আমরা জানতাম; কিন্তু উনার ব্রেনের বা মেধার মেয়াদ চলে গেছে সেটা জানতাম না। তিনি গ্রাফিতি মুছে দেন। আবার লিখে দেন অ্যাডভার্টাইজমেন্টের জন্য (বিজ্ঞাপন) যোগাযোগ করুন। এটি নিশ্চিত এটা সিটি করপোরেশন থেকে করা হয়েছে। তিনি বিপ্লব উদ্যান দখল করে সেখানে একটি চারতলা মার্কেট করছেন। উনি মেয়র হওয়ার পর থেকে এখানে মার্ডার ( হত্যা) হয়। মেয়র হওয়ার পর থেকে নগরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। জলাবদ্ধতায় মানুষ দুর্ভোগে পড়লেও সমস্যার সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায় না। ওনাকে দেখা যায় যেখানে টাকা আছে সেখানে। শেষপর্যন্ত ওনার লোভ এত হয়েছে যে তিনি জুলাই আন্দোলনের স্মৃতিবাহী গ্রাফিতি মুছে সেখানে ‘বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন’ লিখে দিয়েছেন। আমরা মেয়রকে বলব, ‘আপনার মেয়াদ শেষ, দয়া করে পদ ছাড়ুন।’
রোববার রাতে দুইপক্ষের পালটা-পালটি অবস্থানের সময় রাত ১২টার দিকে টাইগারপাস ঘটনাস্থলে এসে বক্তব্য রাখেন মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনে বিএনপি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আগস্টে আমার বাড়িসহ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, নগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহসহ অনেকের বাসায় আগুন দেয়া হয়েছে। আমার বাসায় ককটেল মেরেছে। আমার অসুস্থ মাকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে। কাজেই মায়াকান্না আমার সাথে দেখাবেন না। ছাত্রদলের ওয়াসিম জুলাই আন্দোলনে প্রথম শহীদ হয়। সে আমার অনুসারী। এর থেকে প্রমাণ হয় জুলাই আন্দোলনে মাঠে ছিল ছাত্রদল। একটি গোষ্ঠী জুলাই আন্দোলন হাইজ্যাক করতে চায়। এটা হতে পারে না।
মেয়র আরও বলেন, দেয়ালগুলোতে প্রচুর পোস্টার ছিল। এতে গ্রাফিতি ঢাকা পড়ে। আজ সকালে এনসিপির ছেলেরা আমার সাথে দেখা করে। তাদের বলেছি, দেয়ালগুলোতে আর্ট কলেজের শিক্ষার্থীদের দিয়ে নান্দনিকভাবে নতুন করে গ্রাফিতি অঙ্কন করা হবে। করপোরেশন থেকে ফান্ড দেব। বেশি লাগলে আমি নিজে অর্থায়ন করব। এতে এনসিপির ছেলেরা খুশি হয়ে চলে যায়। এ ছাড়া সন্ধ্যায় বিবৃতি দিয়ে বলেছি, করপোরেশন থেকে গ্রাফিতি মুছে ফেলার কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি। এরপরও উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে এনসিপির বিতর্কিত নেতা আরিফ মঈনুদ্দিন কর্মসূচি দিয়েছে। আসলে সে শহরকে অশান্ত করতে চায়।
সোমবার দুপুরে সরেজমিন ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, টাইগারপাস মোড় ও আশপাশে বিপুল পুলিশ সদস্যদের টহল জোরদার করা হয়েছে। বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নিতে দেখা যায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের। এ সময় জনমনে এক ধরনের চাপা উত্তেজনা বিরাজ করতে দেখা যায়। দামপাড়া পুলিশ লাইনের গেটে সোয়াত টিম মোতায়েন করা হয়।
সোমবার সকালে উত্তাল উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সময়ও মেয়র গণমাধ্যমের সামনে আসেন। তিনি বলেন, নগরীর কোথাও আন্দোলনের গ্রাফিতি মুছে ফেলার নির্দেশ তিনি দেননি। আপনারা সরেজমিন গিয়ে দেখতে পারেন, সেখানে কোনো গ্রাফিতি মোছা হয়নি। এ ধরনের কোনো নির্দেশ আমি কখনো দিইনি, ভবিষ্যতেও দেব না। জুলাই-আগস্টের চেতনা আমি ধারণ করি। দীর্ঘ ১৭ থেকে ১৮ বছর ধরে আমি আন্দোলনের মাঠে আছি। যারা জুলাই-আগস্টে আন্দোলন করেছে, আমি অবশ্যই তাদের সম্মান করি।
তিনি বলেন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বিভাগের কর্মীরা নিয়মিত কাজের অংশ হিসেবে পোস্টার অপসারণ করেছে। তারা জানিয়েছে, সেখানে গ্রাফিতি নয়, মূলত পোস্টার ছিল। পোস্টারের আড়ালে থাকা কিছু গ্রাফিতি দৃশ্যমান ছিল না। এখনো অনেক পিলারে সেই গ্রাফিতি রয়েছে, চাইলে দেখা যাবে।
সিএমপির ডিসি (উত্তর) আমিরুল ইসলাম জানান, সোমবার দেওয়ান হাট থেকে জিইসি মোড় পর্যন্ত এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি থাকার পরও একটি পক্ষ টাইগারপাস এলাকায় অবস্থান নিলে পুলিশ তাদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় কিছুটা বাগবিতণ্ডা ও ধস্তাধস্তি হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যাতে ব্যাহত না হয়, সেজন্য সবাইকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার অনুরোধ জানিয়েছি। পুলিশের সতর্কতার কারণে পরিস্থিতির অবনতি হয়নি।
এনসিপির সংবাদ সম্মেলন
সোমবার বিকালে ৫টার দিকে ষোলশহর রেলস্টেশনে এক সংবাদ সম্মেলনে করে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি চট্টগ্রাম মহানগর শাখা। সংবাদ সম্মেলনে মহানগর এনসিপির আহ্বায়ক মীর মোহাম্মদ শোইয়াব ও সদস্য সচিব আরিফ মাঈনুদ্দিনসহ সিনিয়র নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলন থেকে সোমবার সন্ধ্যা ৭টায় আবারও জুলাই গ্রাফিতি অংকন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।