
সারা দেশে খুন, অপহরণ, ডাকাতি, ছিনতাই, চুরি, নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো অপরাধমূলক ঘটনা বেড়েছে। এর জেরে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত প্রথম চার মাসে এক হাজার ১৪২ জন খুন হয়েছে।
এসব ঘটনায় ওই চার মাসে মোট মামলা হয়েছে ১৩ হাজার ২২১টি। পুলিশ সদর দপ্তর ও বিভিন্ন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, জোরপূর্বক অর্থ ছিনিয়ে নেওয়া, আর্থিক কারণে সামাজিক অস্থিরতা, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিরোধ, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর দ্রুত পদক্ষেপের অভাব—এসব কারণে সমাজে এ ধরনের অপরাধ বাড়ছে।
নিহতদের পারিবারিক সূত্র বলছে, ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর বেশির ভাগ এখনো স্বজন হত্যার বিচার পায়নি।
গ্রেপ্তার হয়নি বেশির ভাগ অপরাধী।
গত ২৮ এপ্রিল রাজধানী নিউমার্কেট থানা এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি ছুড়ে শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনকে হত্যা করা হয়। আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত খুনি ও নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের গত ১৫ দিনেও গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী।
এ ঘটনায় জড়িত খুনিদের ‘ছকের ভেতর’ আনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম।
মঙ্গলবার দুপুরে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘টিটন হত্যার মামলা তদন্তাধীন, তদন্তের স্বার্থে আসামিদের বিষয়ে কিছু প্রকাশ করতে চাচ্ছি না। আমরা চেষ্টা করছি।’
অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘খুনিদের মোটরসাইকেলে রায়েরবাজার পর্যন্ত যাওয়া শনাক্ত করা গেছে। রায়েরবাজার পর্যন্ত যেহেতু শনাক্ত করা গেছে, আপনারা (সাংবাদিক) ধরে নেন আমরা মোটামুটি একটা ছকের ভেতর নিয়ে আসছি।
একটি নির্দিষ্ট টার্গেট নিয়ে এগোচ্ছি।’
সর্বশেষ গতকাল শুক্রবার বরিশাল নগরে বাবু শিকদার নামের এক মাছ ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে।
গত ১৩ মে বিকেলে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে পুকুরপারে পুঁতে রাখা মা ও মেয়ের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। তাদের পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয় বলে পুলিশের সন্দেহ। ৮ মে রাতে গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলায় একই পরিবারের পাঁচজনকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা ঘটে।
এ বিষয়ে একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা বলছেন, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, টহল বৃদ্ধি, সিসিটিভি নজরদারি ও বিশেষ অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলছে। তবে নতুন ধরনের অপরাধ ও সংঘবদ্ধ অপরাধ মোকাবেলায় সক্ষমতা আরো বাড়ানো প্রয়োজন।
এর মধ্যে রাজধানীতের একের পর এক হত্যা, ছিনতাই, ডাকাতি, অপহরণসহ অন্যান্য অপরাধ নিয়ন্ত্রণে থানা ও পুলিশ ফাঁড়ি বাড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেন, ‘দেশে বিভিন্ন জায়গায় আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে হামলার শিকার হয় পুলিশ। তাই নাগরিক সমাজের প্রতি অনুরোধ, আপনারা পুলিশকে আবার কাছে টেনে নিন। পুলিশের কাজে সহায়তা করুন।’
পাঁচ ধরনের অপরাধে সমাজে অস্থিরতা বেশি : পুলিশ সদর দপ্তরের মাসিক অপরাধমূলক প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণে জানা যায়, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে বিভিন্ন থানায় হত্যা, অপহরণ, নারী-শিশু নির্যাতন, ডাকাতি ও দস্যুতা এবং চুরি-ছিনতাইয়ের মতো পাঁচ ধরনের অপরাধ মোট মামলা হয়েছে ১৩ হাজার ২২১টি। সেই হিসাবে প্রতি মাসে তিন হাজার ৩০৫টি এবং প্রতিদিন ১১০টি মামলা হয়।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের চার মাসে হত্যার ঘটনায় এক হাজার ১৪২টি মামলা হয়েছে। সেই হিসাবে প্রতি মাসে ২৪৬টি মামলা হয়েছে। প্রতিদিন হয়েছে তিনটি। এ সময়ে দস্যুতার ঘটনায় ৫৯১টি মামলা হয়। সেই হিসাবে প্রতি মাসে হয় ৪৭টি। ডাকাতির মামলা হয় ১৮৪টি। প্রতিদিন প্রায় দুটি। চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা হয় চার হাজার ৯৯টি। সেই হিসাবে প্রতি মাসে ১২৪টি, প্রতিদিন ৩৪টি মামলা হয়। একই সময়ে অপহরণের ঘটনায় ৩৪৭টি মামলা হয়। সেই হিসাবে প্রতি মাসে ৮৭টি এবং প্রতিদিন তিনটি মামলা হয়। এ সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় পাঁচ হাজার ৯৯৮টি মামলা হয়। সেই হিসাবে প্রতি মাসে মামলা হয় এক হাজার ৪৯০টি। প্রতিদিন ৫০টির বেশি।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছর দেশজুড়ে মোট এক লাখ ৮১ হাজার ৭৩৭টি মামলা হয়েছে। সেখানে গড়ে প্রতি মাসে মামলা হয়েছে ১৫ হাজার ১৪৫টি।
টাঙ্গাইলের মাওলানা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. উমর ফারুক কালের কণ্ঠকে বলেন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নির্বাচন-পরবর্তী দুই মাস যেমন ছিল, এর পর থেকে কিছুটা অবনতি হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী যেভাবে ঢেলে সাজানোর কথা, নির্বাচন-পরবর্তী যেসব পদক্ষেপ নেওয়ার কথা, রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে সেভাবে নেওয়া হয়নি। যার ফলে অপরাধীরা আগের মতোই রয়ে গেছে।
সূত্র: কালের কণ্ঠ