
রাজধানীর লালবাগের বাসা থেকে ব্যাংক কর্মকর্তা নজরুল ইসলামের রক্তাক্ত লাশ উদ্ধারের সাত মাস পর তাঁর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গেছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তাঁকে হত্যা করা হয়। এর আগে তাঁর মৃত্যু নিয়ে ধোঁয়াশা ছিল।
এদিকে মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হলেও কে বা কারা, কেন তাঁকে হত্যা করেছে– সে রহস্য এখনও ভেদ করা যায়নি। নজরুলের ভাইদের সন্দেহ, এ ঘটনায় নজরুলের স্ত্রী ও শাশুড়ি জড়িত। এমনকি স্ত্রী সায়মা শারমিন লোভাকে আসামি করে মামলাও করা হয়েছে। তবে অভিযুক্ত লোভার দাবি, বঁটি দিয়ে গলা কেটে আত্মহত্যা করেছে তাঁর স্বামী।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা লালবাগ থানার পরিদর্শক মো. সাইদুজ্জামান সমকালকে বলেন, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে এ ঘটনাকে হত্যাকাণ্ড বলা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে কে বা কারা তাঁকে খুন করেছে সেটি এখন বড় প্রশ্ন। ওই সময় বাসায় নজরুলের স্ত্রী-সন্তান, মা ও শাশুড়ি ছাড়া কেউ ছিলেন না। অর্থাৎ পরিবারের কেউ এ ঘটনা ঘটিয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত তাদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। স্ত্রীর ভাষ্য, সবাই একসঙ্গে খাবার খেয়ে নিজেদের ঘরে চলে যান। কিছুক্ষণ পর চিৎকার শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে দেখতে পান, রক্তাক্ত অবস্থায় ছটফট করছেন নজরুল।
এর আগে গত ২৬ সেপ্টেম্বর বিকেলে লালবাগের আরএনটি রোডের জমজম মদিনা টাওয়ারের বাসা থেকে নজরুলের রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। তিনি স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকে ক্যাশ অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এ ঘটনায় তাঁর মা নূরজাহান বেগম বাদী হয়ে প্রথমে একটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর (ইউডি) মামলা করেন। ময়নাতদন্তে হত্যাকাণ্ড নিশ্চিত হওয়ার পর গত ২৫ মার্চ নজরুলের মেজো ভাই নুরুল ইসলাম বাদী হয়ে হত্যা মামলা করেছেন।
নুরুল ইসলাম বলেন, লোভাকে সন্দেহ করার অনেক কারণ আছে। ঘটনার পর থেকে তাঁর সব কর্মকাণ্ডই সন্দেহজনক। বিশেষ করে হত্যার এক দিন পরই নজরুলের পেনশন, সার্ভিস বেনিফিটসহ অন্যান্য পাওনা টাকার জন্য ব্যাংকে যান লোভা। এমনকি থানা পুলিশের কাছে গিয়েও ক্লিয়ারেন্স চেয়েছেন, যাতে ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে পারেন। বিভিন্ন খাত মিলিয়ে আমার ভাইয়ের প্রায় ৫০ লাখ টাকার মতো থাকার কথা।
লোভা কেন স্বামীকে খুন করবেন? এমন প্রশ্নে নুরুল বলেন, আমার মা ঘটনার কয়েক মাস আগে ওই বাসায় থাকতে শুরু করেন। তবে সেটা লোভার পছন্দ ছিল না। এ নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কলহের কথা শুনেছি। এ ছাড়া টাকার লোভ তো ছিলই। বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের বিষয়ও থাকতে পারে।
ঘটনার দিনের বর্ণনা দিয়ে নজরুলের বড় ভাই জিল্লুর রহমান জানান, সেদিন দুপুরে খাওয়ার পর তাঁর মা নূরজাহান বেগম এক ঘরে, লোভা তাঁর দুই ছেলে ও মা রহিমা খাতুনকে নিয়ে এক ঘরে এবং নজরুল আরেক ঘরে ঘুমাতে যান। চিৎকার শুনে ঘুম থেকে উঠে নূরজাহান ছেলেকে রক্তাক্ত অবস্থায় ছোটাছুটি করতে দেখেন। তখন রহিমার হাতে রক্তাক্ত বঁটি ছিল। নজরুল বারবার ফ্ল্যাটের দরজা খুলে বাইরে যেতে চাইলেও তাঁকে বাধা দেন স্ত্রী ও শাশুড়ি। কিছু বুঝতে না পেরে নূরজাহান ছেলেকে জড়িয়ে ধরেন। তখন ছেলে তাঁকে বলেন, ‘মা, বঁটিটা আটকাও।’
এদিকে ঘটনার পর এবং পরবর্তী সময়ে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে লোভা দাবি করেন, বঁটি দিয়ে গলা কেটে আত্মহত্যা করেন নজরুল। তারা বাধা দিতে গেলে শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাত লাগে। নজরুলের ঋণ ছিল। তিন মাসের বাড়ি ভাড়া বকেয়া পড়ে যায়। আর্থিক সংকটের কারণে হতাশাগ্রস্ত হয়ে তিনি আত্মহত্যা করতে পারেন।
এ ব্যাপারে লোভার সাম্প্রতিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে আর্থিক সংকটের কথা অস্বীকার করেছেন নজরুলের দুই ভাই। অবশ্য তদন্ত সূত্র বলছে, নজরুল সম্ভবত অনলাইন জুয়ায় অনেক টাকা খুইয়েছিলেন। পাঁচ লাখ বা তার বেশি টাকার জন্য কেউ তাঁকে চাপ দিচ্ছিল। এ নিয়ে তিনি জিডিও করেছিলেন।