অপহরণের পর হত্যা

‘আমার স্বামীকে কে, কেন, কীভাবে মারল?’

ডেস্ক রিপোর্ট
  ১৮ মার্চ ২০২৬, ১৪:৩৫

সাইফান আবদুল্লাহর ১০ বছর পূর্ণ হবে আগামী জুনে। বাবার আকস্মিক মৃত্যুর বিষয়টি বুঝতে পারলেও মানতে পারছে না। ‘বাবা ছাড়া ভালো লাগে না, বাবা কেন ফাঁকি দিল?’—বারবার এসব প্রশ্ন আওড়াতে থাকে। আর তার ছোট ভাই শাদমান সাফিনের বয়স মাত্র ৩ বছর। প্রতিনিয়ত সে কান্নাকাটি করে মুঠোফোনে বাবার সঙ্গে কথা বলতে চায়। কিন্তু তাদের এসব চাওয়া আর কোনো দিন পূরণ হবে না।
সাইফান ও শাদমান হলো কৃষিবিদ মোহাম্মদ শহিদুল ইসলামের দুই ছেলে। গত ২৩ জানুয়ারি অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি হিসেবে শহীদুল ইসলামের লাশ উদ্ধার করা হয়।
শহিদুল ইসলামের দুই ছেলে এবারই প্রথম বাবাকে ছাড়া ঈদ করবে। দাদা, নানা, চাচা, মামাসহ অন্যরা ঈদের উপহার দিয়েছেন, তবে সাইফানের অভিমান অন্য জায়গায়। বাবা থাকলে তো ঈদের কেনাকাটা করার জন্য মার্কেটে নিয়ে যেতেন, মা কেন নিয়ে যাচ্ছে না?
শহিদুল ইসলামের স্ত্রী শাম্মী আকতার বলেন, ‘ছেলেদের নিয়ে ঈদের বাজার করার মতো পরিস্থিতিতে আমরা নেই। তারা ছোট, তারা বোঝে না যে বাবা নেই। বড় ছেলে বুঝলেও মানতে পারছে না, চিৎকার–চেঁচামেচি করে।’
নিখোঁজ থেকে মৃত্যু
শহিদুল ইসলাম আন্তর্জাতিক ভুট্টা ও গম গবেষণাকেন্দ্রের সাবেক রিসার্চ কো-অর্ডিনেটর ছিলেন। গত ২১ জানুয়ারি ঢাকার গুলশান থেকে বরিশাল ফেরার পথে তিনি নিখোঁজ হন। ২৩ জানুয়ারি মাদারীপুরের শিবচর থানার পুলিশ অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করে। পরে জানা যায়, শিবচর মহাসড়কের ঢাল থেকে উদ্ধার হওয়া এই লাশ শহিদুল ইসলামের (৪২)।
শহিদুলের কর্মস্থল ছিল বরিশালের আলেকান্দা এলাকায়। সেখানেই তিনি পরিবার নিয়ে থাকতেন। প্রকল্প শেষ হওয়ায় গত বছরের ডিসেম্বর মাস থেকে আর কর্মরত না থাকলেও গ্রামের বাড়িতে নিজস্ব কৃষি খামার শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার সেরাজপুর গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা মো. মতিউর রহমানের বড় ছেলে শহিদুল।
গত ২০ জানুয়ারি শহিদুল সদ্য সাবেক কর্মস্থল থেকে পাওনা বুঝে নিতে ঢাকায় যান, ওঠেন ছোট ভাই এরশাদ উল্লাহর মহাখালীর বাসায়। পরদিন সকালে ওই বাসা থেকে বের হয়ে গুলশানে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের শাখায় যান। বাসা থেকে বের হওয়ার আগে স্ত্রী শাম্মী আকতারকে ফোনে জানিয়েছিলেন, ব্যাংকের কাজ শেষ করে বরিশালে ফিরবেন।
তবে দুপুর ১২টা থেকে শহিদুলের মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এর পর থেকে তিনি নিখোঁজ। এ নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবরও প্রকাশ হয়।
শিবচরের ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের সূর্যনগর আন্ডারপাসের উত্তর পাশে রাস্তার ঢাল থেকে শহিদুল ইসলামের লাশ উদ্ধার করেছিল পুলিশ। এরপর লাশের ছবি ও ভিডিও ফেসবুকসহ বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। ২৪ জানুয়ারি বেলা ১১টার দিকে এক স্বজনের মাধ্যমে মুঠোফোনে শহিদুলের বাবা মতিউর রহমান অজ্ঞাত লাশের ছবি দেখে তা তাঁর ছেলের লাশ বলে শনাক্ত করেন। মাদারীপুর সদর হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে লাশ নিয়ে বাড়ি ফেরেন পরিবারের সদস্যরা।
শাম্মী আকতার বলেন, ‘কোনো অসুখ বা সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেলে মনটাকে বোঝাতে পারতাম। ভালো মানুষ বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হলেন। তারপর লাশ পেলাম। ছোট ছেলে লাশ দেখে প্রথমে বলেছে, আংকেল এখানে শুয়ে আছে কেন? গোসল করানোর পর এই ছেলে বাবাকে চিনতে পেরেছে। আমরা এখন পর্যন্ত জানতেই পারলাম না, মানুষটাকে কে, কেন বা কীভাবে মারল। মামলার এখন পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি নেই।’
মাদারীপুরের শিবচর থানায় গত ২৭ জানুয়ারি মতিউর রহমান ছেলেকে অপহরণের পর হত্যার অভিযোগে অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করেন।
শাম্মী আকতার বলেন, প্রথমে সন্দেহ করা হয়েছিল তাঁর স্বামী হয়তো মলম বা অজ্ঞান পার্টির কবলে পড়েছিলেন। কিন্তু দিন যত পার হচ্ছে, তত বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে।
শাম্মী আকতার অভিযোগ করেন, গুলশান থানার সংশ্লিষ্টদের ‘ঠেলে ঠেলে’ সিসিটিভি ফুটেজ বের করতে হয়েছে। তাতে শহিদুল ইসলামকে সর্বশেষ তুরাগ পরিবহনের বাসে উঠতে দেখা গেছে। এরপর আর সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পুলিশ বের করেনি। ২১ জানুয়ারি দুপুর ১২টা ৩২ মিনিটে শহিদুলের মুঠোফোনের সর্বশেষ লোকেশন ট্র্যাক করা হয় কেরানীগঞ্জের ইকুরিয়া। পুলিশ এর বেশি আর কোনো তথ্য জানায়নি।
শহীদুলের ফোন বন্ধ থাকার চার থেকে পাঁচ ঘণ্টার মধ্যেই অনলাইনে জিডি করা হয়েছিল বলে জানান শাম্মী। তিনি মনে করেন, পুলিশ তখনই তৎপর হলে হয়তো শহীদুলকে জীবিত পাওয়া যেত।
শাম্মী বলেন, ‘আমার স্বামী গুলশান থেকে বরিশাল আসার কথা অনলাইন জিডিতে উল্লেখ করা হয়েছিল। কিন্তু ২৩ জানুয়ারি অজ্ঞাত লাশ পাওয়ার পর শিবচর থানা থেকে আমাদের কিছু জানানো হয়নি। পরের দিন ফেসবুক ভিডিওর মাধ্যমে অন্যরা আমাদের জানিয়েছেন। এর আগপর্যন্ত শিবচর থানায় লাশ পড়ে ছিল।’
শহীদুল ২০১৪ সাল থেকে গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত কর্মক্ষেত্রে সুনামের সঙ্গেই কাজ করেন বলে তাঁর স্ত্রীর ভাষ্য। তাঁর কোনো শত্রু ছিল কি না, তা–ও জানেন না। পুলিশ এখন পর্যন্ত কোনো তথ্যও জানাতে পারেনি।
শিবচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম গত সোমবার প্রথম আলোকে বলেন, এখন পর্যন্ত এ হত্যা মামলায় বলার মতো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। সিসিটিভির ফুটেজসহ মামলার বেশ কিছু তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। ভিসেরা প্রতিবেদন এখনো পাওয়া যায়নি।
সন্তানদের শূন্যতা
শহিদুল ইসলাম ও শাম্মী আকতারের বিবাহিত জীবন ১১ বছরের। শাম্মী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে এমএ পাস করেন। বেশ কয়েক বছর স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন। তবে স্বামীর বদলির চাকরি আর ছোট ছোট দুই ছেলে—সব মিলিয়ে এক সময় চাকরি ছেড়ে দেন তিনি।
শহিদুলের মৃত্যুর পর বরিশালের বাসা ছেড়ে দিয়ে শাম্মী দুই ছেলেকে নিয়ে পটুয়াখালীতে শ্বশুরবাড়িতে আছেন। বড় ছেলেকে চতুর্থ শ্রেণিতে সেখানেই ভর্তি করা হয়েছে।
শাম্মী বলেন, শ্বশুর-শাশুড়ির বয়স হয়েছে। শ্বশুরবাড়িতে শহিদুলের শুরু করা খামারের কাজ মাঝপথে বন্ধ করার উপায় নেই। শ্বশুরই এখন তার দেখভাল করছেন।
শহিদুল ইসলামের কর্মস্থল থেকে পাওনা পেতেও কোনো ঝামেলা হয়নি বলে জানান শাম্মী আকতার। তিনি বলেন, ফেসবুকে শহিদুলের নিখোঁজের পোস্ট দেওয়ার পর তাঁকে পাওয়া গেছে দাবি করে দুজন ফোন করে টাকা চেয়েছিলেন। নম্বরগুলো দেখে পুলিশ জানিয়েছে, এসব প্রতারক চক্রের কাজ।
শাম্মী বলেন, ‘আমার মা মারা গেছেন। বাবার বয়স হয়েছে। একমাত্র ভাই আমার ছোট। অন্যদিকে দেবরের স্ত্রী স্কলারশিপ নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় থাকেন। দেবরকে দুই জায়গায় দৌড়াতে হবে। ছোট ছোট দুই বাচ্চা নিয়ে আমাকে এখন অজানা আশঙ্কায় দিন পার করতে হচ্ছে। এখন শুধু জানতে চাই—আমার স্বামীকে কে, কেন, কীভাবে মারল?’