
নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে মসনদে ফিরেছে বিএনপি। এতে দিল্লির সামনে একটি প্রশ্ন আবারও জোরালো হয়ে উঠেছে। তা হলো- যখন একক কোনো শক্তিশালী অংশীদারের ওপর নির্ভরতার সুযোগ আর নেই, তখন টেকসই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত?
প্রায় দেড় দশক ধরে ভারতের নীতি গড়ে উঠেছিল ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে। সমঝোতাটি ছিল স্পষ্ট: ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সহযোগিতা, উন্নত সংযোগব্যবস্থা এবং ভারতপন্থী কৌশলগত অবস্থানের বিনিময়ে দিল্লি রাজনৈতিক সমর্থন দেবে- যা অনেক সময় বাড়তি প্রশ্রয়ের মতো দেখাতো। এর সুফলও মিলেছিল, বিশেষ করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বিদ্রোহী নেটওয়ার্ক দমনের ক্ষেত্রে। তবে এর মূল্যও ছিল। বাংলাদেশের জনমতের এক বড় অংশ ভারতের ভূমিকা দেখেছে প্রতিবেশী হিসেবে নয়, বরং ক্রমশ কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠা এক ব্যবস্থার পৃষ্ঠপোষক হিসেবে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক উত্থান-পতন এবং শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়া দেখিয়ে দিয়েছে, সেই বাজি কতটা সংকীর্ণ ছিল। বিএনপির ভূমিধস জয় সমীকরণ বদলে দিয়েছে। তারেক রহমান কৌশলগত শাসনের ইঙ্গিত দিচ্ছেন। যার মধ্যে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুজ্জীবনের কথাও আছে। এটি স্বভাবতই ভারতবিরোধী নয়, বরং নিজস্ব কূটনৈতিক পরিসর তৈরির প্রচেষ্টা। তবে ইতিহাস অপ্রাসঙ্গিক- এমন ভান ভারত করতে পারে না।
বিএনপি-নেতৃত্বাধীন আগের সরকার জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটে ছিল। সেই সময় দিল্লির জন্য গুরুতর নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়। ২০০৪ সালের চট্টগ্রামে অস্ত্র উদ্ধারকাণ্ড, যা অভিযোগ অনুযায়ী ভারতীয় বিদ্রোহীদের জন্য ছিল এবং ২০০১ সালের ‘নির্বাচনের পর সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা’- এসব স্মৃতি আজও সতর্কতার কারণ। কিন্তু সতর্কতাই কৌশল নয়। নতুন সরকারকে কেবল ‘সমস্যা’ হিসেবে দেখলে পুরোনো সম্পর্কের ভাঙনের কারণগুলোই আবার উসকে উঠবে।
আরও একটি জটিল বিষয় হলো শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান। ২০২৪ সালের দমনপীড়নের ঘটনায় তার অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড এবং তাকে প্রত্যর্পণে দিল্লির অস্বীকৃতি- এই ইস্যু দুই দেশের সম্পর্কে স্থায়ী অস্বস্তি তৈরি করেছে। আইনগত সিদ্ধান্ত ঢাকার ইচ্ছামতো নেওয়ার বাধ্যবাধকতা ভারতের নেই, তবে রাজনৈতিক বাস্তবতাকে অস্বীকারও করা যায় না।
যতদিন শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক উত্তেজনাপূর্ণ প্রতীক হয়ে থাকবেন, ততদিন অন্য সব আলোচনাই কঠিন হবে। তার ভূমিকা যেন ধীরে ধীরে কেন্দ্র থেকে সরে আসে- এ নিয়ে নীরব কূটনীতি জনসমক্ষে কড়া অবস্থানের চেয়ে স্থিতিশীলতার জন্য বেশি কার্যকর হতে পারে।
তবে সহযোগিতার কাঠামোগত যুক্তি নিয়ে সন্দেহ নেই। ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার সীমান্ত, গভীর সাংস্কৃতিক বন্ধন এবং ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক- দূরত্ব তৈরি করা এখানে কল্পনাবিলাস মাত্র। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার; আবার এশিয়ায় বাংলাদেশের অন্যতম বড় রপ্তানি বাজার ভারত। দুই দেশের সেনাবাহিনী যৌথ মহড়া করে এবং সমুদ্রপথে সমন্বয় বজায় রাখে- এগুলো প্রতিদ্বন্দ্বীর আচরণ নয়।
আসল পরীক্ষা হলো- ভারত কি ব্যক্তিনির্ভর প্রতিবেশ নীতি থেকে প্রতিষ্ঠাননির্ভর নীতিতে রূপান্তর ঘটাতে পারে? নিরাপত্তা, পানি, বাণিজ্য ও চলাচল- এসব স্পষ্ট স্বার্থের ভিত্তিতে বিএনপি সরকারের সঙ্গে কাজ করা এবং অভ্যন্তরীণ বক্তব্যে উত্তাপ কমানো দুর্বলতা নয়, বরং আত্মবিশ্বাসের পরিচয় হবে।
ঢাকার পক্ষেও দায়িত্ব আছে- কৌশলগত শাসন যেন সম্পর্কের অতীত ঝুঁকির স্মৃতিভ্রংশে পরিণত না হয়। এই পুনর্গঠন নাটকীয় হবে না; বরং হবে প্রক্রিয়াভিত্তিক, ধীরগতির এবং মাঝে মধ্যে হতাশাজনক।