সিলেটের ১৯ আসনের হালচাল

নীরব ভোটারই হতে পারে ভোটের নিয়ামক

ডেস্ক রিপোর্ট
  ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৩:৩২


জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সিলেট বিভাগের ১৯টি আসনেই ভোটের সমীকরণ জটিল হয়ে উঠেছে। বিদ্রোহী প্রার্থী, জোটের কারণে দুর্বল দলকে ছাড়, সংখ্যালঘু ভোট, চা শ্রমিক, অরাজনৈতিক সংগঠন আঞ্জুমানে আল ইসলাহর ভোট– এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে জয়-পরাজয়ের হিসাবনিকাশে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের ভোটের দিকেও নজর প্রার্থীদের। সব মিলিয়ে ‘নীরব ভোট’ এই বিভাগে নিয়ামক হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিএনপি ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও, অন্তত পাঁচটি আসনে বিএনপির ভেতরের বিদ্রোহ দলটির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সিলেট-৫, সুনামগঞ্জ-৩ ও ৪, মৌলভীবাজার-৪ এবং হবিগঞ্জ-১ আসনে দলীয় প্রার্থীদের মুখোমুখি শক্ত অবস্থানে থাকা বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীরা পুরো সমীকরণ পাল্টে দিয়েছেন।
১৯ আসনে চার নিয়ামক
সিলেট বিভাগে ভোটার প্রায় ৯১ লাখ ৬৮ হাজার। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে ৭ শতাংশ সনাতন ধর্মাবলম্বী, প্রতি আসনে ৫ থেকে ১০ শতাংশ ভোট রয়েছে আঞ্জুমানে আল ইসলাহর অনুসারীদের, আছে বিপুলসংখ্যক চা শ্রমিক। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের একটি অংশ হয়তো ভোট দিতে যাবে না। দলটির ৮ থেকে ১০ শতাংশ ভোটার কেন্দ্রে যাবেন বলে মাঠ পর্যায়ের নেতাদের ধারণা। 
ফুলতলী পীর প্রতিষ্ঠিত আঞ্জুমানে আল ইসলাহ সিলেট বিভাগের রাজনীতিতে এবার সবচেয়ে আলোচিত ‘নীরব শক্তি’। সিলেটের প্রায় প্রতিটি উপজেলায় সংগঠনটির শক্ত অবস্থান রয়েছে। সিলেট-৫ ছাড়াও সিলেট-১, ২, ৩, ৬; সুনামগঞ্জ-৩ ও ৫; মৌলভীবাজার-২ ও ৪ এবং হবিগঞ্জ-১ আসনে তাদের ভোট ব্যাংক রয়েছে। সূত্র জানায়, মৌলভীবাজারের দুটি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ছাড়া অধিকাংশ জায়গায় আল ইসলাহর নেতাকর্মীরা বিএনপি প্রার্থীদের দিকেই ঝুঁকছেন। ইতোমধ্যে সিলেট-১ আসনে বিএনপি প্রার্থী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীরকে আনুষ্ঠানিক সমর্থন দিয়েছে সংগঠনটি।
অধিকাংশ আসনই চা-বাগান অধ্যুষিত। মৌলভীবাজার-৪ আসনে চা শ্রমিক ভোটার প্রায় এক লাখ। সিলেট-১, ৩ ও ৪ আসনে রয়েছে ২০ থেকে ৩০ হাজার করে শ্রমিক ভোট। এতদিন এই ভোট আওয়ামী লীগের হিসেবে বিবেচিত ছিল। এবার সেই ভোট নিজেদের দিকে টানতে বিএনপি ও জামায়াত উভয় পক্ষই শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে, নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ও যোগাযোগ বাড়িয়েছে।
বিদ্রোহে অস্বস্তি বিএনপিতে
বিএনপির জন্য বড় চাপ দলের ভেতরেই। দলীয় মনোনয়ন না পাওয়া অনেক নেতা এবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে মাঠে নেমেছেন। বহিষ্কার করেও বিদ্রোহ দমন করতে পারেনি দল। অনেক ক্ষেত্রে বহিষ্কৃত নেতারাই প্রকাশ্যে দলীয় প্রার্থীর বিপক্ষে কাজ করছেন। পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকায় বিদ্রোহী ও শরিক দলের প্রার্থীদের আসনে ৩০ জন নেতাকে বহিষ্কার করেছে বিএনপি। এতে উল্টো বিপদ বেড়েছে। 
সুনামগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ কয়ছর আহমদের বিপরীতে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন দলটির বিদ্রোহী প্রার্থী ব্যারিস্টার মো. আনোয়ার হোসেন। সুনামগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী অ্যাডভোকেট নূরুল ইসলাম নূরুলের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছেন বিদ্রোহী প্রার্থী দেওয়ান জয়নুল জাকেরীন। সিলেট-৫ আসনে বিএনপি সমর্থিত জমিয়তের প্রার্থী মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক কোণঠাসা। দল থেকে বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থী মামুনুর রশিদ তাঁর প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। 
মৌলভীবাজার-৪ আসনে বিএনপির মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরীর বিপরীতে বিদ্রোহী প্রার্থী মো. মহসিন মিয়া মধু শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছেন। আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংকের সমর্থন এখানে বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠছে। আলোচিত হবিগঞ্জ-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী ড. রেজা কিবরিয়ার বিপরীতে বহিষ্কৃত নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য শেখ সুজাত মিয়া শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছেন। এ ছাড়া সিলেট-১ (মহানগর ও সদর) আসনে বিএনপি চেয়ারপারসনের দুই উপদেষ্টা খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর ও আরিফুল হক চৌধুরী মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। এখানে মনোনয়ন পেয়েছেন মুক্তাদীর। আরিফুলকে মনোনয়ন দেওয়া হয় সিলেট-৪ (কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর) আসনে। স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা মনে করেন, দুইবারের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর সদরে শক্ত অবস্থান। তিনি এখানে প্রার্থী হলে অনায়াসে বিএনপি জিতে যেত। তাঁকে যেখানে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, সেটি তাঁর জন্য নতুন। 
জোটে দুর্বল জামায়াত
সিলেট ও আশপাশের কয়েকটি আসনে জোট রাজনীতিই জামায়াতের জন্য বড় দুর্বলতা হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন দলটির নেতাকর্মী ও ভোটাররা। সম্ভাবনাময় আসনে নিজস্ব প্রার্থী না থাকায় ভোটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা কঠিন হচ্ছে। 
সিলেট-৩ (দক্ষিণ সুরমা-বালাগঞ্জ-ফেঞ্চুগঞ্জ) আসনে জামায়াত দীর্ঘদিন প্রার্থী হিসেবে মাঠে রেখেছিল দক্ষিণ সুরমা উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান লোকমান আহমদকে। তবে জোটের সিদ্ধান্তে লোকমান আহমদ সরে দাঁড়ান এবং ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মুসলেহ উদ্দিন রাজুকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। এতে জামায়াতের কর্মী-সমর্থকরা উৎসাহ পাচ্ছেন না বলে স্থানীয়দের ভাষ্য। সিলেট-২ (বিশ্বনাথ-ওসমানীনগর) আসনেও একই চিত্র। এখানে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মুহাম্মদ মুনতাসির আলী (দেওয়াল ঘড়ি)। জোট হওয়ার আগে এই আসনে প্রচারণা চালিয়েছিলেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সদস্য অধ্যাপক আব্দুল হান্নান। জোটের স্বার্থে তাঁকে সরে দাঁড়াতে হয়। দলীয় গণ্ডির বাইরেও অধ্যাপক আব্দুল হান্নানের গ্রহণযোগ্যতা আছে। তবে মুনতাসির আলী তুলনামূলক দুর্বল অবস্থানে রয়েছেন।  
(তথ্য দিয়েছেন ব্যুরো ও জেলা-উপজেলা প্রতিনিধিরা)
সূত্র: সমকাল